ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬

গল্প

মৎস্য কুমারের সমুদ্রযাত্রা

মৎস্য কুমারের সমুদ্রযাত্রা
×

ছবি এঁকেছেন সাফায়েত সাগর

লিখেছেন শফিক হাসান

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬ | ০৭:১৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

এই ছেলে তো প্রচলিত নিয়ম-কানুন সবই ভেঙে দিল! মায়ের পেট থেকে বেরিয়ে, মানে কিনা জন্মের পরপরই কথা বলে উঠলো। 
তাও কথাটা যেমন তেমন নয়। বলে কিনা, ‘মা, আমাকে পানিতে রাখো। বিছানায় দম বন্ধ হয়ে আসছে।’
দাইমাসহ উপস্থিত আরেকজন মুরব্বি ব্যাপারটা আগেই খেয়াল করেছেন। পরিস্থিতি বুঝে কেউই ঘরের বাইরে গিয়ে ‘পুত্র হয়েছে’ খবরটা জানাতে পারেননি।
তাজ্জব ব্যাপার ছাড়া এটা আর কী।
কিন্তু পুত্র কই, এ-যে মৎস্যপুত্র!
এতদিন সবাই মৎস্যকন্যার গল্প শুনেছে। 
মৎস্যকন্যারা নদীতে, সাগরে থাকে। ওপরের অর্ধেক মানুষ আর নিচের অর্ধেক লেজবিশিষ্ট মাছ–এর নামই মৎস্যকন্যা। মাছ-মেয়ে। 
খুশি নাকি বেজার হওয়ার ঘটনা এটা–মা বুঝতে পারেননি এখনও। বেঘোরে ঘুমাচ্ছেন। মৎস্যপুত্র জন্মানোর খবরটাও কানে যায়নি।
দাইমা অবাক হওয়া ভুলে গেছেন। এমন তাজ্জব ঘটনা তার ষাট বছরের জীবনে আর দেখেননি।
তড়িঘড়ি করে দাইমা একটা বালতিতে পানি এনে দিলেন। মৎস্যপুত্রকে ছেড়ে দিলেন সেখানে।
কিছুক্ষণ পর মৎস্যপুত্রও ঘুমিয়ে পড়লো। এদিকে মায়ের ঘুম ভাঙলো। মা তাঁর নাড়িছেঁড়া ধনকে দেখতে পেলেন পানিভরা বালতিতে। অবাক হলেন তিনি। কে করেছে এমন সর্বনেশে কাণ্ড! কোলে নিতে গিয়ে থমকে গেলেন মা। পরক্ষণে আর্তচিৎকার দিয়ে উঠলেন। দাইমা তাঁর মুখ চেপে ধরলেন। বললেন, ‘ব্যাপারটা আপাতত লুকিয়ে রাখো। জানাজানি হয়ে গেলে বিপদে পড়বে।’
মা নীরবে কাঁদতে লাগলেন। কান্নার দমকে কেঁপে কেঁপে উঠছে তাঁর শরীর।
কিছুক্ষণ পর মৎস্যপুত্র আবার বলে উঠলো, ‘আমাকে নদীতে রেখে আসো, মা। এতো কম পানিতে নড়াচাড়া করতে পারছি না। আমি সাঁতার কাটবো। জলকেলি করবো।’
‘নদী! নদী পাবো কোথায়? একটা নদী কচ্ছপিয়া, সে তো ম্যালা দূরে!’
গ্রামের মানুষের উৎসাহের কমতি নেই।
নবজাতককে দেখতে এলো অনেকেই। ভিড় জমালো ঘরে বাইরে। মৎস্যপুত্রের খবরটা আর গোপন রাখা সম্ভব হলো না। কেউ কেউ ফিসফিস করে বাইরের কাউকে বলে দিয়েছে।
দলে দলে লোক হামলে পড়লো আজব এই কাণ্ড-কারখানা দেখতে।
খুব কম সময়ে গ্রাম-রাষ্ট্র হয়ে পড়লো খবরটা।
মানুষের পেটে একটা মাছের বাচ্চা জন্ম নিয়েছে।
মা উৎসাহী জনতার ভিড় সামলাতে পারলেন না।
প্রতিদিনই ভিড় বাড়ছে।
ভেতরে-বাইরে নানান রকম গুজব ও গুঞ্জন।
এসব মৎস্যপুত্রেরও ভালো লাগছে না। সবচেয়ে বড় কথা, সে চায় অবাধে সাঁতার কাটতে। বালতির অল্প পানিতে সেটা কীভাবে সম্ভব! জেলখানার মতোই কাটছে তার বালতি জীবন। কিন্তু মা যে তাকে ছাড়তে চান না!
দুই.
দিনে দিনে মৎস্যপুত্রের বয়স বাড়ছে। মা তার চমৎকার একটা নামও রেখেছেন–জলধর। ছোট বালতিতে জলধরের আর চলছে না। বাধ্য হয়ে বাজার থেকে আরেকটা বড় বালতি কিনে আনা হলো। সেটিও একসময় অকেজো হয়ে গেলো!
কিছুদিন পর জলধর দাবি জানালো, ‘আমাকে নদীতে রেখে এসো, মা। আর পারছি না।’
মা কেঁদে কেঁদে বললেন, ‘তুই না-হয় নদীতে থাকতে পারবি। আমি সেখানে কীভাবে থাকবো?’
‘তুমি বাড়িতেই থাকবে। কোথাও যেতে হবে না। নদীতে আমি হয়তো কোনো মৎস্যকন্যার দেখা পেয়ে যাব। তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব হবে।’
‘মা-বাবার চেয়ে তোর কাছে মৎস্যকন্যাই বড় হয়ে গেলো!’
‘তুমি যেমন আমাকে ভালোবাসো, বাবাও বাসে। কিন্তু মানুষের ভালোবাসা তীব্র। সবটুকু আমি নিতে পারছি না।’
বাধ্য হয়ে মা তাকে ছেড়ে দিয়ে এলেন বহুদূরের কচ্ছপিয়া নদীতে। সেখানে মনের আনন্দে সাঁতার কাটতে লাগলো মৎস্যপুত্র। যেন অনেক দিন পরে স্বাধীনতা খুঁজে পেয়েছে। পেয়েছে জীবনের আনন্দ।
মা বললেন, ‘তুই দূরে কোথাও যাস না, বাপ। আমি এখানেই তোকে দেখতে আসবো। তোর বাবাও আসবে।’
‘ঠিক আছে, মা। তুমি যাও। চিন্তা করো না।’
কচ্ছপিয়া নদীতে ছোটোখাটো মাছও আছে। এগুলো খেয়েই জীবনধারণ করে মৎস্যপুত্র। বাড়িতেও মাছ খেতো। বাবা পুকুর খাল বিল থেকে তার জন্য মাছ ধরে আনতেন। জাল বাইতেন।
একদিন সুন্দরী এক মৎস্যকুমারী এলো নদীর ধারে। মৎস্যপুত্রকে দেখে অবাক হয়ে বললো, ‘তুমি কে গো? এই রাজ্যে আগে কখনও তো দেখিনি!’
মৎস্যপুত্র তার দুঃখের কাহিনি খুলে বললো।
শুনে মৎস্যকুমারী বললো, ‘আমার সঙ্গে বড় সমুদ্রে যাবে? সেখানে অনেক সুস্বাদু মাছ খেতে পারবে। বেড়িয়েও দারুণ মজা হবে।’
‘মাকে জিজ্ঞেস করে দেখি।’
‘মা যদি যেতে না দেন?’
‘তাহলে যাবো না।’
সমুদ্রে যাওয়ার কথা শুনে মা রাগ করলেন না। বললেন, ‘যেতে চাইলে যাও। আবার ফিরে এসো এখানে। আমরা তোমার জন্য অপেক্ষা করবো।’
তিন.
সুন্দর এক সকালে মৎস্যকুমারীর সঙ্গে সমুদ্রের দিকে রওনা হলো মৎস্যকুমার। যেতে যেতে মৎস্যকুমার এমন সব দৃশ্য দেখে ফেলল যা আগে কখনও দেখার সুযোগ পায়নি। একটা রঙিন মাছের সঙ্গে ওর বন্ধুত্বও হয়ে গেলো। 
লেজ দুলিয়ে সাঁতার কাটতে কাটতে মৎস্যকুমার ভাবলো, জীবনটা সত্যিই চমৎকার। 
সমুদ্রযাত্রার মতো মজা আর কিছুতে হয় না। মৎস্যকুমারীটাও বড্ড ভালো! 

আরও পড়ুন

×