নাইজেরিয়ান লোকগাথা
রাজা আর জাদুগাছ জু জু
ছবি এঁকেছেন রজত
বাংলা করেছেন রানাকুমার সিংহ
প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬ | ০৭:১৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
অনেক অনেক দিন আগের কথা। নাইজেরিয়ার ইতাম রাজ্যে উদো উবোক উদোম নামে এক রাজা ছিলেন। এলাকাটি পাহাড়ের ওপর হওয়ায় সেখানে কোনো নদী ছিল না। রাজা আর রানী তাদের বাড়ির পেছনের এক ঝরনায় গোসল করতেন। রাজার ছিল এক কন্যা। সেই রাজকন্যাকে তিনি প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন।
একবার রাজা টানা দুই বছর রাজ্যের বাইরে ছিলেন। ফিরে এসে তিনি তাঁর সেই প্রিয় ঝরনায় গোসল করতে গেলেন। গিয়ে দেখেন, সেখানে এক বিশাল জাদুগাছ ‘জু জু’ ডালপালা মেলে ঝরনার চারপাশ দখল করে নিয়েছে। গোসল করার কোনো উপায় নেই দেখে রাজা ৫০ জন যুবককে ডাকলেন। তাদের বললেন ধারালো দা দিয়ে গাছটি কেটে ফেলতে। যুবকরা সারাদিন চেষ্টা করলো। আশ্চর্য ব্যাপার! দা দিয়ে কোপ দিলেই গাছের কাটা অংশটা আবার আগের মতো জোড়া লেগে যায়। দিনশেষে দেখা গেলো, গাছের একটা পাতাও তারা সরাতে পারেনি।
শুনে রাজা খুব রেগে গেলেন। পরদিন সকালে তিনি নিজেই বড় এক দা নিয়ে ঝরনার কাছে হাজির হলেন। যেই না তিনি গাছের ডালে কোপ দিতে যাবেন, অমনি জু জু গাছ এক কাণ্ড করে বসলো। গাছের একটা সূক্ষ্ম কণা ছিটকে এসে রাজার চোখে ঢুকে গেলো। যন্ত্রণায় রাজা কাতরাতে লাগলেন। চোখের ব্যথায় তাঁর নাওয়া-খাওয়া বন্ধ হয়ে গেলো।
উপায় না দেখে রাজা রাজ্যের বড় বড় ওঝাকে ডাকলেন। ওঝারা গণনা করে জানালো, রাজা ঝরনা দখল করতে চেয়েছেন বলে জু জু গাছ খুব রেগে গেছে। এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে হলে সাত ঝুড়ি মাছি, একটা সাদা ছাগল, একটা সাদা মুরগি আর সাদা কাপড় দিয়ে পূজা দিতে হবে। রাজা তা-ই করলেন। কিন্তু চোখের ব্যথা না কমে বরং আরও বাড়তে লাগলো।
এরপর রাজা অন্য একদল ওঝা ডাকলেন। তারা এসে বললো–‘মহারাজ, আপনার এই রোগ সারানোর ক্ষমতা আমাদের নেই। তবে পাতালপুরীর এক আত্মা আছে যে আপনাকে সুস্থ করতে পারে।’ রাজার আদেশে পরদিন সেই আত্মা হাজির হলো। আত্মা বললো–‘আমি আপনার চোখ ঠিক করে দেবো, কিন্তু বিনিময়ে কী দেবেন?’
রাজা বললেন, ‘আমি আমার অর্ধেক রাজ্য আর সাতটি গরু দেবো।’ আত্মা রাজি হলো না। যন্ত্রণায় অস্থির রাজা তখন বললেন, ‘তুমি যা চাইবে, আমি তা-ই দেবো।’ তখন আত্মা বললো, ‘আপনার মেয়েকে আমার হাতে তুলে দিতে হবে।’
শুনে রাজা কান্নায় ভেঙে পড়লেন। তিনি কিছুতেই নিজের আদরের মেয়েকে দিতে রাজি হলেন না। রাতে ব্যথা যখন অসহ্য হয়ে উঠলো, তখন প্রজারা রাজাকে বোঝালো, রাজা না বাঁচলে রাজ্য বাঁচবে না। তাই বাধ্য হয়ে রাজা আত্মাকে ডেকে পাঠালেন এবং চোখের পানির বুক ভাসিয়ে নিজের মেয়েকে তার হাতে তুলে দিলেন।
সেই আত্মা তখন কিছু বুনো লতাপাতা বেটে তার রস রাজার চোখে দিয়ে দিল। আত্মা বিদায় নেওয়ার আগে বলে গেলো, সকালে মুখ ধুলেই আপনার চোখ ভালো হয়ে যাবে। সে আর দেরি করলো না, রাজকন্যাকে নিয়ে অন্ধকার পাতালপুরীতে চলে গেলো।
পরদিন সকালে রাজা মুখ ধোয়ামাত্র তার চোখের সেই বিষাক্ত কণাটি বের হয়ে গেলো। তিনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠলেন। পরক্ষণেই তাঁর মনে হলো, একটা চোখের জন্য তিনি নিজের কলিজার টুকরো মেয়েকে হারিয়েছেন। শোকে পাথর রাজা ঘোষণা করলেন, পুরো রাজ্যে তিন বছর শোক পালন করা হবে।
ওদিকে পাতালপুরীতে রাজকন্যাকে একটি ঘরে আটকে রাখা হলো। তাকে প্রতিদিন প্রচুর রাজকীয় খাবার দেওয়া হতো। সেই ঘরে একটি মানুষের খুলি ছিল। খুলিটি একদিন চুপি চুপি রাজকন্যাকে বললো, খবরদার! তুমি এসব খাবার খেয়ো না। ওরা তোমাকে আদর করে খাওয়াচ্ছে না, বরং খাইয়ে-দাইয়ে মোটা করছে যাতে সময়মতো তোমাকে রান্না করে খেতে পারে!
রাজকন্যা ভয় পেয়ে গেলো। সে তখন কৌশলে সব খাবার সেই খুলিকে খাইয়ে দিত আর নিজে শুধু খড়িমাটি খেয়ে বেঁচে থাকতো। তিন বছর শেষ হওয়ার ঠিক আগে আগে একদিন সেই আত্মা তার বন্ধুদের ডেকে বললো, কাল এই মেয়েকে মারা হবে, তোমরা সবাই ভোজ খেতে এসো।
খুলিটি সব শুনে রাজকন্যাকে বললো, আজই পালাও। যখন আত্মা আর তার বন্ধুরা ভোজের আয়োজন করতে জঙ্গলে যাবে, সেই সুযোগে তুমি বাবার রাজ্যে চলে যেও।
সুযোগ বুঝে রাজকন্যা পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে গেলো।
রাজকন্যা বাবার প্রাসাদের কাছে পৌঁছাতেই চিৎকার করে বললো, বাবা! জলদি কিছু খাবার রাস্তার মোড়ে রেখে দাও! রাজা তা-ই করলেন। আত্মা সেই খাবার নিয়ে পাতালপুরীতে ফিরে গেলো। রাজকন্যাকে ফিরে পেয়ে রাজা মহাধুমধামে উৎসব করলেন। সেদিন থেকেই রাজা আইন করে দিলেন, মরে যাওয়ার পর কেউ আর পাতালপুরী থেকে জ্যান্ত মানুষের চিকিৎসা করতে পৃথিবীতে আসতে পারবে না!
- বিষয় :
- গল্প
