যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবে ইরানের জবাব
যুদ্ধের অবসান ও সমুদ্রে নিরাপত্তা চায় তেহরান
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬ | ১০:২১ | আপডেট: ১১ মে ২০২৬ | ১২:২৩
যুদ্ধ শেষ করতে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া সর্বশেষ প্রস্তাবের জবাব দিয়েছে ইরান। মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের কাছে পাঠানো জবাবে ‘আপাতত যুদ্ধ শেষ করার’ ওপরই মনোযোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছে তেহরান। উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে ‘যুদ্ধের অবসান এবং সমুদ্রে নিরাপত্তার’ নিশ্চয়তা চায় তারা। ইরানের জবাব যুক্তরাষ্ট্র খতিয়ে দেখছে বলে জানা গেছে। গতকাল রোববার আলজাজিরা ও রয়টার্সের প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়।
এদিকে ইরানের জবাবের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে বলেছেন, ‘পরিস্থিতি নিয়ে ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও বাকি বিশ্বের সঙ্গে গেম খেলছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, তারা আর হাসতে পারবে না।’
আনাদোলু এজেন্সি জানায়, এর আগে ইরানের দেওয়া প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, ওয়াশিংটন আর সামরিক পদক্ষেপ নেবে না– এমন নিশ্চয়তা চাচ্ছে ইরান। তাছাড়া পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার, নৌ অবরোধ প্রত্যাহার ও ইরানের সম্পদ অবমুক্ত করার দাবিও তোলা হয়েছিল।
আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানায়, পাকিস্তানের এক মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ করার মার্কিন প্রস্তাবের জবাবে ইরান ‘যুদ্ধ শেষ করার’ ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
ওয়াশিংটন দুই মাসের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছিল। অন্যদিকে তেহরান জোর দিয়ে বলেছিল, ৩০ দিনের মধ্যে সমস্যার সমাধান করতে হবে এবং যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর পরিবর্তে যুদ্ধ শেষ করার ওপর মনোযোগ দিতে হবে।
ইরানের আগের প্রস্তাবে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং লেবাননসহ একাধিক রণাঙ্গনে শত্রুতার অবসান ঘটানোর দাবিও রয়েছে। হরমুজ প্রণালি সম্পর্কিত কাঠামোও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে এতে।
হরমুজ প্রণালি বৈশ্বিক তেল ও গ্যাসের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ, যা বর্তমানে অবরুদ্ধ রয়েছে। পাকিস্তান এপ্রিলের শুরুতে যুদ্ধরত পক্ষগুলোর মধ্যে যুদ্ধবিরতির জন্য মধ্যস্থতা করেছিল। ইসলামাবাদে ঐতিহাসিক শান্তি আলোচনার আয়োজন করে এবং সংঘাত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই ভূমিকা বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর।
যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ প্রস্তাবে যা আছে
ওয়াশিংটন এই সপ্তাহের শুরুতে ইরানকে একটি ১৪ দফা প্রস্তাব পাঠায়। প্রস্তাব অনুযায়ী, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করতে এবং কমপক্ষে ১২ বছরের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ রাখতে সম্মত হতে হবে। এ ছাড়া দেশটিকে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম (৪৪০ কেজি) তৃতীয় কোনো দেশে হস্তান্তর করতে হবে।
এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র পর্যায়ক্রমে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে, ইরানের জব্দ করা শত শত কোটি ডলারের সম্পদ মুক্ত করবে এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করবে। উভয় পক্ষ চুক্তি স্বাক্ষরের ৩০ দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেবে।
যুদ্ধবিরতির মধ্যেই উত্তেজনা অব্যাহত
গতকাল বেশ কয়েকটি উপসাগরীয় দেশের আকাশে ড্রোন শনাক্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে এক মাস আগের যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও এই অঞ্চলে হুমকি এখনও রয়েছে, তা আবারও স্পষ্ট হয়েছে। গতকাল রোববার আমিরাত জানিয়েছে, তারা ইরান থেকে আসা দুটি ড্রোন আটক করেছে। কাতার নিজ জলসীমায় আবুধাবি থেকে আসা পণ্যবাহী জাহাজে ড্রোন হামলার নিন্দা জানিয়েছে। কুয়েত বলেছে, তাদের আকাশসীমায় প্রবেশ করা শত্রুভাবাপন্ন ড্রোনগুলোকে তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোকাবিলা করেছে।
তেহরান সংকীর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে ইরান-সংশ্লিষ্ট জাহাজ ছাড়া অন্য জাহাজ চলাচল মূলত বন্ধ করে দিয়েছে। প্রণালিটি এখন যুদ্ধের অন্যতম প্রধান চাপ প্রয়োগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
কাতারের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান আল-থানি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিকে বলেছেন, হরমুজ প্রণালিকে ‘চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করলে সংকট কেবল আরও গভীর হবে। গতকাল কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচিকে ফোনে বলেছেন, নৌ চলাচলের স্বাধীনতায় কোনো আপস করা উচিত নয়।
অন্যদিকে, কাতার এনার্জি পরিচালিত রণতরী আল খারাইতিয়াত নিরাপদে হরমুজ অতিক্রম করেছে। যুদ্ধ শুরুর পর এটিই ছিল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বহনকারী প্রথম কাতারি জাহাজ, যেটি হরমুজ অতিক্রম করল।
ইরানকে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের নাগাল পেতে দেব না : ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের নাগাল পেতে দেবে না। তা আমাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ইউরেনিয়াম নিতে চাইলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে আবারও লক্ষ্যবস্তু বানাবে। এই পারমাণবিক উপাদান মার্কিন সামরিক বাহিনীর নজরদারিতে রয়েছে। গতকাল প্রচারিত সিন্ডিকেটেড টিভি শো ‘ফুল মেজার’-এর এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প এসব কথা বলেন।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা যে কোনো সময়, যখনই চাইব, তখনই ইউরেনিয়াম পেয়ে যাব। আমরা সার্বক্ষণিক নজরদারি করছি। এজন্য স্পেস ফোর্স নামে একটি দল গঠন করেছি। তারা নজর রাখছে।’
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ প্রস্তাবের জবাবে ইরান যুদ্ধের অবসান চেয়েছে। কিন্তু ট্রাম্প বলেছেন, যুদ্ধ শেষ হয়নি। আমরা আরও দুই সপ্তাহ অভিযান চালিয়ে প্রতিটি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারি।
আলোচনা মানে আত্মসমর্পণ নয়, বললেন পেজেশকিয়ান
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, আলোচনা মানে আত্মসমর্পণ নয়। তিনি ইরানের জাতীয় স্বার্থ ও ইরানি জনগণের অধিকার রক্ষার বিষয়ে তেহরানের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনবিষয়ক এক বৈঠকে পেজেশকিয়ান বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হলো ইরানি জনগণের অধিকার বাস্তবায়ন করা।’
অন্যদিকে ইরানের সংসদের পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজাই বলেছেন, ‘তেহরানের সংযম শেষ। আমাদের জাহাজের বিরুদ্ধে যে কোনো আগ্রাসনের জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজ ও ঘাঁটিগুলোর বিরুদ্ধে ইরান কঠোর ও চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেবে।’
- বিষয় :
- যুদ্ধ
- যুক্তরাষ্ট্র
