ঢাকা সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬

বেইজিং সফর

উষ্ণতা বিনিময় হলেও চীনে ট্রাম্পের অর্জন সামান্য

উষ্ণতা বিনিময় হলেও চীনে ট্রাম্পের অর্জন সামান্য
×

চীনের শীর্ষ নেতারা যেখানে বসবাস করেন, সেই জংনানহাই লিডারশিড কম্পাউন্ডে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে স্বাগত জানান শি জিনপিং। ১৫ মে। ছবি: সংগৃহীত

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬ | ০২:৫৯ | আপডেট: ১৬ মে ২০২৬ | ০৩:০৮

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীন ত্যাগ করেছেন। সফরে স্বাগতিক প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ভূয়সী প্রশংসা করলেও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কোনো বড় অগ্রগতি কিংবা ইরান যুদ্ধ নিয়ে বেইজিংয়ের কাছ থেকে কোনো বাস্তব সহায়তা তিনি পাননি। উল্টো তাইওয়ান নিয়ে তাঁকে কঠোর সতর্কবার্তা শুনতে হয়েছে।

শুক্রবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে আসে। এতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান কৌশলগত ও অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী চীনে ট্রাম্পের সফরটি ছিল ২০১৭ সালের পর কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য প্রথম। মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ক্রমহ্রাসমান জনসমর্থন বাড়ানোর লক্ষ্যে বাস্তব ফলাফল অর্জনের লক্ষ্যেই ট্রাম্প এ সফর করেন। 

সেনা কুচকাওয়াজ দেখা থেকে শুরু করে বেইজিংয়ের গোপন বাগান পরিদর্শন, শীর্ষ সম্মেলন– সব মিলিয়ে সফর ছিল জাঁকজমকে ভরা। কিন্তু রুদ্ধদ্বার বৈঠকে শি ট্রাম্পকে একটি কঠোর সতর্কবার্তাও দিয়েছেন– চীনের শীর্ষ উদ্বেগ তাইওয়ানকে নিয়ে যে কোনো ধরনের অব্যবস্থাপনা সংঘাতে মোড় নিতে পারে। 

যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার পথে গতকাল ট্রাম্প সাংবাদিকদের জানান, শি তাঁকে জানিয়েছেন, তিনি তাইওয়ানের স্বাধীনতার পক্ষে নন। ট্রাম্প বলেন, ‘আমি তাঁর কথা শুনেছি। কোনো মন্তব্য করিনি। কোনো দিকেই কোনো প্রতিশ্রুতি দিইনি।’ মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, যিনি এখন তাইওয়ান চালাচ্ছেন, তাঁর সঙ্গে কথা বলার পর তিনি শিগগিরই তাইওয়ানের কাছে একটি অমীমাংসিত অস্ত্র বিক্রির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।

ব্রিটিশ গণমাধ্যমটি জানায়, বেইজিংয়ে দুদিন কাটানোর পর এই প্রথম ট্রাম্প এসব বিষয়ে খোলামেলা মন্তব্য করলেন। ওই দুই দিন ট্রাম্প অস্বাভাবিকভাবে সংযত ছিলেন। তাঁর তাৎক্ষণিক মন্তব্যগুলো মূলত শির উষ্ণতা ও মর্যাদার প্রশংসায়ই সীমাবদ্ধ ছিল। লবস্টার বল ও কুং পাও চিকেন দিয়ে মধ্যাহ্নভোজের আগে একসময়ের রাজকীয় উদ্যান ঝংনানহাই কমপ্লেক্সে শির সঙ্গে শেষ বৈঠকে ট্রাম্প বলেন, ‘এটি ছিল অসাধারণ সফর। আমার মনে হয়, সফরে অনেক ভালো কিছু হয়েছে।’

ট্রাম্প বোয়িং জেট বিক্রির চুক্তির মতো তাৎক্ষণিক ব্যবসায়িক সাফল্য খুঁজছিলেন। কিন্তু তা বিনিয়োগকারীদের প্রভাবিত করতে পারেনি। এ অবস্থায় শি ওয়াশিংটনের সঙ্গে স্থিতিশীল বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠন ও চুক্তির কথা বলেন। তিনি দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ককে ‘গঠনমূলক কৌশলগত স্থিতিশীলতা’ হিসেবে বর্ণনা করেন। এটি নতুন পরিভাষা, যা সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ব্যবহৃত ‘কৌশলগত প্রতিযোগিতার’ চেয়ে ভিন্ন। ওই কথাটি বেইজিং পছন্দ করত না।

ইরান বিষয়ে কোনো সহায়তা নয়

ট্রাম্পের সফর নিয়ে গত বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউস জানায়, ইরানের উপকূলে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে দুই নেতা একমত হয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমাতে মার্কিন তেল ক্রয়ের বিষয়ে শি জিনপিংয়ের আগ্রহের প্রসঙ্গও তাদের বৈঠকে উঠে এসেছে। কিন্তু গতকাল নেতারা চা-চক্রে মিলিত হওয়ার ঠিক আগে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুদ্ধ নিয়ে তাদের হতাশা ব্যক্ত করে একটি কড়া বিবৃতি জারি করে। মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘এ সংঘাত কখনোই ঘটা উচিত ছিল না; এটা চালিয়ে যাওয়ার কোনো কারণ নেই।’ বেইজিং বলেছে, চীন এমন একটি যুদ্ধে শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানোর প্রচেষ্টাকে সমর্থন করে, যা জ্বালানি সরবরাহ ও বিশ্ব অর্থনীতিকে ব্যাহত করেছে।

ঝংনানহাই সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, নেতারা ইরান নিয়ে আলোচনা করেছেন; তাদের অনুভূতির মধ্যে ‘অত্যন্ত মিল’। কিন্তু এ নিয়ে শি জিনপিং কোনো মন্তব্যই করেননি। দেশে ফেরার ফ্লাইটে ট্রাম্প বলেন, শি ইরান বিষয়ে ‘কোনো সহযোগিতা চাইছেন না’।

সূত্র জানায়, মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট বেইজিংকে তেহরানের সঙ্গে একটি চুক্তি করার জন্য তাদের প্রভাব ব্যবহার করতে অনুরোধ করেছিলেন। বিশ্লেষকরা মনে করেন, শি তেহরানকে কঠোর চাপ দিতে বা তাদের প্রতি সমর্থন বন্ধ করতে ইচ্ছুক হবেন কিনা, এ নিয়ে দৃঢ় সন্দেহ রয়েছে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত প্রতিপক্ষ হিসেবে বেইজিংয়ের কাছে ইরানের গুরুত্ব রয়েছে।

ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের একজন বৈদেশিক নীতি ফেলো প্যাট্রিসিয়া কিম বলেন, ট্রাম্পের সফরের ‘উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ইরানের ব্যাপারে নির্দিষ্ট কিছু করার জন্য চীনের কোনো প্রতিশ্রুতি নেই।’

হতাশাজনক চুক্তিতে বোয়িংয়ের শেয়ারের দর পতন

এবার শীর্ষ সম্মেলনের পরিধি কম ছিল। এমনকি বৈঠকগুলোর সবচেয়ে বড় একক অর্জন হিসেবে প্রচারিত চুক্তিটিও ছিল হতাশাজনক। গত বৃহস্পতিবার ট্রাম্প জানান, চীন ২০০টি বোয়িং জেট কিনবে। এর আগে একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছিল, অন্তত ৫০০টি বিমান বিক্রির আশা নিয়ে বেইজিংয়ে গিয়েছিলেন ট্রাম্প। পর্যাপ্ত সংখ্যক বিমান বিক্রি না হওয়ায় বোয়িংয়ের শেয়ারের দাম ৪ শতাংশ কমে যায়।

সফরে ট্রাম্পের অন্যতম লক্ষ্য ছিল বাণিজ্য চুক্তি। তাই তিনি প্রযুক্তি খাতের সাতজন, আর্থিক পরিষেবার ছয়, অ্যারোস্পেসের দুই এবং কৃষি খাত-সংশ্লিষ্ট কোম্পানির একজন সিইওকে সঙ্গে নিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে বেশি আলোচনায় ছিলেন এনভিডিয়ার সিইও জেনসন হুয়াং ও টেসলার ইলন মাস্ক। এনভিডিয়ার সিইও জেনসেন হুয়াং শেষ মুহূর্তে নাটকীয়ভাবে ট্রাম্পের সঙ্গে সফরে যোগ দেন। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট লিখেছে, বৈঠকে এনভিডিয়ার তৈরি ‘এইচ-২০০’ চিপের কথা আলোচনায় উঠেছিল। কিন্তু চীন নিজস্ব প্রযুক্তি তৈরির আগ্রহ দেখিয়েছে। 

২০২৫ সালের এপ্রিলে ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের জবাবে চীন গুরুত্বপূর্ণ খনিজের ওপর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। দুর্লভ খনিজ সরবরাহ সমস্যার আনুষ্ঠানিক সমাধান ছাড়াই ট্রাম্প চীন ছেড়েছেন। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, তারা কৃষিপণ্য বিক্রির চুক্তিতে সম্মত হয়েছেন। 

তাইওয়ান নিয়ে কঠোর অবস্থানে চীন

বেইজিংয়ের দাবি করা দ্বীপ তাইওয়ানকে ভুলভাবে পরিচালনা করলে তা সংঘাতের জন্ম দিতে পারে– ট্রাম্পের প্রতি শির এ মন্তব্য ছিল কঠোর সতর্কবার্তা। চীনের উপকূল থেকে ৫০ মাইল দূরে অবস্থিত তাইওয়ান দীর্ঘদিন ধরেই সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু। বেইজিং দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ নিতে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা নাকচ করতে রাজি নয়। যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানকে অস্ত্র সরবরাহ করে থাকে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এনবিসি নিউজকে বলেন, ‘তাইওয়ান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি এখনও অপরিবর্তিত রয়েছে।’ তাইওয়ানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিন চিয়া-লুং সমর্থন জানানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

দুই নেতার বৈঠক নিয়ে শুক্রবার এক্সে একটি পোস্ট দেন ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের বিশ্লেষক রায়ান হাস। তিনি লেখেন, ট্রাম্প ও শি উভয়েই নিজ দেশের জনগণের কাছে এ সম্মেলনকে একটি সফল হিসেবে উপস্থাপন করবেন। কিন্তু বাস্তবে তাদের কেউই বড় কোনো বিষয়ে ছাড় দেননি।

আরও পড়ুন

×