সিএনআরএস ও সমকাল গোলটেবিল বৈঠক
অধিকার আদায়ে জেলেদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে
রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সমকালের সভাকক্ষে গতকাল সোমবার ‘মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনায় জেলের অধিকার এবং গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত অতিথিরা সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ৩১ মার্চ ২০২৬ | ০৮:৪৮ | আপডেট: ৩১ মার্চ ২০২৬ | ০৯:০১
| প্রিন্ট সংস্করণ
অধিকার আদায়ে দেশের মৎস্যজীবীরা এখনও পিছিয়ে। সরকারি নীতিমালা, জলবায়ু ঝুঁকি এবং স্থানীয় দখলদারদের কারণে মাছ ধরার সুযোগ সীমিত হওয়ায় জেলেরা প্রায়ই আর্থিক ও সামাজিক বঞ্চনার মুখোমুখি হচ্ছেন। পরিস্থিতি পরিবর্তনে জেলেদের স্থানীয় থেকে জাতীয় পর্যায়ে শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তুলতে হবে। সোমবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সমকালের সভাকক্ষে ‘মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনায় মৎস্যজীবীর অধিকার এবং গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন। সিএনআরএস ও সমকাল যৌথভাবে এর আয়োজন করে। সার্বিক সহযোগিতায় ছিল ট্রোসা ২ প্রকল্প। বিভিন্ন গণমাধ্যমের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা এতে অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অক্সফাম ইন এশিয়ার কর্মসূচি ব্যবস্থাপক এনামুল মাজিদ খান সিদ্দিকী। এতে গণমাধ্যমে প্রকাশিত ১১৬টি প্রতিবেদন পর্যালোচনার সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হয়। তাতে দেখা যায়, প্রতিবেদনে জেলেদের চেয়ে মাছ বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। ৬৮ ভাগ প্রতিবেদন হয়েছে নদীতে একাধিক বাহিনীর অভিযান নিয়ে। মাছ ধরা জেলেদের জীবিকা হলেও এ ধরনের উপস্থাপনায় তাদের অপরাধী হিসেবে উপস্থাপনের ঝুঁকি তৈরি হয়। সরকারি প্রতিষ্ঠানের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি যখন যে ধরনের বার্তা দিচ্ছে, সেভাবেই সংবাদে আসছে। এতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাজটি কর্তৃত্ববাদী রূপ পাচ্ছে। এর ফলে অনেকটা জাতীয় মাছ বনাম জেলে– এ ধারণা তৈরি হয়। অথচ প্রতিবেদনগুলো হওয়া উচিত জাতীয় মাছ ও জেলে– এই বাস্তবতায়।
পর্যালোচনা অনুযায়ী, ১৮ শতাংশ প্রতিবেদন হয়েছে জেলেদের কষ্ট নিয়ে। বাকি প্রতিবেদনগুলো হয়েছে অন্যান্য বিষয়ে। আলোচনায় ডিবিসি টেলিভিশনের সম্পাদক লোটন একরাম বলেন, জেলেদের সমস্যাগুলো সাধারণত গণমাধ্যমে যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। কারণ তারা শক্তিশালী সংগঠন তৈরি করতে পারেনি। ফলে তাদের কষ্ট ও অধিকার সম্পর্কে নীতিনির্ধারকরা সচেতন হন না। জেলেদের উচিত স্থানীয় থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায় পর্যন্ত শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তোলা এবং তার মাধ্যমে নিজেদের অধিকারের কথা বলা।
যুগান্তরের উপসম্পাদক আসিফ রশীদ বলেন, মাছ দৈনন্দিন পুষ্টির উৎস হলেও তার আড়ালে জেলেদের জীবন-সংগ্রাম দেখা যায় না। আবার ইলিশ উৎপাদনে বাংলাদেশ শীর্ষে থাকা সত্ত্বেও উচ্চমূল্যের কারণে সাধারণ মানুষ তা সহজে কিনতেও পারে না। লাভের বড় অংশ কি জেলে পাচ্ছে, নাকি মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে চলে যাচ্ছে– সে প্রশ্ন থেকে যায়।
কালের কণ্ঠের জ্যেষ্ঠ সহকারী সম্পাদক ফরহাদ মাহমুদ বলেন, অনেক উন্মুক্ত জলাশয়েও জেলেরা যেতে পারেন না। জেলেদের প্রথম অধিকার মাছ। আর তারা প্রথম বঞ্চিত হন দাদনদারের হাতে। এ অবস্থার পরিবর্তন করতে হবে। মাছ না থাকলে জেলে থাকবে না।
মৎস্যজীবী জেসমিন আক্তার বলেন, ‘মাছ ধরা যখন বন্ধ থাকে তখন আমাদের ২৫ কেজি চাল দেওয়া হয়। মাপলে হয় ২০ কেজি। ভাত রাঁধলে আঠার মতো হয়ে যায়।’ তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের অধিকারটুকুও পাই না। অবৈধভাবে মাছ ধরি না। এরপরও পুলিশ আমাদের মারে। পরিবারের কোনো পুরুষ মানুষকে ধরে নিয়ে গেলে সেই সংসার কত কষ্টে চলে– বলে বোঝানো যাবে না। আমাদের অধিকার পেতে আমাদের পাশে দাঁড়ান।’
বাংলা ট্রিবিউনের নির্বাহী সম্পাদক উদিসা ইসলাম বলেন, যে বিষয়টা আমাদের চোখে পড়ে সেটি নিয়ে আমরা সাধারণত কথা বলি। কিন্তু জেলেরা আমাদের চোখে পড়ে না। তারা মাঝ নদীতে, মাঝ সাগরে থাকেন, আমরা পাতে মাছটা খাই ঠিকই, কিন্তু জেলেরা আমাদের দৃশ্যমানতার মাঝে নেই। ফলে জেলেদের অধিকার, উপস্থিতির চেয়ে বেশি জানি অক্টোবরে ২২ দিন ইলিশ পাওয়া যাবে না। কারণ আমি সেটির ভোক্তা।
তিনি বলেন, জেলেদের বিষয়ে গণমাধ্যমকে সম্পৃক্ত করতে হলে নব্বইয়ের দশকে যেমন নারী আন্দোলনের পাশে এনজিও, গণমাধ্যম দাঁড়িয়েছিল, সে রকম করতে হবে। নারী আন্দোলনের সেই সময় দীর্ঘ দিন ধরে অ্যাক্টিভিজম করে যেতে হয়েছে, এবং সেই অ্যাক্টিভিজমের সঙ্গে গণমাধ্যমকে সম্পৃক্ত রাখা হয়েছে, বিচ্ছিন্ন করে বা দোষারোপ করে নয়। এনজিওকর্মী ও গণমাধ্যম তখন যেমন একসঙ্গে কাজ করেছিল, তেমনি মৎস্যজীবীদের ক্ষেত্রেও চেষ্টা দরকার।
সিএনআরএসের সিনিয়র ম্যানেজার (প্রোগ্রাম) মোখলেসুর রহমান চৌধুরী বলেন, জেলেদের মধ্যে বিভিন্ন ভাগ আছে– কেউ নৌকার মালিক, কেউ ভাগী। ভাগী জেলেদের কাছে পৌঁছানো কঠিন। কারণ তারা দীর্ঘ সময় মাছ ধরায় ব্যস্ত থাকে। তাই প্রায়ই আমরা মৎস্য খাতের তথ্য পাই মূলত মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে। এতে পুরো সত্য প্রতিফলিত হয় না।
প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক সারফুদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশের প্রাণিজ আমিষের প্রায় ৬০ শতাংশ আসে মাছ থেকে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এক কোটি ৯০ লাখ মানুষ এই খাতের সঙ্গে যুক্ত। জিডিপির ৩.৫ শতাংশ আসে মৎস্য খাত থেকে। কিন্তু এই সংখ্যার ভিড়ে মৎস্য খাতের আসল মানুষগুলো হারিয়ে যায়। জেলেরা যেন শুধু একটি অর্থনৈতিক উপাদান হয় পড়ে, মানুষ নয়। তিনি অধিকার আদায়ের জন্য জেলেদের সংঘবদ্ধ হওয়ার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
অক্সফাম ইন বাংলাদেশের প্রোগ্রাম কোঅর্ডিনেটর শান্তা সোহেলি ময়না বলেন, জেলেদের জীবন ও বাস্তবতা নিয়ে সংবাদ উপস্থাপনায় আরও গভীরতা, প্রেক্ষাপট এবং ধারাবাহিকতা প্রয়োজন। অনেক গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের পর আর কোনো ফলোআপ থাকে না। ফলে প্রকৃত ঘটনার পূর্ণ চিত্র জানা যায় না।
টাইমস অব বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ সহকারী সম্পাদক মো. এমদাদুল হক হাওলাদার বলেন, রিপোর্টিংয়ের সময় জীবনের গল্পগুলো সামনে আসে। কিন্তু সম্পাদকীয় নীতি অনেক সময় তা ধরে রাখতে পারে না। তাই আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস, প্রকৃত জেলেদের জীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে থাকা এবং তাদের কষ্ট-সংগ্রামের কাহিনি তুলে ধরা সাংবাদিকতার এক গুরুত্বপূর্ণ দিক।
এমআরইডিআইর ক্যাপাসিটি বিল্ডিং ম্যানেজার সানাউল হক দোলন বলেন, গণমাধ্যমে মৎস্য খাত গুরুত্ব কম পায়। এই খাতকে আলাদা করে দেখা হয় না। হয় একে অর্থনীতির ভেতরে, না হয় কৃষির ভেতরে বা বাণিজ্যের ভেতরে দেখা হয়। আর যখন মৎস্যকেই আলাদা করে দেখা হয় না, তখন জেলেকে তো অবশ্যই আলাদা করে দেখা হয় না। ফলে জেলেদের অবদান প্রায়ই অস্বীকৃত থাকে।
চ্যানেল আই অনলাইনের ইনপুট এডিটর ফাহমিদা আখতার বলেন, সংবাদমাধ্যমে মৎস্যজীবীদের দৈনন্দিন জীবন বা মানবিক দিকটি প্রায়ই প্রকাশ পায় না, এটা সত্য। ইলিশ ধরা বন্ধ হলে কার্ডধারী জেলেরা ২৫ কেজি করে চাল পান। এটা যথেষ্ট কিনা সে প্রশ্নও তোলা হয়, তবে জোরালোভাবে না।
কথাসাহিত্যিক শাহনাজ মুন্নী বলেন, আমাদের সাংবাদিক সহকর্মীরা যখন মৎস্যজীবীদের নিয়ে প্রতিবেদন করতে যান, তখন যতটা অ্যাডভেঞ্চারের দিকটা যথ বেশি থাকে, বিষয়টাকে রোমান্টিসাইজ করার বিষয়টা যত বেশি থাকে, জেলের অধিকারভিত্তিক প্রতিবেদন তৈরির জায়গাটা সেভাবে থাকে না। ফলে এ বিষয়টি ভেবে দেখার সুযোগ রয়েছে।
জেলেদের জীবন ও অধিকার বিষয়ে সাহিত্যের ঘাটতি কথাও বলেন শাহনাজ মুন্নী। তিনি বলেন, ষাটের দশকের পর সাহিত্যে সেভাবে মৎস্যজীবী, শ্রমজীবী বা প্রান্তিক মানুষদের সেভাবে পাইনি। কারণ আমাদের সাহিত্যিকদের মধ্যেও অভিজ্ঞতার অভাব আছে।
বণিক বার্তার জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক সাবিদিন ইব্রাহিম বলেন, কৃষকদের মতো সহজ শর্তে ঋণ পাওয়ার ব্যবস্থা জেলেদের জন্যও প্রয়োজন। একটি সমন্বিত সহায়তা ব্যবস্থা– যেমন ইউনিফায়েড কার্ড চালু করে জেলেদের অন্তর্ভুক্ত করার মতো উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
অনুষ্ঠানে আমাদের সময়ের সহকারী সম্পাদক এমিলিয়া খানম, এখন টেলিভিশনের ন্যাশনাল ডেস্ক ইনচার্জ মেসবাহ য়াযাদ, রিভারাইন পিপলের প্রেসিডেন্ট এফ এম আনোয়ার হোসেন, চাঁদপুর প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি বি এম হান্নান, দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের আবাসিক সম্পাদক মোতাসিম আলী, চাঁদপুরের মৎস্য ব্যবসায়ী রিয়াদ ব্যাপারী প্রমুখ বক্তব্য দেন।
অনুষ্ঠানে চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের নির্বাহী পরিচালক জহিরুল আলম, সিএনআরএসের প্রকল্প ব্যবস্থাপক নাদিম হোসেন উপস্থিত ছিলেন। সভাপতিত্ব করেন সমকালের সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সহযোগী সম্পাদক শেখ রোকন।
