ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

‘সেই মুহূর্তটা আজও ভুলতে পারি না’

‘সেই মুহূর্তটা আজও ভুলতে পারি না’
×

নব্বই দশকে একটি সিনেমার শুটিংয়ে শাবানা ও ববিতা

ববিতা, অভিনয়শিল্পী

প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬ | ০৭:৫৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালি দিনের কথা মনে পড়লেই আমার চোখের সামনে যে কজন মানুষের মুখ ভেসে ওঠে, তাদের মধ্যে শাবানা আপা অন্যতম। আমরা দুজনই একই সময়ের শিল্পী, একই ইন্ডাস্ট্রির মানুষ। দর্শক আমাদের অনেক সময় প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবেছেন, কিন্তু বাস্তবে আমাদের সম্পর্ক ছিল গভীর শ্রদ্ধা, আন্তরিকতা আর বন্ধুত্বের। শাবানা আপা আমার অনেক আগেই চলচ্চিত্রে এসেছেন। ১৯৬৭ সালে ‘চকোরী’ সিনেমার মাধ্যমে তাঁর নায়িকা হিসেবে অভিষেক হয়। আর আমি নায়িকা হিসেবে কাজ শুরু করি ১৯৬৯ সালে ‘শেষ পর্যন্ত’ সিনেমায় অভিনয়ের মাধ্যমে। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে আমাদের খুব একটা দেখা হয়নি। যতদূর মনে পড়ে, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনে (বিএফডিসি) আমাদের প্রথম পরিচয় হয়। আমি তখন সত্যজিৎ রায়ের ‘অশনি সংকেত’ সিনেমায় অভিনয় করে দেশে ফিরেছি। এফডিসিতে আমাকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল। সেই অনুষ্ঠানে শাবানা আপা আমাকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। প্রথম দেখাতেই তাঁর ভেতরে এক ধরনের আন্তরিকতা খুঁজে পেয়েছিলাম। হাসিমুখে আমাকে অভিনন্দন জানালেন। চলচ্চিত্রাঙ্গনে প্রতিযোগিতা থাকাটা খুব স্বাভাবিক, বিশেষ করে দুই জনপ্রিয় নায়িকার মধ্যে। কিন্তু আমাদের সম্পর্ক কখনও সেই জায়গায় যায়নি। বরং আমরা একে অপরের কাজকে সম্মান করতাম এবং সাফল্যে আনন্দ পেতাম। এরপর আলাদা আলাদা সিনেমার শুটিং করতে গিয়ে এফডিসিতে প্রায়ই দেখা হতো। ধীরে ধীরে পরিচয় থেকে সম্পর্কের গভীরতা বাড়তে থাকে। আমাদের একসঙ্গে প্রথম অভিনয় ছিল ‘সোহাগ’ সিনেমায়, যা মুক্তি পায় ১৯৭৮ সালে। এরপর  ‘কাপুরুষ’, ‘ফকির মজনু শাহ’, ‘বারুদ’ এবং ‘সোনার হরিণ’ সিনেমায় আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি। একসঙ্গে কাজ করতে গিয়েই শাবানা আপাকে আরও কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। শুটিংয়ের সময় আমাদের মধ্যে খুব সুন্দর বোঝাপড়া ছিল। আমরা যে যার কাজ মন দিয়ে করতাম, কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পর্কটা ছিল খুবই আন্তরিক। 

সেই সময়ে কিছু পত্রিকায় আমাদের সম্পর্ক নিয়ে নানা ধরনের খবর ছাপা হতো। বলা হতো, আমাদের মধ্যে নাকি দূরত্ব বা প্রতিযোগিতা আছে। কিন্তু সেসব ছিল সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। বাস্তবে আমরা ছিলাম খুব কাছের মানুষ। তাঁর অভিনীত ‘ভাত দে’ সিনেমার কিছু অংশ আমি টেলিভিশনে দেখেছিলাম। সেখানে তাঁর অভিনয় আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। শুটিংয়ের ফাঁকে আমাদের অনেক আড্ডা হতো। তখনকার দিনে সবাই আলাদা আলাদা টিফিন ক্যারিয়ার নিয়ে আসত। সবাই তো সব খাবার খেত না, তাই আমরা খাবার ভাগাভাগি করে খেতাম। সেই ছোট ছোট মুহূর্ত এখন খুব মনে পড়ে। একবার কক্সবাজারে শুটিং করতে গিয়ে একটি মজার ঘটনা ঘটেছিল। আমরা তখন হোটেল শৈবালে ছিলাম। তিনি এক সিনেমার শুটিং করছিলেন, আমি অন্য সিনেমার। হঠাৎ একদিন দরজায় বারবার নক শুনে খুলে দেখি শাবানা আপা দাঁড়িয়ে। তিনি হেসে বললেন, ‘তোমার কাছে একটা জিনিস চাইতে এসেছি।’ আমি অবাক হয়ে জানতে চাইলাম– কী লাগবে? তিনি বললেন, একটি গানের দৃশ্যে তাঁর আধুনিক পোশাক পরতে হবে। কিন্তু তিনি এ ধরনের পোশাক খুব কম পরতেন। তাই আমার কাছে কোনো ম্যাক্সি আছে কিনা দেখতে বললেন। আমি তাঁকে বললাম, ‘আমার পোশাক তো আপনার গায়ে হবে না।’ কারণ তখন আমি খুব পাতলা ছিলাম। তিনি হেসে বললেন, ‘সেলাই খুলে ঠিক করে নেব।’ পরে আমি তাঁকে পোশাক দিলাম। এরপর বললেন, ‘তোমার মডার্ন পরচুলাও তো আছে, সেটা দাও।’ আমার সুটকেসে সব সময় বিভিন্ন ধরনের চুল থাকত। সেটাও তাঁকে দিয়েছিলাম। এই ছোট ছোট ঘটনাই আমাদের সম্পর্কের আন্তরিকতার প্রমাণ। কিন্তু এসব সুন্দর স্মৃতি খুব কমই পত্রিকায় এসেছে। বরং তখন অনেক সাংবাদিক পত্রিকায় উল্টাপাল্টা গল্প লিখতেন। অথচ বাস্তবে আমাদের সম্পর্ক ছিল খুবই সুন্দর। শাবানা আপার প্রথম সন্তান হওয়ার পর আমি তাঁকে হাসপাতালে দেখতে গিয়েছিলাম। একদিন তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘তুমি তো প্রায়ই ভারতে যাও, সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে কাজ করো। কলকাতার শাড়ি আমার খুব পছন্দ। গেলে আমার জন্য একটা শাড়ি নিয়ে এসো।’ পরে আমি তাঁর জন্য শাড়ি এনে উপহার দিয়েছিলাম। সম্পর্ক ভালো না হলে কি এসব হয়? একসময় তিনি ধীরে ধীরে চলচ্চিত্র থেকে দূরে সরে গেলেন। এরপর আমিও অভিনয় কমিয়ে দিই। তারপর একদিন কলকাতার একটি দোকানে হঠাৎ আমাদের দেখা হয়ে যায়। আমরা দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরেছিলাম। অনেকদিন পর দেখা হওয়ায় দুজনের চোখই ছলছল করছিল। সেই মুহূর্তটা আজও ভুলতে পারি না। মানুষ ভাবে, নায়িকাদের মধ্যে শুধু প্রতিযোগিতা থাকে। আমাদের সম্পর্ক ছিল তার উল্টো। ক্যামেরার সামনে হয়তো প্রতিযোগিতা ছিল– কে ভালো অভিনয় করবে, কে দর্শকের মন জয় করবে। ব্যক্তিগত জীবনে আমাদের মধ্যে কোনো প্রতিযোগিতা ছিল না। ছিল শুধু সম্মান আর ভালোবাসা। শাবানা আপা সত্যিই অনন্য একজন। তাঁর সঙ্গে কাটানো দিনগুলোও ঠিক তেমনই– আজও উজ্জ্বল, আজও হৃদয়ের খুব কাছের।    

অনুলিখন: এমদাদুল হক মিলটন 

আরও পড়ুন

×