নির্মলেন্দু গুণের হারানো প্রেম
নির্মলেন্দু গুণ ও সৈয়দ ইকবাল
সৈয়দ ইকবাল, চিত্রকর, কথাশিল্পী
প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬ | ০৮:০০
| প্রিন্ট সংস্করণ
গুণদা [নির্মলেন্দু গুণ] গাড়ির জানালার কাঁচ নামিয়ে মুখ বের করতেই শুরু হলো হুলস্থুল! প্রচণ্ড বাতাসে তাঁর লম্বা চুল ও দাড়ি উড়ন্ত ফ্ল্যাগের মতো উড়ছে। তিনি শিশুর মতো হেসেই চলেছেন।
– আহারে লাস ভেগাসের বাতাস! এমনভাবে ওড়ালে তুমি। আমি পেছনের সিটের মাঝে বসে ছিলাম। নিজে সেভেন সিরিজের কালো ঝকঝকে নতুন বিএমডব্লিউ ড্রাইভ করছেন কায়েস।
_ গুণদা এ তো লাস ভেগাসের বাতাস নয়। আমরা এখনও ক্যালিফোর্নিয়া পার হয়ে নাভাদা স্টেটে ঢুকিনি। নাভাদায় ঢুকব তারপর না আসবে লাস ভেগাস।
ড্রাইভ করতে করতে কায়েস কথাটা বললেন।
আমার পাশে দুই দিকে গুণদা ও বাচ্চু ভাই। সামনে ড্রাইভিং সিটের পাশে জামী ভাই– দুজনই লস অ্যাঞ্জেলেস বাংলাদেশ সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি।
ফ্রিওয়ে ১৫ ধরে ১২০-১৩০ মাইলে গাড়ি ছুটছে। এই ফ্রিওয়ে কিংবা কানাডায় হাইওয়ে প্রচণ্ড গতি ভালো লাগার মানুষদের জন্য বেশ মজার ব্যাপার। কোনো লাল-নীল বাতি দেখে থামার দরকার নেই। আসলে এই আমেরিকায় ফ্রিওয়ে, কানাডায় হাইওয়ে থামাথামির সিদ্ধান্তবিহীন দ্রুতগামী চলার পথ। মাসকে মাস বছরকে বছর গাড়ি চালালেও পথ শেষ হবে না। এক শহর থেকে আরেক শহর! এক স্টেট থেকে আরেক স্টেট। এমনকি আমেরিকা থেকে কানাডা চলে যাওয়া যায়। আমেরিকায় সর্বোচ্চ ৬৫ মাইল আর কানাডায় ১০০ কিলোমিটার গতিতে গাড়ি নিয়ে ছোটার নিয়ম। তবে সবাই আরও বেশিতে ছোটে!
কায়েস সুদর্শন পুরুষ, বাঙালির চেয়ে ইতালিয়ান দেখে মনে হয়। কায়েস বেশ বড় বিজনেসম্যান। লস অ্যাঞ্জেলেস ওয়েস্ট হলিউড ওয়েস্টে হিলের চূড়ায় ছোটখাটো প্যালেসের মতো তাঁর বাড়ি। এই কায়েসের অতিথি হয়ে এসেছেন বলার চেয়ে কায়েস একপ্রকার জোর করে নির্মলেন্দু গুণকে ধরে এনেছেন তাঁর সাম্রাজ্যে। গুণদার মহাভক্ত কায়েস। এসব ১৯৮৯-এর কথা, এরও আগে বাংলাদেশ স্বাধীনতার পরপর সত্তর দশকের শুরুর দিকে। আমি চট্টগ্রাম ছেড়ে সবে ঢাকা এসেছি। তেমন পাত্তা না পেলেও ভিড়ে গিয়েছি শিল্পীদের চেয়ে বেশি লেখক-কবিদের সঙ্গে। সারাদিন খাই আর না-খাই সন্ধ্যায় ঢাকা নিউমার্কেটে ইনার সার্কেলে ‘মনিকা’ রেস্টুরেন্টে ঠিকই হাজির হতাম। সেখানেই বসত চায়ের সঙ্গে সাহিত্যের আড্ডা, তর্ক-বিতর্ক। অনেক তরুণ ঢাকার লেখক-কবি পাত্তা না দেওয়ার ভান করলেও নির্মলেন্দু গুণ ও আবুল হাসান আমাকে আপন করে নিয়েছিলেন। গুণদার ‘না প্রেমিক না বিপ্লবী’ তখন বেরিয়ে গেছে। আবুল হাসানের ‘রাজা যায় রাজা আসে’ সদ্য বেরিয়েছে। বই হাতে ‘মনিকা’তে এসে কয়েকজনের মধ্যে আমাকেও এক কপি বই দিয়েছিলেন আবুল হাসান। চট্টগ্রাম ইউনিভার্সিটি শেষ করে আসা এক আঁতেল গোলাম-টোলাম কী যেন নাম ছিল, হাঁ হাঁ দাঁড়িয়ে বলেছিল– আরে আবুল হাসান ওকে কেন বই দিচ্ছেন! ও কি কবিতা বুঝবে?
এই ‘মণিকা’ রেস্টুরেন্টে তখন প্রতিভাবান উজ্জ্বল কায়েস বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ দিকের ছাত্র প্রায়ই আসতেন। তখন থেকে কায়েস গুণদার ভক্ত। কায়েস চা-পানি যা খেতেন গুণদা সেই টাকা-পয়সা মিটিয়ে দিতেন। এরপর কায়েসের আমেরিকায় পড়তে আসা এবং শেষ করে ব্যবসার সাফল্যে ধাপে ধাপে প্রায় মিলিয়নেয়ার হয়ে ওঠা। মানুষের টাকা-পয়সা অঢেল হলে নিজের শখ মেটাতে শুরু করে। লস অ্যাঞ্জেলেসে কায়েসের সবই আছে। তাই তিনি প্রিয় নির্মলেন্দু গুণকে প্লেনের টিকেট পাঠিয়ে অল্প কিছুদিনের জন্য নিজের কাছে ঢাকা থেকে লস অ্যাঞ্জেলেসে ধরে এনেছেন। গুণদাও আপত্তি করেননি। তাঁর যাওয়ার কথা ছিল অস্ট্রেলিয়া, স্বপ্ন দেখছিলেন তিনি শিবনারায়ণ রায়ের মেয়ে মৈত্রী রায়ের সঙ্গে।
সত্তর দশকের প্রথম দিকে ড. শিবনারায়ণ রায় মেয়েকে নিয়ে ঢাকায় এসেছিলেন অস্ট্রেলিয়া থেকে। কলকাতায় নয়, মেলবোর্নে মৈত্রী বড় হয়েছে। চালচলনে শিক্ষাদীক্ষায় মৈত্রীর বাঙালির চেয়ে মেয়ের ছাপ বেশ রয়েছে। গুণদা তখন বাংলাদেশের নামি বিজ্ঞাপন কোম্পানি বিটপীতে কপিরাইটার হিসেবে কাজ করেন। আমি তখনও বিটপীতে কাজ ধরিনি। তবে থাকতাম যখন গুণদার সঙ্গে তাঁর আজিমপুর কবরস্থান লাগোয়া টিনের চালা ভাড়া বাসায় একসঙ্গে– গুণদাই থাকতে দিয়েছিলেন– দুপুরে ঘুরেফিরে বিটপীতে হাজির হতাম ঠিক লাঞ্চের আগে। গুণদা সঙ্গে নিয়ে প্রেস ক্লাবে যেতেন এক টাকা পঁচিশ পয়সায় ভাত-ডাল-সবজি-মুরগি কিংবা মাছ দিয়ে দারুণ লাঞ্চ করাতে। নিজেও খেতেন, আমিও খেতাম। পুরোপুরি সাংবাদিক না হলেও গুণদা প্রেস ক্লাবের অ্যাসোসিয়েট মেম্বার, তাই খাওয়ার সুযোগটা ছিল।
ভালোই চলছিল মৈত্রী রায়ের ক্ষণিকের ঢাকা আগমন আর গুণদার সঙ্গে আলাপপরিচয় এবং দ্রুত প্রেম সব ওলটপালট করে দিয়েছিল। দুপুরবেলা বাইরে যে রেস্টুরেন্টে খাব, কাজকাম না থাকায় তত টাকাও ছিল না। তাই ভরসা ছিল গুণদার সঙ্গে এমন দারুণ প্রেস ক্লাবের সস্তা খাওয়া। ছেদ পড়ায় অসুবিধাটা হচ্ছিল। ৩৫ তোপখানা রোডে বিটপীর অফিসের পাশেই ক্যান্টন চায়নিজ রেস্টুরেন্টে মৈত্রী আসতেন, তারপর বিটপী থেকে বেরিয়ে গুণদা সেখানে গিয়ে ঘণ্টাকে ঘণ্টা পার করতেন দুজন। টেবিলে বসে টিসু পেপার ন্যাপকিন পেপারে কলম দিয়ে আঁকিবুঁকি করার অভ্যাস ছিল মৈত্রীর। গুণদার তখন সমুদ্রের স্রোতের মতো কবিতা আসত মাথায়। লিখতেনও দু’হাতে। মানে অনেক কবিতা প্রসব করেছেন সেই সময়। কবিতার বইও তখন বের হলো, নাম ‘চৈত্রের ভালোবাসা’। মৈত্রীর সেই টেবিলে আঁকিবুঁকি দিয়ে প্রচ্ছদ করা হলো।
আমি ক্যান্টন রেস্টুরেন্টে ঢুকে দূরে দাঁড়িয়ে থাকতাম। আমাকে দেখে মাঝেমধ্যে ডেকে বসাতেন, মৈত্রীর সঙ্গে আলাপও করিয়ে দিয়েছিলেন। প্রায় দুপুরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মৈত্রী গুণদাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন– ও কী চায়?
– দুপুরে প্রেস ক্লাবে সস্তায় আমরা একসঙ্গে লাঞ্চ করতাম। ওর সঙ্গে খাওয়া বন্ধ প্রায়, তাই মুশকিলে পড়েছে। প্রেস ক্লাবের মতো সস্তা খাওয়া বাইরে তো পাওয়া যায় না। গুণদা বলেছিলেন। এ রকম সমস্যার কথা শুনে মৈত্রী প্রথমে ধীরে, পরে মিডিয়াম, শেষে জোরে হাসতে শুরু করেছিলেন। কোনোমতে হাসি থামিয়ে বলেছিলেন– চলো আজ আমিও যাব। প্রেস ক্লাবে সস্তায় লাঞ্চ খাব।
মৈত্রী রায়ের মতো স্মার্ট নারী আমি আগে দেখিনি। তখন চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা এইটুকু আমার দৌড়! কই দেখব এমন সুন্দর ফিগারের জিন্স আর শার্ট পরা গলায় স্কার্ফ পেঁচানো সুন্দর নারী। গুণদার তীব্র প্রেম মৈত্রীর প্রতি দেখে ভালোই লাগছিল। শুধু খারাপ লাগত যখন বলতেন গুণদা– আমি ডাকলে চলে যাব অস্ট্রেলিয়া!
ভাবতাম গুণদাকে অস্ট্রেলিয়াতে কি মানাবে! অবশ্য তখন আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী জীবন নিয়ে কোনো ধারণা ছিল না। সেসব দেশে যাওয়া, থাকার কোনো ইচ্ছেও ছিল না। আমার মনে হতো গুণদা ঢাকা নেই– এ রকম হতে পারে কি! গুণদাও মাঝেমধ্যে বলতেন, ওখানে গিয়া আমি পারুমটা কী? আমি ওই জিন্স, প্যান্ট-শার্ট, গরম কোর্ট-জ্যাকেট পরলে চাপাচাপিতে শ্বাস নিতে পারুম না! পায়জামা-পাঞ্জাবি কি অস্ট্রেলীয়া সরকার মাইনা নিবো?
ভাবনা থেমে গেল গুণদার এক ঝটকায় আধখোলা গাড়ির থেকে নিজের মুখ ভেতরে টেনে নিলেন। লাল হয়ে গেছে মুখ এমন গরম।
কায়েস ড্রাইভ করতে করতে বললেন– সরি গুণদা, প্রচণ্ডভাবে এসি চলছে, তবু আপনাকে উইন্ডো বন্ধ করতে বলিনি, যেহেতু খুবই মজা পাচ্ছিলেন বাতাসের দাপটে। তবে আমরা বিশ্বের দ্বিতীয় বড় মরুভূমি মাহাবের কাছাকাছি হচ্ছি। পাশ কাটিয়ে লাস ভেগাসের দিকে চলে যাব। এখানে আপনি মুখ বেরে করলে তিন মিনিটে গরমে ফোস্কা পড়বে।
মাহাবে পার হয়ে আসতেই রেস্ট এরিয়া কিংবা ছোট্ট লোকালয় বাসট্রো। এখানেই রাজু আহমেদ তার হবু মেক্সিকান বধূকে নিয়ে আমাদের সঙ্গে একত্র হবে। তারা এল. এ থেকেই এসেছে অন্যপথে। রাজু ও তার পার্টনার কার্তার সিং একটি মেক্সিকান রেস্টুরেন্ট চালায় সান্তা মনিকা বিচের কাছেধারে। রাজুর হবু বধূ মিলিন্দা গঞ্জালেস সেই রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার। দীর্ঘদিন সঙ্গে কাজ করতে করতে প্রেমের ফুল ফুটেছে। মিলিন্দা গঞ্জালেস খুবই মার্জিত রুচিশীল মেক্সিকান সুন্দরী নারী। তুলনামূলক মেক্সিকান ইংরেজি পেয়েট্রি নিয়ে পড়াশোনা করায় বেশ গভীর ও সুন্দরভাবে জীবনের সব কিছু নেয়। আমরা সবাই ম্যাকডোনালসে বিগম্যাক ও কফি নিয়ে তাদের অপেক্ষায় ছিলাম।
মুশকিলটা হলো দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতে! মানুষের এমন মিল কি সম্ভব– গায়েগতরে চেহারায় মিলিন্দা গঞ্জালেস যে একজন মেক্সিকান মৈত্রী রায়। এটা ঠিকই মেক্সিকানরা অনেকটা ভারতীয় বা বাংলাদেশির মতো রঙে, শারীরিক গড়নে। তাই বলে এমন মিল কীভাবে সম্ভব!
আমি বসে থেকে হাঁ করে রইলাম। গুণদা তো চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। যদিও কায়েস, জামী ভাই কিংবা বাচ্চু ভাই এসবের কিছুই বুঝলেন না।
কাছে আসতে গুণদার সঙ্গে মিলিন্দার আলাপ করিয়ে দিল রাজু আহমেদ। মিলিন্দা হাত বাড়াতে গুণদা তার হাত ধরলেন। ধরলেন তো ধরলেন, ছাড়ছেন না, অপলক তাকিয়ে রইলেন মিলিন্দার দিকে। মিলিন্দা মার্জিত কবিতার মতো মেয়ে। সে বুঝল পয়েট তাকে দেখে খুবই মুগ্ধ হয়েছে। একজন কবির এমন হতে পারে। বিশ্বে যে কোনো দেশের কবি হোক না কেন তারা খুবই সেনিসিটিভ, মিলিন্দা তা জানে। সে গুণদার হাত ধরে থেকেই রাজুর হাত ধরে একটা চাপ দিয়ে বোঝাল– খারাপ কিছু চিন্তা করো না! কবিরা এমনি হয়। আমি মেক্সিকান স্প্যানিশ সাহিত্যে অনেক কবির উত্তাল জীবনের কথা জানি। আমি তোমাদের বাঙালি কবিকে হ্যান্ডেল করতে পারব। কবিরা এ রকম হঠাৎ কোনো নারীকে দেখে মোহগ্রস্ত হয়ে পড়েন।
রাজু আহমেদ জানে মিলিন্দা মার্জিত সুন্দরী যেমন, স্মার্টও তেমনি। তাদের বড় রেস্টুরেন্ট সে-ই সামলায়। তবু তার লম্বা ঢেংগা চুল-দাড়ি মিলিয়ে জংলা বাঙালি কবিকে পছন্দ হলো না! এ কী কথা, দেখামাত্র আরেকজনের হবু বউয়ের হাত ধরে পাথর হয়ে যাওয়া! গুষ্টিমারি কবিটবির।
জামী ভাই ও বাচ্চু ভাই সামলে নিলেন সব। আবার আমরা গাড়িতে বসে ছুটলাম লাস ভেগাসের দিকে। তাদের আগে থেকেই ফোনে বুক করা ছিল সিজারপ্যালেস হোটেল অ্যান্ড ক্যাসিনোতে ডিলাক্স চারটি রুম।
রুমে গিয়ে সবাই স্নান করে কাপড় পাল্টে সারারাতের জন্য ভেগাস স্ট্রিপে রাউন্ড মারতে বের হলো। পৃথিবীর আর কোনো শহরে এমন আলোকসজ্জা অন্তত আমি দেখিনি। সম্ভব হলে সবার একবার অন্তত লাস ভেগাসের রাত দেখে যাওয়া মানে জীবনের এক স্মরণীয় সময় ধরে রাখা। লস অ্যাঞ্জেলেসে আমার দুই বছর প্লেট অ্যাডভান্স মর্ডান পেইন্টিং ইনস্টিটিউটে থাকাকালে ২৭ বার এসেছি কত নতুন আসা বেঙ্গলদের নিয়ে। দুই বছরে আটটি গাড়ি বদল করেছিলাম। ক্যালিফোর্নিয়ার শুধু বড় তিন শহর লস অ্যাঞ্জেলেস, সানদিয়াগো, সানফ্রান্সিসকো ছাড়াও ছোট-মাঝারি সব শহর গাড়ি চালিয়ে কিমা-কিমা বারে ছিলাম আমি। হবু বউয়ের ওপর গুণদার মুগ্ধতা দেখে রাজু আহমেদ যত জেলাস হচ্ছিল, মিলিন্দা ততই তাকে শান্ত করছিল।
গুণদাকে পয়েট, পয়েট করে সব ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিল। বুফেতে প্লেট হাতে তুলে দিয়ে ২০০ আইটেমের মধ্যে মজার কোনো কোনোটি পাতে তুলে দিচ্ছিল মিলিন্দা। সে একজন কবিকে শিশুর মতো যত্ন করছিল। আমরা সবাই যখন জুয়ার বোর্ড কিংবা স্লট মেশিনে কয়েন ফেলে জেতা-হারায় মহাব্যস্ত গুণদা ও মিলিন্দা বিশাল নরম সোফায় বসে কবিতাচর্চা করছেন। নিজের কবিতা ইংরেজিতে গুণদা মিলিন্দাকে বোঝাতে চেষ্টা করছেন। মিলিন্দা গঞ্জালেস ও তার প্রিয় মেক্সিকান কবিদের ইংরেজি অনুবাদ পড়ে শোনাচ্ছে। দু-একজন মেক্সিকান কবির কবিতা গুণদা দেশে থাকতে ইংরেজিতে পড়েছেন শুনে সে কি আনন্দ মিলিন্দার। পড়তে এসে এক যুগে মিলিন্দা আমেরিকান হয়েছে ঠিকই, তবে ভেতরে রয়ে গেছেন পুরো মেক্সিকান ভাষা পছন্দে স্প্যানিশ। গুণদার সঙ্গে কবিতা আদান-প্রদান মিলিন্দার; হাসিখুশি রাজু আহমেদও বুঝেছে– এ এক নিষ্পাপ হবু বউয়ের কাব্যপ্রেম। তবু রাজু আমার কিংবা গুণদার সঙ্গে তেমন কথা বলা পছন্দ করছিল না। তবে মিলিন্দার সাহিত্যসমৃদ্ধ রুচি-পাণ্ডিত্যের কাছে রাজু আহমেদকে ডলারসমৃদ্ধ ফুটানির বাক্স ছাড়া কিছু মনে হচ্ছিল না।
কায়েস, জামী ভাই ও বাচ্চু ভাই ব্যাপারটা মোটেই সিরিয়াসভাবে নেননি। কায়েস গুণদাকে ভালো করে জানেন পছন্দের সাহিত্যমনা মানুষ পেলে জমে যান। পরে কে কোথায় চলে যায় সারাজীবন হয়তো আর দেখাই হয় না। রাত গেল তো রাত গেল। লাস ভেগাস রাতেই জীবন্ত হয়ে ওঠে। দিনে মৃত নগরী প্রায়।
নিজ নিজ রুমে মিজার্স প্যালেস হোটেল ক্যাসিতে সবার ঘুম ভাঙে সকাল সাড়ে ১০টায়। ১১টা পর্যন্ত দেড়শ আইটেমের বুফে নাশতা থাকে। যতই ইচ্ছে যতবার ইচ্ছে খাও!
ভেগাস ছেড়ে ফেরার পালা। দুই বাড়িতে ভাগ হয়ে শুরু ফিরতি যাত্রা। গুণদা ও মিলিন্দার যেন অনেক কথা বাকি রয়ে গেছে। রাজু আহমেদ মেক্সিকান হবু বউ নিয়ে যেতে পারলেই যেন বাঁচে। ঘণ্টা দেড়েক ড্রাইভ করার পর আবার সেই বাসট্রো রেস্ট এরিয়া ছোট্ট এলাকায়। এখান থেকেই দুই গাড়ি দুই দিকে ভিন্ন ফ্রিওয়ে ধরবে। আবার ম্যাকডোনালস আবার চাঙ্গা হতে কফি ব্রেক।
বিদায় নিতে মিলিন্দা গুণদাকে জড়িয়ে ধরে– হাগ বার লো করে গুড বাই বলল। গুণদা সবাইকে কাছে আসতে বলে পাঞ্জাবির পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করলেন। রাজু আহমেদ দূরেই দাঁড়িয়ে ছিল। গুণদা হাত নেড়ে কাছে ডাকলেন।
সবাই কাছে আসতে মানিব্যাগের ভেতর সযত্নে রাখা ছবিটি দেখালেন– মৈত্রী রায়ের সাদাকালো ছবি। আমি ছাড়া সবার অবাক হয়ে মুখ হাঁ হয়ে গেল। এ তো হুবহু মিলিন্দার ছবি। কীভাবে হাজার হাজার মাইল দূরে দুই মহাদেশের দুজন নারী এমন এক ধাঁচের হয়, সত্যিই অবাক হবারই কথা।
গুণদা খুবই মৃদুকণ্ঠে বললেন– সি ইজ মাই লস্ট লাভ! মিলিন্দা গঞ্জালেস আরেকবার গুণদাকে জড়িয়ে হাগ করতে দু্ই গালে গাল ছোঁয়াল। তারপর চলে গেল।
আমরা ফ্রিওয়ে ১৫ ধরে ফিরছি লস অ্যাঞ্জেলেস। পাশ কাটিয়ে যাচ্ছি মরুভূমি মাহাবে। মাথার ওপর গনগনে প্রচণ্ড তাপশীল সূর্য। কায়েসের সেভেন সিরিজে বিএমডব্লিউর ভেতরে হিমশীতল এসির ঠান্ডা। তবু গুণদার চুলদাড়ির জংলা মুখে ঘাম চিকচিক করছে।
- বিষয় :
- প্রেম
