বাঁশঝাড় হাঁটে
শিল্পকর্ম :: বিপ্লব সরকার
ধ্রুব এষ, চিত্রকর, কথাশিল্পী
প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬ | ০৭:৫২
| প্রিন্ট সংস্করণ
‘বাঁশঝাড় হাঁটে।’
‘কী?’
‘বাঁশঝাড়। হাঁটে। কব্বরের দিকে হাঁটে।’
‘অ।’
‘এই বাঁশঝাড়। সারোকোনায় ছিল।’
‘সারোকোনা?’
ভব এতক্ষণ কিছু বলে নাই। ঠাকুরের ন্যারেটিভ মতো মনোযোগ সহকারে জয়েন্ট ম্যানুফ্যাকচার করছিল, আমি ভবর বন্ধু এই গ্রামের মানুষ তাউরাশের সঙ্গে কথা বলছিলাম– কালোকুলো মাঝারি গড়নের মানুষ তাউরাশ, অতি সাদামাটা মুখাবয়ব, বা আমার ভুল হতে পারে, আমি তাউরাশের মুখাবয়বের অপার্থিবতা ধরতে পারি নাই– দীর্ঘ বাক্য গঠনের দিকে সে যায় না, এটা তার বাচনের বৈশিষ্ট্য হয়তো– প্রায় সকাল থেকে আমরা ফড়িংউড়ায় আছি, বিকাল হয়ে গেছে– চার-ছয়টা ফড়িং মাত্র দেখেছি– তাউরাশ বলেছে, ‘ফড়িং। মেঘের দিন হইলে দেখতেন। লাখে লাখে ফড়িং। উড়ে। উড়ে। উড়ে। উড়ে।’– কোনোরূপ বিষাদ আরোপ করে কিছু বলে নাই তাউরাশ। কিন্তু মনে হচ্ছিল এটা বিষাদের– এই যে মেঘের দিন হলে লাখ লাখ ফড়িং উড়ে ফড়িংউড়ায়– জয়েন্ট ম্যানুফ্যাকচারিং সমাপ্ত হয়েছে, সম্পত্তি ঠাকুরকে হস্তান্তর করে ভব যোগ দিল আমাদের সঙ্গে, ‘সারোকোনা? খুব বেশি দূরা না ওস্তাদ। যাইবেন? লন। পাশ্-শাত কিলোমিটার। তামাক টাইনতে টাইনতে হেঁটে মেরে দেব।’
আমি হাসলাম। আমি যদি বলতাম ‘ইস্তানবুল?’ ভব কী বলত? নয়ছয় করে এই কথাটাই– ‘ইস্তানবুল? খুব বেশি দূরা না ওস্তাদ। যাইবেন? লন। পাশ্-শাত হাজার কিলোমিটার। তামাক টাইনতে টাইনতে হেঁটে মেরে দেব।’
ঠাকুর জয়েন্ট ধরিয়েছে এবং কঠিন ভাবের মধ্যে আছে। ভিডিও ফিকশন কামড়াচ্ছে হয়তো মগজে। সারারাত তারা ঘুমায় নাই, আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, কলবেলের শব্দ ঘুমের মধ্যে আমার কর্ণপটাহ বিদীর্ণ করে দিয়েছিল। উঠে দরজা খুলে দেখি দুই উৎপাত, ঠাকুর ও ভব। ঠাকুর ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পোর’ ভাব নিল, ‘রাত কত হলো?’
তিনটা হলো। তার মানে আমি আধঘণ্টা ঘুমাই নাই।
ভব বলল, ‘লন ওস্তাদ।’
‘কই লব? বাবা ভব?’
ঠাকুর হিংস্রভাবে বলল, ‘ফড়িংউড়া যাব।’
‘ফড়িংউড়া?’
ভব– ‘আরে, আমার গ্রাম ওস্তাদ।’
‘তা বুঝলাম কিন্তু এত রাতে কেমনে কী? বাস পাব?’
ঠাকুর বিরক্তভাবে বলল, ‘বাস! বাস মানে কী? এমজিএমের সিইও বিল, বিল হর্নবাকল হেলিকপ্টারের ব্যবস্থা করেছে। এএক্স-সিক্স ফোর অ্যাপাচে।’
এএক্স-৬৪ অ্যাপাচে সামরিক হেলিকপ্টার।
ভব বলল, ‘এমজিএমের ছবি করতেছে ঠাকুর। স্ক্রিপ্ট ফাইনাল, নায়ক নায়িকা ফাইনাল। ব্রাড পিট, শার্লিজ থেরন। ক্যামিও হিসাবে ডেপের থাকার কথা আছে। জনি ডেপ।’
ঠাকুর বলল, ‘সমকালীন বাস্তবতার ভিত্রে এইটা হইল পয়েন্টালিজম, এই বিল্ডিংয়ে হেলিপ্যাড নাই। বিল এই ব্যাপারে খুবই বিরূপ মনোভাব প্রকাশ করেছে। আমি তারে অস্থির না হইতে বলেছি। সবুরে মেওয়া ফলে বলেছি।’
‘সবুরে মেওয়া ফলে ইংলিশে বললি?’ আমি বললাম।
‘না, নোয়াখালীর ভাষায় বলেছি। বিল ডুয়োলিংগো ইউনিভার্সিটি অব নোয়াখালী থেকে নোয়াখালীর ভাষায় ডক্টরেট করেছে।’
‘অ।’
‘লন ওস্তাদ।’ ভব আবার বলল।
সেই।
দুই উৎপাত শুটিংয়ের গাড়ি নিয়ে উপস্থিত হয়েছে বুঝতে পারি নাই। ঠাকুর ভিডিও ফিকশন বানায়। ভব আর্ট ডিরেকশন দেয়।
গাড়িতে রাত সকাল হয়েছে। আমরা ফড়িংউড়া পৌঁছেছি দশটায়। ছায়া সুনিবিড় ফড়িংউড়া। এই শীতে মিষ্টি– কুয়াশা সকাল দশটায়ও কাটে নাই, এগারোটার পর রোদ উঠেছে। ভব বিরাট চালান এনেছে দেশালের। ঠাকুরের নির্দেশ মোতাবেক একটার পর একটা জয়েন্ট ম্যানুফ্যাকচার করে যাচ্ছে। ঠাকুর বলে, ‘ম্যানুফ্যাকচার’। তাউরাশ একটা টানও দেয় নাই। দুপুরে আমরা ফড়িংউড়া বাজারের ‘মা রত্না সুইটমিট অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে’ গরম পরোটা ও গরম রসগোল্লা খেয়েছি। অমৃততুল্য।
মরমি কবি আনাই ফকির ও পানাই ফকিরের কবর ফড়িংউড়ায়। তাদের কবর দেখতে কিছু আগে আমরা ফড়িংউড়া গোরস্তানে উপস্থিত হয়েছি। রোদে কমলা হয়ে আছে চরাচর– গোরস্তান, সংলগ্ন বাঁশঝাড়, কাছের ও দূরের হিজল ও করচ গাছ।
মরমি দুই কবি যমজ ভাই ছিলেন। এন্তেকাল একই দিনে হয়েছে। দুইশ আট বছর আগে। বহু পরে সেও দেশভাগের আগে, দুই কবির ভাবশিষ্য সাহারুল দেওয়ান কবিদ্বয়ের কবর নিজ উদ্যোগে সিমেন্টে বাঁধিয়ে দিয়েছিলেন। সেই সিমেন্টে শ্যাওলা জমে সবুজ হয়ে আছে কবর। সবুজ দুই কবরে দুইটা মাটি রঙের পাখি বসে আছে। তাউরাশ বলল, ‘ঢুফি।’
তারা ঢুফি বলে ঘুঘুকে। ভব বলেছে। ঢুফিকোনা গ্রাম আছে উত্তরে। আনাই ফকির ও পানাই ফকিরের জন্ম ঢুফিকোনায় হয়েছিল। দুইটা ঢুফি দিন যতক্ষণ দুই কবির কবরে চড়ে– জন্ম থেকে এ দেখে আসছে ভবরা।
ফড়িংউড়া গোরস্তানে কবরের সংখ্যা খুব বেশি না। দুই কবির কবর খুব স্বাভাবিকভাবেই পাশাপাশি। অদূরে, বাঁশের বেড়া জীর্ণ হয়ে গেছে– তেমন একটা কবর দেখিয়ে ভব বলল, ‘ওস্তাদ, এইটা তাউরাশের কব্বর।’
তাউরাশের কবর?
ভবর তামাশা?
ধোঁয়ার কুণ্ডলী থেকে ঠাকুর বলল, ‘তাউরাশ মারা গেছে নাকি?’
ভব বলল, ‘জি, বস। মারা গেছিল।’
‘মানে?’
‘তুই বল তাউরাশ।’
তাউরাশ বলল, ‘আট বছর আগে, ঠাউর ভাই। মরছিলাম। মরার একদিন পরে গোর হইছিল। আমার।’
কী বলে! সে কি তবে? মানুষ না, ভূত? জম্বি টাইপ?
বর্ষাকালে মৃত্যু হয়েছিল তাউরাশের। লাখ লাখ ফড়িং তখন উড়ছিল ফড়িংউড়ায়। ভব তাউরাশের কবরে মাটি দিয়েছিল– সে তখনও ঢাকায় রপ্তানি হয় নাই।
ফড়িংউড়ার বিপত্নীক জলিল মাস্টারের মেয়ে রিনভি। বুধবারে গোর হয়েছিল তাউরাশের, পরের রবিবার সকাল বৃষ্টিমুখর ছিল। জলিল মাস্টার তখনও স্কুলে যান নাই। রিনভি ঘুম থেকে উঠে দেরিতে। সেদিন বৃষ্টি ধরার কিছু আগে উঠে বলল, ‘তারে কব্বরেত্থে তুলে আনেন আব্বা।’
জলিল মাস্টার বিস্মিত হন নাই। তার মেয়েটার মাথায় দোষ আছে। মেয়ের মা জয়তুনের মাথায় দোষ ছিল। স্বামীকে নাম ধরে ‘জলিল ভাই’ ডাকত– জলিল মাস্টার বললেন, ‘কারে গো বেটি?’
‘তাউরাশ ভাইরে আব্বা। তার ক্ষুধা লাগছে। ভাত খাইব।’
‘অ।’
‘কব্বরে দানাপানি নাই, আব্বা! ও আব্বা!’
বৃষ্টি ধরে এসেছিল। মেয়েকে কোনোমতে বুঝ দিয়ে জলিল মাস্টার স্কুলে চলে গিয়েছিলেন। তরঙ্গ শ্রীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। চার ক্রোশ দূরে। জলিল মাস্টারের বাইসাইকেল আছে। সারাদিন ফড়িংউড়ায় কী ঘটল আর খবর পান নাই। বুঝতে পারেন নাই ফড়িংউড়ার অধিকাংশ মানুষ তার মাথায় দোষ মেয়ের কথা বিশ্বাস করে বসবে। কবরের মাটি সরাবে তাউরাশের। জলিল মাস্টার যখন স্কুল থেকে ফিরলেন, সন্ধ্যা হয় হয়, ভিটাবাড়ির উঠানে মানুষের ভিড় দেখে শঙ্কিত হয়ে উঠেছিলেন। ভিড় ঠেলে ঢুকে স্তম্ভিত হলেন, সানকি ভরা ভাত খাচ্ছে তাউরাশ। গোগ্রাসে খাচ্ছে।
ঠাকুর বলল, ‘তুমি এখন জিতা না মরা তাউরাশ? তোমার স্টোরি কেন মিডিয়ায় আসে নাই? ভব তুই কখনও বলিস নাই কেন?’
ভব বলল, ‘কথা উঠে নাই।’
ঠাকুর বলল, ‘গল্পটা আমি নিলাম। সিনেমা বানাব।’
‘বেইজড অন আ ট্রু স্টোরি লেখা থাকবে?’ আমি বললাম।
ঠাকুর রোষ কষায়িত নেত্রে তাকাল, ‘না। বেইজড অন আ সাররিয়েল স্টোরি লেখা থাকবে।’
শব্দটা সাররিয়েল না সুররিয়েল?
পি ইউ টি পুট, আবার বি ইউ টি বাট– ইংরেজি ভাষার ঠাটবাট এই। আরেকটা জয়েন্ট ম্যানুফ্যাকচারের প্রস্তুতি নিল ভব। এটা টেনে আমরা উঠে পড়ব। ঢাকা ব্যাক করব। ঠাকুর তার ভাবজগতে ফিরল।
আমি মনে মনে একটা সাররিয়েল বা সুররিয়েল– দূর!– পরাবাস্তব দৃশ্য বানিয়ে দেখলাম– বাঁশঝাড় কবরের দিকে হাঁটছে।
কমলা রোদে কোটিন পড়েছে। আসিতেছে– শীতকালের সন্ধ্যা। ফড়িংউড়ার উত্তরে বহুদূরে পাহাড়। কনকনে ঠান্ডা হাওয়া সেই বহুদূরের পাহাড় থেকে আসছে। বাঁশঝাড়ে বকের ঝাঁক নামছে। পরিযায়ী পাখির একটা দল উড়ে গেল। আমি একটা রাজা ফড়িং দেখলাম– বড় ফড়িংকে আমরা রাজা ফড়িং বলি– বাঁশঝাড়ে বাসা রাজা ফড়িঙের?
এই বাঁশঝাড় সারোকোনায় ছিল। পাঁচ-সাত কিলোমিটার দূরের সারোকোনায়। দুই-আড়াইশ বছর আগে ছিল। দুই মরমি কবির যেদিন এন্তেকাল হলো, সেই হাঁটা দিল ফড়িংউড়ার দিকে। দেড়-দুইশ বছর ধরে হেঁটেছে।– সারোকোনার বাঁশঝাড় এখন ফড়িংউড়ার বাঁশঝাড়।– জলিল মাস্টারের মেয়ে রিনভি এসব কথা বলেছে তাউরাশকে। মাথায় দোষ আছে সামান্য, কিন্তু রিনভি ভালো মেয়ে।– মিছা কথা বলে না। জলিল মাস্টার মৃত্যুর আগে তাউরাশের সঙ্গে রিনভির বিয়ে দিয়ে গেছেন। তাউরাশ এখন জলিল মাস্টারের সামান্য গেরস্থি যা ছিল দেখে। ঘরসংসার করে। রিনভি স্বামীকে ‘তাউরাশ ভাই’ ডাকে। সন্তানাদি তাদের এখনও হয় নাই। তাউরাশ বলল, ‘হবে।’
হোক।
- বিষয় :
- শিল্পকর্ম
