গল্প
বড়াল নদীর বজরা
ছবি এঁকেছেন রজত
গল্প লিখেছেন জাকির সেতু।।
প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:০৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
বৈশাখের তপ্ত দুপুর। কাঠ ফাটা রোদ যেন! এই গরম উপেক্ষা করে দাদু নদীতে গোসল করার জন্য বাড়ি থেকে বের হলেন। ছোট্ট জুরাইন দাদুর সঙ্গী। তারা দুজন দিনমান একে অন্যের গায়ে লেগে থাকে। রাজ্যের গল্প দুজনের। বাড়ির পাশেই বড়াল নদী। এই নদী নিয়ে দাদাভাইয়ের কতো কতো স্মৃতি! যদিও নদী এখন ছোট হয়ে গেছে। পাড় দখলের পর নদীতেও নেমে এসেছে মানুষের থাবা! জায়গায় জায়গায় ভরাট করে দোকান তুলেছে। কেউ কেউ করেছে বাড়ি। অনেক গাছও জন্মেছে। দাদাভাই আর জুরাইনকে দেখে জুনায়েদ এগিয়ে এলো। সঙ্গে ফাহাদও নদীর ঘাটে এলো। জুনায়েদ দাদুকে বলে, ‘আচ্ছা দাদা ভাই, তুমি তো অনেকদিন পর নদীতে গোসল করতে এলে। আগের মতো নদীতে গোসল করো না কেন?’
দাদা ভাই, জুনায়েদের কথা শুনে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, ‘বড়াল তো আর আগের মতো নেই রে দাদুভাই; এই নদীতে এক সময় পালতোলা নৌকা চলতো। বড় বড় বজরা নৌকা আসতো কতো দূর দেশ থেকে!’
জুরাইন ও ফাহাদ একটু নড়ে চড়ে বসলো। দাদাভাই স্মৃতির ঢালি খুলে বসলেন, ‘রোজ এই বড়াল নদী দিয়ে কতো কতো মানুষ আসতো এই গ্রামে। এই গ্রামের ফসল নিয়ে অসংখ্য নৌকা দূর-দূরান্তে চলে যেতো। এই বড়াল যেতে যেতে যমুনায় গিয়ে পড়েছে। যমুনা থেকে কতো নৌকা আসতো এই গ্রামে। আবার কিছু নৌকা এপার-ওপার যাত্রী পারাপার করতো। আমরা তো নৌকায় ডেমরা, ফরিদপুর, ভাঙ্গুড়া চলে যেতাম। নদীর ওপারে হিন্দুপাড়া ছিল। সেই পাড়ার পেছনে বিশাল পাথার। বর্ষায় সেখানে অথৈ পানি। কিছু নৌকা পাথার দিয়েও যেতো। বড় বজরাগুলোতে ধান, চাল, গম, মসুর, ভুট্টাসহ কতো রকমের খাবার গ্রাম ও শহরে পৌঁছে দেওয়া হতো। আমাদের সময়ে নদীকেন্দ্রিকই ছিল সব কাজ।’
দাদু থামতেই জুনায়েদ জানতে চায়, ‘দাদু, তুমি কতোদূর পর্যন্ত এই নৌকা দিয়ে চলাচল করেছো?’ দাদু বলেন, ‘অনেক দূর; প্রায় দুই-তিন দিন লেগেছে। এমন দূরত্ব পাড়ি দিয়েছি।’ জুরাইন অবাক হয়ে জানতে চায়, ‘এই দুই-তিন দিনে কতো কিলোমিটার পাড়ি দিতে?’
দাদু বলেন, ‘এই ধরো এখনকার হিসেবে সত্তর-আশি কিলোমিটার।’ দাদু ফের বলতে শুরু করেন, ‘বড়াল নদীর পাড় ঘিরে কতো আনন্দ উল্লাস ছিল। আহ, শৈশবের দিনগুলো! গ্রামের সবাই একসাথে একই ঘাটে গোসল করতাম। দুপুরবেলা গ্রামের প্রায় সব মানুষই নদীর ঘাটে আসতো। গ্রামে তিনটি ঘাট ছিল। নদীর ওপারের হিন্দুপাড়ার ছেলেমেয়েরা গোসল করতে নেমে সাঁতরে এপারে চলে আসতো। কিছু মানুষ গবাদিপশু গোসল করানোর জন্য নদীর ঘাটে নিয়ে আসতো। বর্ষার মৌসুমে এই নদীতে প্রচুর মাছ ধরা পড়তো। আমরা হাতজাল দিয়ে অনেক চিংড়ি মাছ ধরেছি। বেলে মাছ, টেংরা মাছ, বাইন মাছ, বাঁশপাতারি মাছ, ঘারিয়া মাছ, কাকিলা মাছ–এমন নানা মাছ পাওয়া যেতো। চাঁদা মাছ আমার কাছে খুবই ভালো লাগতো দাদুভাই। এই নাগডেমরা গ্রামের মানুষ সারাদিনের কর্মব্যস্ততার পর বিকেলে বরশি দিয়ে মাছ ধরতো। বিকেলে নদীর ঘাটে মানুষের আড্ডা বসতো। নদীর পাড়ে ডুমুর গাছে বসে ডাকতো অসংখ্য পাখি।’
দাদু গল্প বলতে বলতে হঠাৎ আকাশে মেঘের ডাকাডাকি শুরু হলো। দাদু জুনায়েদ ও জুরাইনকে বলেন, ‘তাড়াতাড়ি গোসল করে চলো বাড়ি ফিরে যাই। অন্যদিন এই নদী সম্পর্কে আবার বলবো তোমাদের। বৈশাখের এই সময়টা ভালো না! বাইরে থাকা ঠিক হবে না।’
দাদা ভাইয়ের সঙ্গে তারা বাড়ির পথ ধরে। তবে তাদের মন পড়ে থাকে বড়াল নদীতে!
- বিষয় :
- গল্প
