ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ট্রাম্পের বেইজিং সফর

তাইওয়ান-ইরানের বাধা পাশে রেখে সৌহার্দ্যের বার্তা

শির সঙ্গে আলোচনা অত্যন্ত ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ: ট্রাম্প

তাইওয়ান-ইরানের বাধা পাশে রেখে সৌহার্দ্যের বার্তা
×

বেইজিংয়ে গ্রেট হলের সামনে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিং। গতকাল বৃহস্পতিবার তোলা- এএফপি

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬ | ০৮:৫২ | আপডেট: ১৫ মে ২০২৬ | ১১:০৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

বেইজিংয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং যখন এক জমকালো রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় বসলেন, তখন খাবারের তালিকাটিই হয়ে ওঠে কূটনীতির নিদর্শন। ঐতিহ্যগতভাবে চীনের রাষ্ট্রীয় ভোজসভাগুলোতে সাংহাইয়ের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের হুয়াইয়াং রন্ধনশৈলীর ওপর নির্ভর করা হয়, যা তার মৃদু ও সূক্ষ্ম স্বাদ, নিপুণ ছুরির কাজ এবং ঋতুভিত্তিক খাবারের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার জন্য পরিচিত।

যে বৈঠকে উভয় পক্ষই সম্পর্ক নতুন করে শুরুর আগ্রহ প্রকাশ করেছে, সেই বৈঠকের সমাপ্তি টানতে মেন্যু পরিকল্পনাকারীরা রন্ধনশৈলীতে কিছুটা নমনীয়তা যোগ করেছেন বলে মনে হয়েছে। এর মধ্যে ছিল চীনের জাতীয় খাবার বেইজিং রোস্ট ডাক (রোস্ট করা হাঁস) ও বিফ রিবস (গরুর মাংসের কাবাব), যা ট্রাম্পের পছন্দের ওয়েল-ডান স্টেকের প্রতি স্পষ্ট ইঙ্গিত। টেবিলে মার্কিন অতিথিদের জন্য ডেজার্টেরও প্রচুর আয়োজন ছিল– তিরামিসু, ফল ও আইসক্রিম এবং শিঙার খোলস আকৃতির পেস্ট্রি। 

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল বৃহস্পতিবার এভাবেই বিশ্বমঞ্চে প্রতিদ্বন্দ্বী মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে বেইজিংয়ের গ্রেট হলে রাষ্ট্রীয় ভোজের টেবিলে মৈত্রীর বার্তা জানায় চীন। ওই নৈশভোজে ভাষণ দিয়েছেন ট্রাম্প। গতকাল তিনি সফরের প্রথম দিনকে ‘চমৎকার’ বলে বর্ণনা করেছেন। পাশাপাশি ‘অনন্য এক জাঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনার’ জন্য প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

এর আগে গতকাল সকালে চীনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মার্কিন প্রতিনিধিদের বৈঠক হয়। সাক্ষাৎ হয় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের। এ প্রসঙ্গে পরে ট্রাম্প বলেন, শির সঙ্গে আলোচনা ‘অত্যন্ত ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ’ হয়েছে। চীনের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আলোচনাকেও ‘অত্যন্ত ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ’ বলে বর্ণনা করেন তিনি।

দ্য গার্ডিয়ান জানায়, ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট শিও। তিনি বলেন, তিনি ও ট্রাম্প চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে ‘স্থিতিশীল’ রেখেছেন। শি আরও বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং আমি চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক গতি-প্রকৃতি নিয়ে গভীর আলোচনা করেছি। আমরা উভয়েই বিশ্বাস করি, চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক। আমাদের অবশ্যই এটিকে সফল করতে হবে; কখনোই নষ্ট করা যাবে না।’ তিনি বলেন, ‘সহযোগিতা থেকে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়েরই লাভ এবং সংঘাত থেকে ক্ষতির শঙ্কা রয়েছে। আমাদের দুই দেশের প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়ে অংশীদার হওয়া উচিত।’

এমন একসময়ে ট্রাম্প বেইজিং সফর করছেন, যখন ইরানের সঙ্গে একটি যুদ্ধের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি। যেখানে চীন ইরানের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র, সেখানে প্রসঙ্গটি কীভাবে আলোচনায় আসে, সেটাই দেখার বিষয়। এ ছাড়া আরেকটি বড় বিষয় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের বড় মতানৈক্য আছে। সেটি তাইওয়ান। ট্রাম্প-শির বৈঠকের পর এরই মধ্যে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ঘোষণা দিয়েছেন, তাইওয়ান নিয়ে তাদের নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসছে না। গতকাল এনবিসি নিউজকে তিনি বলেন, ‘এটা (তাইওয়ান) নিয়ে আমাদের নীতির কোনো পরিবর্তন আসছে না। অন্য অনেক প্রেসিডেন্টের প্রশাসনের মতো অপরিবর্তিত থাকছে।’

কিন্তু চীনের প্রেসিডেন্ট শি বলছেন ভিন্ন কথা। দ্য গার্ডিয়ান জানায়, তাঁর কাছে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে তাইওয়ান ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু’। তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি এটা দুর্বলভাবে নাড়াচাড়া করা হয়, তবে তা দুই দেশের মধ্যে সংঘর্ষের কারণ– এমনকি লড়াইও বাধাতে পারে।  

হোয়াইট হাউস বলছে, ট্রাম্প ও শির ‘ভালো বৈঠক’ হয়েছে। তবে তাইওয়ানের বিষয়ে তারা কোনো আলোচনা করেননি। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ‘একটি ভালো বৈঠক করেছেন, যেখানে তারা অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, চীনে মার্কিন ব্যবসার জন্য বাজার প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণ এবং চীনের বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করেছেন।’ ওই কর্মকর্তা দাবি করেন, দুই নেতা হরমুজ প্রণালি খোলা রাখার বিষয়ে একমত হয়েছেন, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর বোমা হামলা শুরুর পর থেকে কার্যত বন্ধ রয়েছে। আলোচনা-সংক্রান্ত হোয়াইট হাউসের বিবৃতিতেও তাইওয়ানের কোনো উল্লেখ ছিল না।

তাইওয়ানের মতো আরেকটি বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আপস করবে না চীন। সেটি হলো, দীর্ঘদিনের মিত্র ও বাণিজ্য সহযোগী চীনের সঙ্গে সম্পর্ক। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে সাম্প্রতিক যুদ্ধে তেহরানের পাশে দেখা গেছে বেইজিংকে। প্রকাশ্যে না হলেও স্যাটেলাইট তথ্য, অস্ত্র দিয়ে ইরানের অন্তরালের ঘনিষ্ঠ সহযোগীই তারা ছিল– এমনটাই মনে করা হয়। সফরকালে ট্রাম্প চাইবেন ইরান থেকে চীন যেন দূরে সরে থাকে। চীন তা মানবে– এমনটা মনে করা কঠিন। 

বিবিসির বিশ্লেষণে বলা হয়, বেইজিং ও তেহরানের সম্পর্ক কয়েক দশক পুরোনো; চীন ইরানের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। শি যদি তেহরানকে আলোচনার টেবিলে আনতে সাহায্য করেন, তবে তা তাঁকে আরও বেশি সুবিধা দিতে পারে। সূত্র জানায়, হরমুজ প্রণালি খোলার বিষয়ে চীনের সহায়তা চাইতে পারেন ট্রাম্প। 
বেইজিং সফরে গিয়ে ট্রাম্প চীনের প্রেসিডেন্ট শিকে ওয়াশিংটন সফরেরও আমন্ত্রণ জানান। শির হোয়াইট হাউস সফরের জন্য তিনি সম্ভাব্য তারিখ আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর ঘোষণা করেন। 
এ অবস্থায় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও চীন সফরে আসার ঘোষণা দিয়েছেন। ক্রেমলিন মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভের বরাত দিয়ে দ্য গার্ডিয়ান জানায়, শিগগিরই প্রেসিডেন্ট পুতিন চীন সফর করবেন।

 

আরও পড়ুন

×