গল্প
মায়ের সাথে ঈদ
ছবি এঁকেছেন রজত
লিখেছেন মাসুম মাহমুদ
প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৬ | ০৭:০৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
অদ্রি, অরণ্য, অর্ণব তিন ভাইবোন। বাবা, মায়ের কাছে প্রতি ঈদে ওদের নানা রকম বায়না থাকে। নতুন জামা-জুতো তো বটেই; সেই সাথে ঘড়ি, চশমা, কসমেটিকস এসবও চাই। এবার উল্টো। এবারের ঈদে এসবের কিচ্ছু চায় না ওদের। চায় অন্য কিছু। তটিনীর চাই অরণ্য, অরণ্যের চাই অর্ণব, অর্ণবের চাই তটিনী।
ব্যাপার খোলাসা করে বলা যাক। সেদিন ছুটির দিন। সকালে নাশতার টেবিলে বাবা বললেন, ‘ঈদের তো আর বেশি দেরি নেই। তোমাদের কার কি চাই এখনও বললে না তো!’ বাবার কথা শেষ না হতেই অদ্রি বললো, ‘এবার ঈদে জামা, জুতো, কসমেটিকস কিচ্ছু চাই না, বাবা।’
আমি চাই এবারের ঈদে তুমি আমায় বন দেখাতে নিয়ে যাও। গহীন বনের ভেতরে হেঁটে হেঁটে শাল, গর্জন, শিমুল গাছের পাশাপাশি নানা রকম ভেষজ উদ্ভিদ ও লতাগুল্মের সমাহার দেখবো, বালির ওপর মায়া হরিণ বা বুনোশূকরের পায়ের ছাপ দেখবো। এসব দেখতে খুব ভালো লাগবে আমার।’ অরণ্য বললো, ‘এবারের ঈদে আমিও নতুন জামা-জুতো চাই না বাবা। আমি চাই আমায় সমুদ্র দেখাতে নিয়ে যাও। সমুদ্রের অদূরে দাঁড়িয়ে তার আছড়ে পড়া ঢেউ দেখবো, সূর্যের ওঠা এবং ডুবে যাওয়ার দৃশ্য দেখবো। তাতেই আনন্দে ভরে উঠবে আমার মন।’
অর্ণব বললো, ‘ওদের মতো আমারও জামা, জুতো চাই না। তার চেয়ে তুমি আমায় পাহাড়ে বেড়াতে নিয়ে যাও। পাহাড়ের ওপর মেঘের ভেসে বেড়ানো দৃশ্য দেখবো, পাহাড়ের বেয়ে নেমে আসা পরিষ্কার পানির ঝর্ণা দেখবো, হাঁটবো পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথে। ইস; কী যে আনন্দ হবে!’
ওদের কথা শুনে অবাক বাবা, মা। এতোটুকুন বয়সে ওরা এতো সুন্দর করে ভাবতে শিখে গেছে! একটুখানি কী ভেবে বাবা বললেন, ‘কিন্তু তোমাদের মায়ের শরীর, মন বেশি ভালো নেই। ঈদে কোথাও বেড়াতে গেলে যে মাকে ছাড়াই যেতে হবে। যাবে মাকে ছাড়া?’ তিন ভাইবোন একসাথেই বলে উঠলো, ‘যাবো বাবা, যাবো।’ অদ্রি বললো, ‘বন থেকে মায়ের জন্য হরেক রকম বুনোফুল নিয়ে আসবো। ফুলের গন্ধে ভালো হয়ে যাবে মায়ের মন।’
অর্ণব বললো, ‘পাহাড় থেকে মায়ের জন্য নিয়ে আসব পাহাড়ি গহনা। মাটির গহনা, পাথরের গহনা। মা কানে পরবে, নাকে পরবে, গলায় পরবে। কী সুন্দর লাগবে মাকে দেখতে! মায়ের সব অসুখ ভালো হয়ে যাবে।’ অরণ্য বললো, ‘আমি ওদের মতো সাথে করে নিয়ে আসব না। আমি সমুদ্রতীরের রোদকে বলবো–ও রোদ, তুমি এক্ষুনি চলে যাও আমায় মায়ের কাছে। তার মন ভালো করে দাও। হাওয়াকে বলবো–ও হাওয়া, এক্ষুণি গিয়ে আমার মায়ের শরীরটা ভালো করে দাও।’ ওদের কথা শুনে কি ভেবে মা বললো, ‘ঠিক আছে, বাবার সঙ্গে ঈদে বেড়াতে যাবে যাও। একবারে তিন জায়গায় তো আর যাওয়া সম্ভব নয়, অতো সময়ও পাওয়া যাবে না। এবারের ঈদে কোথাও এক জায়গায় বেড়াতে যেতে পারো। কিন্তু কোথায় যাবে? পাহাড়ে, সমুদ্রে নাকি বনে? সেটা তোমরা আলোচনা করেই
ঠিক করো।’
তিন ভাইবোন আলোচনায় বসে গেলো। অনেকক্ষণ আলোচনা করেও একক কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারলো না। সবাই যার যার সিদ্ধান্তে অটল। অদ্রি বনেই যেতে চায়, অরণ্য সমুদ্রেই যাবে আর অর্ণব পাহাড়ে। এই অবস্থায় ওরা ঠিক করল ওদের নানা ভাইকে ফোন করবে। ফোনে জিজ্ঞেস করবে এই ঈদে কোথায় বেড়াতে গেলে ভালো হয়, পাহাড়, সমুদ্র নাকি বনে? নানা ভাই যে জায়গাটির কথা বলবেন বাকি দুজন সানন্দে সেখানেই যাবে। যেই ভাবা সেই কাজ। মায়ের থেকে মোবাইল নিয়ে এসে নানা ভাইকে ফোন করলো। ওপাশে ফোনটা ধরেই নানা ভাই বললেন, ‘হে রে বল, অদ্রির মা।’ এ পাশ থেকে অদ্রি বললো, ‘নানা ভাই আমি অদ্রি।’
ও, অদ্রি! ভালোই হয়েছে তোকে পেয়ে। শোন না! আগামী পরশু তোর নানিসহ আমি তোদের বাড়িতে আসছি। এবারের ঈদটা আমরা তোদের ওখানেই করবো। ঈদের দিন বিকেলে সবাই মিলে তোদের বাড়ির পাশে যে নদীটা আছে, ওখানে বেড়াতে যাবো। নদীর নামটা জানিস তো? ফুলেশ্বরী। নদীরও ঈদ আছে জানিস! ঈদের দিন কেউ নদীর কাছে গেলে নদী খুব আনন্দ পায়। নদীর বুকে কান পাতলে শুনতে পাবি তার সব উচ্ছ্বাসের শব্দ। নদী মনে করে তার সন্তানরা এসেছে। সন্তানদের ছাড়া ঈদ ভালো লাগে বল! মাকে ছাড়াই বা কোনো সন্তানের ঈদ ভালো লাগে! তাই এবার আমি ঠিক করেছি তোদের সবাইকে নিয়ে ফুলেশ্বরী নদী মায়ের সাথে ঈদ করবো।’
অদ্রি ফোনের লাউড স্পিকার দিয়ে রেখেছিল। অরণ্য আর অর্ণবও শুনলো নানা ভাইয়ের কথা। তারপর ওরা ঠিক করলো ঈদে কোথাও যাবে না। ফিরে গিয়ে বাবা-মাকে জানিয়ে দিল ওদের সিদ্ধান্তের কথা। বললো, ‘এই ঈদে আমরা কোথাও যাচ্ছি না, বাবা। ঈদ করবো আমাদের ফুলেশ্বরী মায়ের সঙ্গে।’ এই কথা শুনে মা খিলখিলিয়ে হেসে দিলেন।
উল্লেখ্য, ফুলেশ্বরী অদ্রি, অরণ্য, অর্ণবের মায়ের নামও।
- বিষয় :
- গল্প
