করোনার দিনলিপি
মৃত্যুর হিমশীতল ছায়ার নিচে জীবন
ইন্দ্রজিৎ সরকার
প্রকাশ: ২০ এপ্রিল ২০২০ | ১৩:৩৯ | আপডেট: ২০ এপ্রিল ২০২০ | ১৪:২০
'মৃত্যুও অজ্ঞাত মোর। আজি তার তরে/ক্ষণে ক্ষণে শিহরিয়া কাঁপিতেছি ডরে।' রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 'নৈবেদ্য' কাব্যে এভাবেই তার মৃত্যুভাবনা তুলে ধরেছেন। করোনাবিপর্যস্ত পৃথিবীতে এখন কবির সেই ভাবনা হয়ে উঠেছে সংক্রমিত অথবা সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকা কোটি মানুষের উপলব্ধি। মৃত্যুর পরিসংখ্যানে এ মুহূর্তে বিশ্বে ষষ্ঠ অবস্থানে থাকা বেলজিয়ামের জীবনযাত্রা দেখে হয়তো আতঙ্কের ব্যাপারটা সেভাবে বোঝা যাবে না। লকডাউনের মধ্যেও যথারীতি চালু আছে জরুরি সেবা-সংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠান। সীমিত পরিসরে গণপরিবহন চলছে। দরকারি কাজে ঘরের বাইরে যাচ্ছে মানুষ। তবে ভেতরে ভেতরে অদৃশ্য শত্রুকে নিয়ে এক অজানা আতঙ্ক যে কুরে কুরে খাচ্ছে, তা অস্বীকারের উপায় নেই। করোনাভাইরাস যেন মৃত্যুর হিমশীতল ছায়া বিছিয়ে দিয়েছে নিয়মনিষ্ঠ মানুষগুলোর নিত্যদিনের হাসিখুশি জীবনের ওপর। সেখানকার বাসিন্দা কয়েক বাংলাদেশির সঙ্গে কথা বলে পাওয়া গেল এমন চিত্র।
উত্তর-পশ্চিম ইউরোপের দেশ বেলজিয়ামে বাংলাদেশিদের সংখ্যা নেহাত কম নয়। দেশটির এন্টর্প শহরে বাস করেন প্রকৌশলী রকিব হাসান। 'এটলাস কপকো' নামে কমপ্রেসার তৈরির একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। তিনি জানান, দেশজুড়ে প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ করোনায় আক্রান্ত হলেও এখন পর্যন্ত বাংলাদেশি কারও কথা জানা যায়নি। অবশ্য সেখানকার প্রশাসন নাম-ঠিকানা প্রকাশ করে না বলে ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত না হলে জানাও কঠিন। তবে সবাই খুব সচেতন ও নিয়মনিষ্ঠ। সরকারের ঘোষণা বা আহ্বান সবাই গুরুত্বের সঙ্গে মেনে চলেন। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ বাইরে যান না। তাদের চিন্তাটাই এমন যে, বাইরে গিয়ে কেন আমি আরেকজনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলব? রেস্টুরেন্ট বা মানুষ একত্রিত হয়- এমন স্থানগুলো বন্ধ থাকায় বাইরে জনসমাগম কম। তারপরও কেউ বের হলে মাস্ক-গ্লাভসের মতো সুরক্ষাসামগ্রী পরে নিচ্ছেন। সতর্কভাবে মেনে চলছেন সামাজিক দূরত্ব।
রকিব জানান, অর্থনৈতিক বৈষম্য না থাকায় লকডাউনের কারণে সেখানে কোনো পেশার মানুষই বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়েননি। কারণ, সরকার সবাইকে নির্দিষ্ট হারে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে। যাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ আছে, তারাও সরকারি সহায়তা পাচ্ছে। বেকাররাও এই সুবিধার আওতায় রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে চালু থাকা কিছু প্রতিষ্ঠান কর্মীদের সপ্তাহে এক দিন বাধ্যতামূলক ছুটি দিচ্ছে। ফলে সেদিনের বেতন কাটা পড়ছে। অবশ্য সরকার এ বিষয়েও উদ্যোগী হয়েছে। কর্মহীন দিনটির বেতনের ৭০ ভাগ সরকার দেবে বলে আলোচনা হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের মতো সংকট সেখানে নেই। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে হয়তো সমস্যা দেখা দিতে পারে। সেটা নিয়েও কিছুটা শঙ্কা রয়েছে।
কলকারখানা চালু রাখার ব্যাপারে সরকার সেভাবে নিষেধাজ্ঞা দেয়নি বলেও জানান রকিব। তবে স্পষ্ট করে বলে দেওয়া হয়েছে, কারখানা চালু রাখতে হলে অবশ্যই কর্মীদের শতভাগ সুরক্ষা ও শারীরিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে হবে। এই ঘোষণা কেউ অমান্য করলে নেওয়া হয় কঠোর ব্যবস্থা। কোনো কর্মী হয়তো সংশ্নিষ্ট দপ্তরে অভিযোগ জানালেন যে, তাদের কারখানায় সুরক্ষাবিধি মানা হচ্ছে না, তখন কারখানাটি একেবারে বন্ধ করে দেওয়া হবে। ফলে কেউ ঝুঁকি নিচ্ছেন না।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বেলজিয়ামে মৃত্যু পাঁচ হাজার ছুঁই ছুঁই। এর অর্ধেকই বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দা, যারা এমনিতেই নানারকম জটিল-কঠিন ব্যাধিতে আক্রান্ত ছিলেন। বাকি অর্ধেক করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করছেন। রকিব বলেন, 'বেলজিয়ামের চিকিৎসাব্যবস্থা বেশ ভালো। এখানে ভেন্টিলেটর বা অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকট নেই। ফলে আক্রান্ত হলে সুচিকিৎসা পাওয়া নিয়ে কারও মধ্যে সংশয় নেই।'
রকিবের স্ত্রী নুসরাত শিখি 'কারগিল ফুড অ্যান্ড বেভারেজ' নামে খাদ্যসামগ্রী প্রস্তুতকারক একটি প্রতিষ্ঠানের ল্যাবরেটরিতে কাজ করেন। তিনি জানান, কয়েকটি রিসোর্টে আসা লোকজনের থেকে বেলজিয়ামে করোনা ছড়িয়ে পড়ে বলে ধারণা করা হয়। তবে খুব দ্রুতই কার্যকরী ব্যবস্থা নেয় সরকার। মার্চের মাঝামাঝি থেকে লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। অবশ্য তার প্রতিষ্ঠান জরুরি সেবা হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় বরাবর চালু রয়েছে। প্রতিদিনই তিনি গণপরিবহন ব্যবহার করে অফিসে যাচ্ছেন। পরিবহনের সংখ্যা এখন বেশ কম এবং যাত্রীও খুব কমই থাকে।
শিখি জানান, লকডাউন ঘোষণার পর প্রথমে মানুষ কিছুটা ভয় পেয়েছিল। তাই নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনতে ভিড় করেছিল সবাই। তবে জিনিসপত্রের দাম বাড়েনি। এখন পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থাও ঠিক রয়েছে।
