যেভাবে সিএনএন গড়ে তোলেন টেড টার্নার
ছবি: সিএনএন
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৬ | ১৮:৪৪ | আপডেট: ০৭ মে ২০২৬ | ১৮:৪৯
‘মার্কিন মিডিয়া মুঘল’ হিসেবে পরিচিত গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও সিএনএনের প্রতিষ্ঠাতা টেড টার্নার মারা গেছেন। বুধবার ৮৭ বছর বয়সে তিনি মারা যান।
তার প্রতিষ্ঠিত টার্নার এন্টারপ্রাইজেসের সংবাদ বিজ্ঞপ্তির বরাতে সিএনএনের খবরে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
তার মৃত্যুতে সিএনএনের সিইও ও চেয়ারম্যান মার্ক থম্পসন এক বিবৃতিতে বলেন, টেড টার্নার ছিলেন অত্যন্ত নিবেদিতপ্রাণ এবং প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নেতা। তিনি ছিলেন নির্ভীক, অকুতোভয় এবং সবসময় নিজের অন্তর্দৃষ্টির ওপর ভরসা রেখে ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত থাকতেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইওতে টেড টার্নার জন্মগ্রহণ করেন। তিনি আটলান্টার ব্যবসায়ী হিসেবে বেশি পরিচিত ছিলেন। স্পষ্টভাষী হওয়ায় লোকমুখে তার নাম হয়ে ওঠে ‘দ্য মাউথ অব দ্য সাউথ’। বিশাল এক গণমাধ্যম সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন তিনি। কেবল টিভির প্রথম সুপারস্টেশন থেকে শুরু করে সিনেমা ও কার্টুনের জনপ্রিয় চ্যানেলগুলো ছিল এই সাম্রাজ্যের অংশ। ‘আটলান্টা ব্রেভস’ পেশাদার স্পোর্টস দলেরও মালিক ছিলেন তিনি।
সমাজসেবক হিসেবে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘ইউনাইটেড নেশনস ফাউন্ডেশন’ বা জাতিসংঘ ফাউন্ডেশন। বিশ্বব্যাপী পারমাণবিক অস্ত্র নির্মূলের দাবিতেও তিনি সোচ্চার ছিলেন। একজন পরিবেশ সংরক্ষক হিসেবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম শীর্ষ ভূমিমালিকে পরিণত হন। আমেরিকার পশ্চিমাঞ্চলে বাইসন (বুনো মহিষ) ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে তাঁর বড় ধরনের ভূমিকা ছিল। এমনকি শিশুদের পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন করতে তিনি জনপ্রিয় কার্টুন সিরিজ ‘ক্যাপ্টেন প্ল্যানেট’ তৈরি করেছিলেন। ১৯৯১ সালে তিনি টাইম ম্যাগাজিনের ‘বর্ষসেরা ব্যক্তিত্ব’ নির্বাচিত হন।
২০১৮ সালে নিজের ৮০তম জন্মদিনের এক মাস আগে টার্নার জানান, তিনি ‘লিউই বডি ডিমেনশিয়া’ নামের মস্তিষ্কের এক জটিল রোগে ভুগছেন। এরপর ২০২৫ সালের শুরুর দিকে তিনি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। পরে একটি পুনর্বাসনকেন্দ্রে চিকিৎসা নিয়ে তিনি সুস্থও হয়ে ওঠেন। টার্নারের ৫ সন্তান, ১৪ নাতি-নাতনি এবং ২ প্রপৌত্র (নাতির সন্তান) রয়েছে।
মাত্র ২৪ বছর বয়সে বাবার আত্মহত্যার পর পারিবারিক বিলবোর্ড কোম্পানি ‘টার্নার আউটডোর অ্যাডভার্টাইজিং’-এর দায়িত্ব নেন টেড টার্নার। ব্যক্তিগত শোককে আড়াল করে তিনি কাজে মন দেন। তবে অন্যের পণ্যের বিজ্ঞাপন প্রচারে সীমাবদ্ধ থাকতে চাননি তিনি।

তিনি কয়েকটি রেডিও স্টেশন কিনে নেন এবং ১৯৭০ সালে টেলিভিশন খাতে প্রবেশ করেন। সে সময় তিনি আটলান্টার লোকসানে থাকা টিভি স্টেশন ‘চ্যানেল ১৭’ অধিগ্রহণ করেন। পুরোনো সিটকম ও ক্লাসিক সিনেমা প্রচার করে স্টেশনটির দর্শক বাড়ানোর চেষ্টা করেন। এমনকি ‘অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড থিয়েটার’ নামের একটি অনুষ্ঠান নিজেই উপস্থাপনা করেছিলেন টার্নার।
প্রথমদিকে সংবাদমাধ্যমে আগ্রহী ছিলেন না তিনি। বরং খেলাধুলার সম্প্রচার অধিকার কিনে বিনিয়োগ শুরু করেন। আটলান্টা ব্রেভস বেসবল দলের খেলার সম্প্রচার অধিকার নেওয়ার পর দর্শক ও বিজ্ঞাপনদাতাদের আগ্রহ বাড়তে থাকে। এতে লাভের মুখ দেখে টার্নার টেলিভিশন ব্যবসা আরও বড় পরিসরে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করেন।
১৯৭৬ সালে তিনি চ্যানেল ১৭-এর সিগন্যাল স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সম্প্রচার শুরু করেন। এর মধ্য দিয়ে এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম কেবল টিভি সুপারস্টেশনে পরিণত হয়, যা সারা দেশের কেবল গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে যায়। পরে তিনি আটলান্টা ব্রেভস ও আটলান্টা হকস বাস্কেটবল দলও কিনে নেন। এর একটি কারণ ছিল দীর্ঘমেয়াদে সম্প্রচার অধিকার নিশ্চিত করা, অন্যটি ছিল খেলাধুলার প্রতি তার ব্যক্তিগত আগ্রহ।
সুপারস্টেশন ডব্লিউটিবিএস গড়ে তোলার পর টার্নারের লক্ষ্য হয় ২৪ ঘণ্টার সংবাদ চ্যানেল চালু করা। প্রচলিত টেলিভিশন সংবাদব্যবস্থার কঠোর সমালোচক ছিলেন টার্নার। তার বিশ্বাস ছিল, সঠিক তথ্যের অভাবে আমেরিকার মানুষ নানা সমস্যায় পড়ছে।
টার্নার চেয়েছিলেন টেলিভিশন সংবাদকে আরও বিস্তৃত করতে। ব্যবসা, স্বাস্থ্য, খেলাধুলাসহ বিভিন্ন বিষয়ে অনুষ্ঠান চালুর পরিকল্পনা করেন তিনি। অবশেষে ১৯৮০ সালের ১ জুন যাত্রা শুরু করে বিশ্বের প্রথম ২৪ ঘণ্টার সংবাদ চ্যানেল সিএনএন। এরপর ১৯৮২ সালে চালু হয় সিএনএন২, যা পরে ‘হেডলাইন নিউজ’ এবং পরবর্তীতে ‘এইচএলএন’ নামে পরিচিতি পায়। ১৯৮৫ সালে শুরু হয় ‘সিএনএন ইন্টারন্যাশনাল’, যা বিশ্বব্যাপী সম্প্রচার চালায়। পরে টার্নার টিএনটি, টার্নার ক্লাসিক মুভিজ (টিসিএম) ও কার্টুন নেটওয়ার্কসহ আরও কয়েকটি জনপ্রিয় চ্যানেল চালু করেন।
সিএনএন ছিল টার্নারের সবচেয়ে প্রিয় প্রকল্প। যদিও শুরুর দিকে দীর্ঘ সময় লাইভ সম্প্রচারের কারণে নানা প্রযুক্তিগত সমস্যার মুখে পড়তে হয় চ্যানেলটিকে। সমালোচকেরা একসময় একে বিদ্রূপ করে চিকেন নুডল নিউজ বলেও আখ্যা দেন। তবু টার্নার ও তার সহকর্মীরা জানতেন, তারা নতুন এক যুগের সূচনা করছেন। টার্নার নিজেই বলেছিলেন, আমি ২০ বছর অফিসেই থেকেছি। প্রথম ১০ বছর অফিসের সোফাতেই ঘুমিয়েছি।
১৯৯০ সালে পারস্য উপসাগরীয় যুদ্ধ শুরু হলে ২৪ ঘণ্টার সংবাদ চ্যানেলের গুরুত্ব বিশ্ববাসীর সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো যুদ্ধ সরাসরি সম্প্রচার করা হয়, আর সেটি ছিল সিএনএনের মাধ্যমে।
টার্নার ব্রডকাস্টিংয়ের সাবেক প্রধান নির্বাহী টেরি ম্যাকগার্ক বলেন, টেড যা ঘটিয়েছেন, তা ইন্টারনেট বিপ্লবের মতোই গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৯৬ সালে প্রায় ৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে নিজের নেটওয়ার্কগুলো টাইম ওয়ার্নারের কাছে বিক্রি করেন তিনি। পরে প্রতিষ্ঠানটির ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে কেবল টিভি নেটওয়ার্ক বিভাগের দায়িত্ব পালন করেন।
- বিষয় :
- সিএনএন
