ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬

এক্সপ্লেইনার

সৌদি-যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক চুক্তি কী, কেন এটি উদ্বেগের কারণ?

সৌদি-যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক চুক্তি কী, কেন এটি উদ্বেগের কারণ?
×

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। ফাইল ছবি: এএফপি

দ্য গার্ডিয়ান

প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬ | ১৭:৪৫ | আপডেট: ২৩ জুলাই ২০২৬ | ১৮:০২

সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্র বুধবার যুগান্তকারী একটি চুক্তিতে সম্মত হয়েছে। এর মাধ্যমে উপসাগরীয় দেশটিতে বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি প্রতিষ্ঠায় আমেরিকান প্রযুক্তি ও কারিগরি দক্ষতা ব্যবহার করা হবে। এমন পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এবং ওয়াশিংটনের ক্ষমতার অলিন্দে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। 

রিয়াদ দীর্ঘদিন ধরে পারমাণবিক অস্ত্রের সক্ষমতা অর্জনের দাবি জানিয়ে আসছে। কারণ হিসেবে তারা ইরানের কর্মসূচির উদাহরণ দেয়। ধারণা করা হয়, ইসরায়েলও গোপনে কর্মসূচি পরিচালনা করে। এ অবস্থায় নতুন চুক্তিটি সৌদি আরবের অভ্যন্তরে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার বিষয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধের বিপরীতে এমন পদক্ষেপ কী অর্থ বহন করবে, সেটিও চিন্তার উদ্রেক করেছে।

সম্মত হওয়া চুক্তিটি কী
মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইটের এক বিবৃতি অনুযায়ী, সৌদি আরবের জ্বালানি চাহিদা মেটানোর জন্য ৩০ বছর মেয়াদি এই চুক্তি করা হয়েছে। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার আওতায় সৌদি আরব কিছু বিদ্যুৎ উৎপাদনে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করতে চায়। এর ফলে দেশটি উৎপাদিত তেলের বড় অংশ রপ্তানি করতে পারবে।

চুক্তির আওতায় সৌদির পারমাণবিক অবকাঠামো উন্নয়নে মার্কিন কোম্পানিগুলো মূখ্য ভূমিকা পালন করবে। পাশাপাশি চীন ও রাশিয়ার মতো প্রতিযোগীরা সৌদিতে প্রবেশের সুযোগ হারাবে। ধারণা করা হচ্ছে, চুক্তিটির মূল্য কয়েক হাজার বিলিয়ন ডলার। চুক্তি অনুযায়ী, রিয়াদের সঙ্গে ওয়াশিংটন পারমাণবিক সহযোগিতায় রাজি হবে। বিনিময়ে সৌদি আরব ইসরায়েলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক স্থাপন করবে। 

পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে চুক্তিতে সম্মত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব। ছবি: সংগৃহীত

এর আগে গাজা যুদ্ধের কারণে তেল আবিবের সঙ্গে রিয়াদের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টা ভেস্তে গিয়েছিল। এবার ইসরায়েলের সঙ্গে বৃহৎ কোনো সমঝোতা ছাড়াই ট্রাম্প প্রশাসন পারমাণবিক চুক্তি এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সৌদি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে পারবে?
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই চুক্তি সৌদি আরবে একটি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র নির্মাণের পথ তৈরি করে দিয়েছে। তবে এটি নির্ভর করবে দুই দেশের যৌথ সমীক্ষার ওপর। সেখানে নির্ধারণ করা হবে, এ ধরনের কেন্দ্র আদৌ প্রয়োজন কি না। সমীক্ষাটি দুই বছর ধরে চলবে। 

ফলে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়াদ শেষে হোয়াইট হাউসে যদি নতুন প্রেসিডেন্ট আসেন, তাহলে তাঁর ওপর চুক্তি এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব বর্তাবে। অর্থাৎ, পরবর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্ট ঠিক করবেন, সৌদিকে নিজ ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অনুমতি দেওয়া হবে কি না। 

পারমাণবিক জ্বালানি শক্তি থাকা অনেক দেশ নিজেদের ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করে না। কারণ, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অস্ত্র তৈরির মতো উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুতের ঝুঁকি থাকে। ফলে দেশগুলোকে চুল্লির জ্বালানি আমদানি করতে হয়। সৌদি আরবের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের যুক্তি হলো- ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ ও ব্যবহৃত জ্বালানির ওপর ওয়াশিংটন নজর রাখবে। যাতে সেগুলো বোমা তৈরিতে ব্যবহার না হয়।

চুক্তিটি কেন বিতর্কিত?
পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধকারী সংগঠনগুলো বহু বছর ধরে সতর্ক করে আসছে যে, এ ধরনের চুক্তি সৌদি আরবকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে নিয়ে যেতে পারে। অতীতে রিয়াদ বলেছে, তাদের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বি ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করে, তবে তাদেরও পারমাণবিক অস্ত্রের প্রয়োজন হবে।

ইরানকে পারমাণবিক বোমা বা অস্ত্র-মানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করা থেকে ঠেকাতেই মূলত যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে জড়িয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সৌদি চুক্তির উদ্বেগ উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, ‘ঝুঁকি তৈরি করে এমন বিষয়ে আমরা কোনো দেশের সঙ্গেই চুক্তি করব না।’

ট্রাম্প প্রশাসন পারমাণবিক সহযোগিতার পাশাপাশি একটি পৃথক ‘দ্বিপাক্ষিক সুরক্ষা চুক্তি’তেও স্বাক্ষর করেছে। তাদের দাবি, এটি পর্যাপ্ত নজরদারি নিশ্চিত করবে। তবে বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছেন, এই চুক্তিতে আগের পারমাণবিক চুক্তিগুলোর মতো তদারকি ও সুরক্ষা ব্যবস্থা নেই। 

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরব জাতিসংঘের পারমাণবিক নজরদারি সংস্থা (আইএইএ)-এর সবচেয়ে কঠোর নজরদারির আওতায় থাকবে না। কিন্তু অন্য দেশগুলোর ক্ষেত্রে সংস্থাটি ‘অতিরিক্ত প্রোটোকল’ বাস্তবায়ন করেছে। এই প্রোটকল না মানার অভিযোগে ২০১৮ সালে ওয়াশিংটন তেহরানের সঙ্গে চুক্তি থেকে বেরিয়ে যায়। 

এই অতিরিক্ত প্রোটোকলের আওতায় পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করতে চাওয়া দেশগুলোর ওপর বিশেষ নজরদারি করা হয়। এর উদ্দেশ্য শান্তিপূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করা। যুক্তরাষ্ট্র যখন সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে একই ধরনের চুক্তি করেছিল, তখন ইউএই পারমাণবিক জ্বালানি প্রক্রিয়াকরণের চেষ্টা না করার বিষয়ে রাজি হয়েছিল। বিষয়টি তখন ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ হিসেবে পরিচিতি পায়। তবে সৌদি-মার্কিন চুক্তিতে এই গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড নেই।

কংগ্রেসে চুক্তি আটকে দেওয়া হবে?
দীর্ঘদিন ধরে বিরোধীরা বলে আসছেন, সৌদি আরবকে নিজ ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অনুমতি দিলে, মধ্যপ্রাচ্যের বাকি দেশগুলোও এটি অর্জনের প্রতিযোগিতায় নামবে। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, ইসরায়েল গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি পরিচালনা করে। সৌদির চুক্তি নিয়ে তেল আবিবও অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরুর বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

মার্কিন কংগ্রেসের বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টির আইনপ্রণেতারাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সিনেটর ক্রিস মারফি বলেছেন, এই চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক প্রতিযোগিতা শুরু করবে। এটির কারণে ইরানও নিজেদের কর্মসূচি সীমিত করার আগ্রহ হারাবে। 

আগামী কয়েকদিনের মধ্যে চুক্তিটি অনুমোদনের জন্য মার্কিন কংগ্রেসে তোলা হতে পারে। এর বিরোধীতা করলেও মারফির মতো সিনেটরদের পক্ষে চুক্তি আটকে দেওয়া বেশ কঠিন। এ কাজ করতে হলে কংগ্রেসে একটি যৌথ প্রস্তাব পাস করাতে হয়। কারণ, প্রেসিডেন্টের ভেটো অগ্রাহ্য করতে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন।

আরও পড়ুন

×