ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

গল্প

না মানে না

না মানে না
×

ছবি এঁকেছেন রজত

লিখেছেন নাসরীন মুস্তাফা

প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬ | ০৭:১১

| প্রিন্ট সংস্করণ

­ও  কামরুল, কামরুল, কামরু-ল-ল-ল! এইভাবে কামরুল বলে ডাকছিল যে, সে কামরুলের ছোট ভাই ভিমরুল! 
অবাক হচ্ছো? ভাবছো, ভিমরুল কারও নাম হয় না কি? 
ঠিক তাই। ভিমরুল তো মৌমাছির মতো। উড়ে বেড়ায়। কামড়ে দিলে ফুলে যায় জায়গাটা। আর যে ব্যথা! সাত দিন লাগে সারতে। তাহলে কামরুলের ভাইয়ের নাম ভিমরুল কেনো?
কামরুল নিজেই দিয়েছে নামটা। কিছু একটা চাইলে চাইতেই থাকে। না দেওয়া পর্যন্ত থামে না। বিরক্ত করবে। কামরুলকে তখন আর ভাই বলে ডাকবে না। ডাকবে নাম ধরে। সেই নাম বলতেই থাকবে। এখন যেমন বলছে। এখন চাইছে কামরুলের লাল ঘুড়িটা।
দুই ভাই পড়ে সদর মাদ্রাসায়। কামরুল কাল দশ পারা কোরআন শরিফ হেফজ শেষ করেছে। মন দিয়ে তেলোয়াত করে। উচ্চারণ ঠিক হয়। ভুলে যায় না কিছুই। ভারি ভালো লাগে শুনতে। মাদ্রাসার বড় হুজুর খুশি হয়েছেন খুব। কামরুলকে একটা লাল ঘুড়ি উপহার দিয়েছেন।
কামরুল ভাইকে বলেছে, তুই এখন আমপারা পড়ছিস্। মন দিয়ে পড়। ভালো পারলে তুইও উপহার পাবি। 
সেই উপহার যখন পাবে তো পাবে। এখন কেনো কামরুল ওকে লাল ঘুড়িটা দেবে না?
ছুটিতে বাড়ি এসে কামরুল ছুটে গেছে মাঠে। লাল ঘুড়ি ওড়াবে। ওর পেছন পেছন ছুটে গেছে ভাই। আর গেছে ওদের বাছুরটা। লালি ওর নাম। 
আকাশে তখন রংধনু উঠেছে। মিষ্টি বাতাস বইছে। লালি নাচছে। কামরুল মন দিয়ে সুতা টানে আর লাটাই ঘোরায়। এই সময় কেউ বিরক্ত করলে ভালো লাগে? একনাগাড়ে ভাইটা বলছে, কামরু-ল-ল-ল; আমাকেও একটু উড়াতে দাও! 
কামরুল চোখ একটুও সরায় না ঘুড়ি থেকে। বলে, আজ না। আজ আমিই উড়াবো। লাল ঘুড়ি যাবে রংধনুর বাড়ি। হাহ্ হা!
দাও না। দাও না। দাও না-আ-আ!
কামরুল মুখ শক্ত করে বলে, না। না মানে না। 
এরপর কামরুল টের পেলো ওর হাতে টান লাগছে। রাগে চেঁচিয়ে উঠে বলে, ভিমরুল! হাত ছাড় বলছি। 
লাল ঘুড়ি দাও।
আজ না। কাল।
আজ দাও। দাও-ও-ও।
এ কী বিপদ! কামরুল ঠিক মতো ধরতে পারছে না লাটাই। সুতা আর কী ছাড়বে? ঘুড়িটা গোত্তা খাচ্ছে বাতাসে। সুতা কেটে উড়ে না যায়। ও সবকিছু সামলানোর চেষ্টা করে। পারে না। চেঁচিয়ে বলে, সুতা কেটে গেলে তুইও পাবি না ঘুড়িটা। ছাড় বলছি।
তাহলে দাও। 
না। না-আ-আ-আ! 
সামলানো গেলো না। বিপদ এলো-ই। ঘুড়িটা নিচে নেমে এসে পড়ে গেলো কোথাও। তখন দুই ভাই মুখোমুখি। একজন আরেকজনের দিকে তাকায়। ছোটভাই ভ্যা করে কাঁদে। বলে, ঘুড়ি হারিয়ে গেছে! ও তো পথ চিনে বাড়ি ফিরতে পারবে না। ও তো একটা ঘুড়ি, তাই না ভাই? 
ঘুড়ি হারিয়ে দুঃখ পাচ্ছে কামরুলও। ও কাঁদে না, বড়রা কাঁদে না তাই। ছোটভাইকে বলে, ইমরুল! কতবার বলেছি, যখন কেউ না বলে, তখন সেই না শুনতে হয়। মানতে হয়। জোর করতে হয় না। একদম না। 
ইমরুল আসলে ইমরুল। ভিমরুল না। মাথা নাড়িয়ে বলে, মনে ছিল না। আমি ভেবেছিলাম...। 
কী ভেবেছিলি?
ভাইয়ের সাথে ভাগাভাগি করবো।
কামরুল ইমরুলের চোখ মুছে দেয়। বলে, ভাগাভাগি ভালো। কিন্তু সেটা নিজের ইচ্ছেয় হতে হবে। জোর করে না। ভাইয়ের সাথে না। বন্ধুর সাথে না। কারোর সাথেই না। নিজের ইচ্ছে কারোর উপর চাপিয়ে দেয়া যাবে না। জোর করেও না। 
না মানে না। তাই না ভাই? ইমরুল ভাইকে জড়িয়ে ধরে। বলে, আমার জন্য ঘুড়ি উড়াতে পারলে না। দুঃখিত ভাই। ঠিক আছে। এরপর ঘুড়ি পেলে তুমি আগে উড়াবে। চাইলে পরে আমাকে দিও। হ্যাঁ, ভাই? 
কামরুল না হেসে পারে না। ঘুড়িই নেই। ঘুড়ি উড়ানোর ভাগ ঠিক করছে। এই না হলে ভিমরুল!
ঠিক তখন লালি আসে নাচতে নাচতে। ঘাস খেতে খেতে একটু দূরে গিয়েছিল। গাছের আড়ালে ছিল। ঘুড়িটা পড়েছে ওখানেই। লালির পিঠে বসে আছে ওটা। সুতা পেঁচিয়ে গেছে লেজে।
কী খুশি ইমরুল! ঘুড়িটাকে ওড়ানোর ব্যবস্থা করছে কামরুল। ইমরুল বলছে, ওড়াও ভাই, ওড়াও। ঘুড়িকে রংধনুর বাড়ি পাঠাও। 
এবার কামরুল ঘুড়ি ওড়াতে আরও আনন্দ পেলো। আগের মতো ভাইটা বিরক্ত করছে না। ঘুড়ি উপরে ওঠে, ইমরুল হাততালি দেয়। একটু সময় উড়িয়ে কামরুল লাটাই দেয় ইমরুলকে। বলে, এখন তুই ওড়াতে পারিস্। 
সত্যি? 
সত্যি। 
এখন না, না?
না। এখন হ্যাঁ।
কারণ?
কারণ, আমার ভাই আমার কথা শুনেছে। ইমরুল লাটাইয়ের দখল নেবে কি! ভাইকে জড়িয়ে ধরে জোরে। তারপর বলে, আমি উপহার পেলে কী করবো, জান? তোমার সাথে ভাগাভাগি করবো।
যদি আমি না করতে চাই?
ইমরুল চিন্তায় পড়ে। সে কী! দিতে চাইলেও নেবে না? এমনও হয় না কি?
কামরুল হাসে। বলে, উহু! জোর করে কিছুই হবে না। না মানে না। মনে থাকবে?
খুব মনে থাকবে। এরকম ভাব করে মাথা দোলাতে গিয়ে কী হয়? ঘুড়িটা আবার সুতা কেটে উড়ে যায়। কামরুলের যা রাগ হয় না! চেঁচিয়ে বলে, ভিমরুল!
লালিকে নিয়ে ছুট লাগিয়েছে ভিমরুল। ঘুড়িটাকে খুঁজে আনতে হবে না? 

আরও পড়ুন

×