ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

যে খুশি ছড়িয়ে যায় সবখানে

যে খুশি ছড়িয়ে যায় সবখানে
×

শিল্পকর্ম :: জামাল আহমেদ

মোহাম্মদ ইউনুস, চিত্রকর

প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬ | ০৮:০১

| প্রিন্ট সংস্করণ

ঈদুল আজহা অন্যান্য উৎসব থেকে অনেকখানি আলাদা। এর গূঢ় মর্মবাণী বড় হয়ে বুঝতে শিখেছি। ছোটবেলায় এর রোমাঞ্চের অংশটুকুই ছিল বড়। 
আমাদের ঠাকুরগাঁওয়ে ‘কালী মেলা’ নামে একটা খুব বড় মেলা হতো। মেলার একটা অংশে যত বড় গরুর হাট বসত, তত বড় হাট ঠাকুরগাঁওয়ে আর ছিল না। কোরবানির জন্য সেখান থেকে আমরা পছন্দ করে গরু কিনতাম। এ নিয়ে আমাদের অপেক্ষা, উৎসাহের শেষ ছিল না। আমাদের মতো জোতদার গৃহস্থ পরিবারে গরুর খামার ছিল সাধারণ ব্যাপার। সুতরাং কোরবানির সময় হঠাৎ গরু নিয়ে বিশেষ কোনো আহ্লাদ ছিল না আমাদের। কিন্তু উৎসব উপলক্ষের কারণে গরু কেনা, কখনও গরু ছুটে গেলে খোঁয়াড় থেকে এক-দু টাকা দিয়ে ছাড়িয়ে নিয়ে আসা, তার যত্ন করা– এসব নিয়ে কত রকম গল্পের জন্ম হতো তার শেষ আছে? 
আমার বাবার দীক্ষা, কোরবানির পশুকে সময় দিতে হবে। খাওয়াতে হবে, যত্নআত্তি করতে হবে, যেন তার ওপর মায়া জন্মায়। কথাগুলো তখন শুধু কথা হিসেবেই শুনে গেছি, বুঝতে পারিনি। পরে বুঝেছি। স্রষ্টার সন্তোষের জন্য, মানুষের কল্যাণের জন্য নিজের প্রিয় বস্তুটি, মায়া পড়ে যাওয়া প্রাণীটি উৎসর্গিত হবে। এই উৎসর্গ করতে পারা, বিসর্জন দিতে পারার মন যেন তৈরি হয়, উৎসবের পেছনের এই বার্তার সামাজিক ও রাষ্ট্রিক গুরুত্ব কিন্তু অপরিসীম। কোরবানির পশুকে নিয়ে আসা, পালন করাকে ঘিরে উচ্ছ্বাস কাজ করলেও, শিশুমনে রক্তপাত ভীতির সঞ্চার করত না এমন নয়। কিন্তু আমার বাবা চাইতেন, ছোট অবস্থাতেই যেন কোরবানি আমরা চাক্ষুষ করি। বৃহত্তর কল্যাণে মায়া কাটানোর এই দীক্ষা যেন শৈশব থেকেই পাই। বাবার এই চাওয়ার তাত্ত্বিক গুরুত্ব ছিল। কতটা আত্মস্থ করতে পেরেছি জানি না।
তাছাড়া আজকাল কোরবানির ঈদের সঙ্গে, কোরবানির পশুর সঙ্গে সেই সম্পর্ক-সংশ্রবও কেটে গেছে বলা যায়। এখন অনলাইনে গরু কিনে খামারে টাকা পাঠিয়ে দিই। তারা আমাদের নামে কোরবানি দিয়ে মাংস বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে যায়। মায়া কাটা পড়ছে। তবে আর সব নতুন-সাধারণের মতো, পাশাপাশি এর একটা সাদা দিক হচ্ছে, বর্তমানের নিরিখে, পরিবেশ অনেকখানি রক্ষা পায়। আমরা যখন ছোট, মাঠেই কোরবানি হতো এবং একটা গর্ত করে সব বর্জ্য সেখানে ফেলে মাটিচাপা দিয়ে দিতাম, মিটে যেত। এখন শহরের মানুষের রাস্তা ছাড়া গতি নেই। মানুষের নাগরিক সুবোধও লোপ পেয়েছে। কোরবানির পশুর রক্ত-বর্জ্য পড়ে থাকে যত্রতত্র। এ নিয়ে সরকারি যথোপযুক্ত উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান আগাম জানিয়ে রাখছি।  
ছোটবেলায় এ ঈদকে ঘিরেই সবচেয়ে বড় জনসমাগম ঘটতে দেখেছি। শহরে থাকলেও গ্রামে আমাদের মূল পরিবার ছিল যেখানে আমার দাদা, বাবা জন্মেছেন। রক্তের সম্পর্ক আছে এমন এবং সেইসঙ্গে নেই তবু বংশানুক্রমে আত্মার যোগ তৈরি হয়ে গেছে এমন বিপুলসংখ্যক নির্ভরশীল মানুষ ছিলেন আমাদের বৃহত্তর সংসারে। শহরের বাড়িতেও আত্মীয়-স্বজন কম ছিলেন না। কোরবানির দুরূহ প্রক্রিয়া সাধনে তাই কখনও বাইরের মানুষের দ্বারস্থ হতে হয়নি। নিজেরাই সম্পন্ন করতে পেরেছি। কোরবানির পর মাংস তিন ভাগে ভাগ করতে হয়। বিষয়টা সতর্কতার সঙ্গে তখনও মান্য করা হতো, এখনও করি। এক ভাগ নিজের কাছে রেখে বাকি দুই ভাগ বিলিয়ে দেওয়ার ভেতর ঈদের মূল আনন্দ লুকিয়ে থাকে। 
এই আনন্দটুকু যখন বুঝতে শিখেছি, রোজার ঈদের মতো এই ঈদে কেন নতুন জামা সেভাবে পাচ্ছি না তা নিয়ে আক্ষেপ ধীরে দূর হয়ে গেছে। মনে জেনেছি, এই ঈদটা একটু অন্যরকম। অপরের বাড়িতে মাংস নিয়ে যাওয়া-আসার কাজটা এখন আর করতে হয় না। ছোটবেলায় খুব উৎসাহের সঙ্গে করতাম। অভাবীদের ভেতর মাংস বিলিয়ে দেওয়ার বিষয়টি থাকায় এই ঈদের আলাদা রকম সমানুভব-গুরুত্ব ছিল। নানা রকম অর্থনৈতিক সক্ষমতার পরিবার ছিল চারপাশে। সবার পক্ষে কোরবানি দেওয়া সম্ভব হতো না। যেসব পরিবারে কোরবানি হয়নি তাদের ঘরে মাংস দিয়ে আসতে পেরে দারুণ ভালো লাগত।

যেহেতু আমি ছবি আঁকি, আঁকার ভুবনে জীবনের সব ঘটনা ও আনুষঙ্গিকতার প্রভাব পড়বেই। কোরবানির প্রভাবও যে আছে তা নিতান্তই স্বাভাবিক। বাবার দীক্ষা, মায়া ও বিসর্জনের নানা চিন্তা-ভাবনা আমার আঁকায় প্রভাব ফেলেছে। দার্শনিক প্রভাবের বাইরে একটি বিশেষ বস্তুজাত প্রভাবও বিদ্যমান। বস্তুটি গরুর শিং। শিংয়ের প্রতি আমার আলাদা দুর্বলতা আজও আছে। আমার আঁকা ছবিতে বিভিন্ন সময়ে শিং এসেছে। অনেকেই আমাকে এখনও কোরবানির গরুর শিং পাঠিয়ে দেন। আঁকার কাজে ব্যবহার করি। আমার চিত্রশৈলীতে টেক্সচার একটা বড় জায়গা দখল করে আছে। শিংয়ে চমৎকার প্রাকৃতিক টেক্সচার আছে। তাছাড়া এতে অনেক সময় রং ব্যবহার করা হয় এবং সেই রং যখন উঠে-উঠে যায়, নান্দনিক টেক্সচার তৈরি হয় সেখানেও। তেমন টেক্সচার আমি অনেক ছবিতে নিয়ে এসেছি। ছাত্রাবস্থায় যখন জাপানে গ্র্যান্ড অ্যাওয়ার্ড পাই, তখনও আমার ছবিতে শিংয়ের উপস্থিতি ছিল। ছবিতে তা আলাদা স্থানিক ও ঐতিহ্যগত গুরুত্ব যোগ করেছিল।
এই ঈদ বিসর্জনের পশুর দিক থেকে সনাতন ধর্মীয় বন্ধুদের বিশ্বাসগত অবস্থানের চেয়ে খানিক আলাদা। তাই তারা তেমন একটা আসত না কাছে, যেমনটা আসত রোজার ঈদে। তবে এ নিয়ে কোনো ধরনের বিরূপ ধারণা বা অভিব্যক্তি তাদের ভেতর ছিল না। আমাদের দিক থেকেও কোনো উন্নাসিকতা ছিল না। কোরবানির মতো ধর্মানুষ্ঠান অতি প্রাচীন এবং সব ধর্মেই কমবেশি রয়েছে। শুধু প্রাণীর ধরনের দিক থেকে এবং আচারনিষ্ঠার দিক থেকে বিষয়গুলো ব্যতিক্রম। রোজার ঈদ প্রসঙ্গে কিছু কথা মনে এলো। আমাদের ঠাকুরগাঁওয়ে অসংখ্য সনাতন সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস। তখন সংখ্যানুপাত আরও বেশি ছিল। অথচ যৌথভাবে কী আনন্দ যে হতো আমাদের, তা আজকের দিনে স্বপ্নের মতো মনে হয়। এখন নিশ্চয়ই মানুষ ভাবতে পারবে না, আমাদের হিন্দু বন্ধুরাও সেহরির সময় কাঁসা পিটিয়ে আমাদের ডেকে তুলে দিত এবং আমরা মুসলমানের ছেলেমেয়েদেরও পূজা-পার্বণে ঢাকের তালে মন কম নেচে ওঠেনি। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে শুধু সদিচ্ছা ভিন্ন আর কিছুর প্রয়োজন হয় বলে মনে হয় না। যখন আজকের নানা অপ্রীতির কথা শুনি চারপাশে, তখন মর্মাহত হই। মানুষ মানুষের জন্য। ঈদসহ সব সামাজিক উৎসবকে নিজ নিজ সদিচ্ছায় চাইলেই প্রত্যেকের উৎসবে পরিণত করা যায়। জাতি ও সম্প্রদায় নির্বিশেষে মানুষের প্রতিটি উৎসব বারবার যেন এ কথাই মনে করিয়ে দিতে চায়। কোরবানির ঈদও ব্যতিক্রম নয়। মানবকল্যাণে বৈষম্যকে কোরবানি দিতে হবে। বৃহত্তর প্রেমের স্বার্থে অহম ও ক্ষুদ্র স্বার্থচিন্তাকে কোরবানি দিতে হবে। তবেই কোরবানির ঈদ এর সম্প্রদায়গত গণ্ডি পেরিয়ে দর্শন ও মাহাত্ম্যের দিক থেকে সবাইকে স্পর্শ করে শুভ বার্তাটুকু পৌঁছে দিতে পারবে। 

আরও পড়ুন

×