নেপালে বিপর্যয়
উদ্ধার ও মরদেহ শনাক্তের লড়াই
নিহত বেড়ে ৫৮৪, বিদেশি ৭৭৭ পর্যটকসহ নিখোঁজ ২৪৮২
পানির সঙ্গে প্রচণ্ড গতিতে বিপুল পরিমাণ কাদা, পাথর ও আবর্জনা নেমে নেপালের নদীতীরবর্তী জনপদ তছনছ করে দিয়েছে। শিশুটি বন্যায় আটকে পড়েছিল, গতকাল শুক্রবার তাকে উদ্ধার করার পর আনন্দে ভাসেন স্বজনরা। নেপালের নুয়াকোটে ত্রিশূলি আশ্রয়শিবিরে -এএফপি
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:০০ | আপডেট: ২৯ আগস্ট ২০২৬ | ১১:১২
| প্রিন্ট সংস্করণ
নেপাল ও তিব্বত সীমান্তে হিমবাহধসে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা এবং ভূমিধসের পর মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। উত্তাল নদনদী বয়ে নিয়ে আসছে নিথর দেহ, যা দূরের ভাটি অঞ্চলে গিয়ে জমা হচ্ছে। উদ্ধার হওয়া মরদেহ সংরক্ষণ এবং পরিচয় শনাক্ত করতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
কাঠমান্ডু পোস্টের খবরে বলা হয়েছে, পানির তীব্র তোড়ে ভেসে যাওয়া স্বজনের ছবি হাতে নিয়ে এক মর্গ থেকে অন্য মর্গে ছুটছেন শোকার্ত মানুষ। গত বুধবার সকালের এই ভয়াবহ দুর্যোগের পর গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত অন্তত ৫৭৯ জনের মরদেহ উদ্ধারের কথা জানিয়েছে নেপালের দুর্যোগ কর্তৃপক্ষ। এর আগে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম পাঁচজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে। এতে মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৫৮৪ জনে দাঁড়িয়েছে।
গতকাল নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা তাদের ভূখণ্ডে নিখোঁজের সংখ্যা এক লাফে বাড়িয়ে ১ হাজার ৯২৪ জনের কথা জানিয়েছে। অন্যদিকে তিব্বত অংশে আগের দিনের হিসাব অনুযায়ী সেখানে ৫৫৮ জন নিখোঁজ ছিলেন। ফলে দুই দেশ মিলিয়ে এখন মোট নিখোঁজের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে অন্তত ২ হাজার ৪৮২ জনে। এ সংখ্যা আগের দিনের তুলনায় এক হাজারের বেশি।
সীমান্তে নিখোঁজ হওয়া মানুষদের মধ্যে বিপুল সংখ্যক বিদেশি পর্যটক ও শ্রমিক রয়েছেন। নেপালের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাদের ভূখণ্ডে এখনও ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিক নিখোঁজ আছেন, আর তিব্বত অংশে এই সংখ্যা ২৬০। সব মিলিয়ে সীমান্তবর্তী অঞ্চলজুড়ে অন্তত ৭৭৭ জন বিদেশি নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে নিখোঁজের বিশাল সংখ্যার কারণে নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিজ্ঞানীদের প্রাথমিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে প্রায় সাত হাজার ২০০ মিটার উঁচু লাংটাং লিরুং পর্বতের কাছে একটি হিমবাহধসে এই বিপর্যয়ের সূচনা হয়। পর্বতের ওপর থেকে বরফ ও পাথরের বিশাল চাঁই ভেঙে নিচে পড়ে, যা ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমপরিমাণ ভূকম্পন তৈরি করে। এই বিপুল পরিমাণ বরফ, কাদা ও পাথর নদীর পানির সঙ্গে মিশে এক ভয়াবহ কাদার স্রোতে রূপ নেয়। তিব্বতের সীমান্ত পার হয়ে এই স্রোত সুনামির মতো ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদী ধরে প্রায় ১০০ কিলোমিটার পথজুড়ে ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।
প্ল্যানেটারি সায়েন্স ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী জেফরি কারগেল জানান, বরফ, কাদা ও চূর্ণ-বিচূর্ণ পাথরের এই মিশ্রণটি শুরুর ২২ কিলোমিটার পথ গড়ে ঘণ্টায় ১৯৩ কিলোমিটার (১২০ মাইল) গতিতে নিচে নেমে আসে। এই পথ পাড়ি দিতে মিশ্রণটি সময় নেয় মাত্র ৬ মিনিট ৫০ সেকেন্ড।
আন্তর্জাতিক রেড ক্রস জানিয়েছে, এই বন্যায় দুই দেশের প্রায় ৯৩ হাজার মানুষ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। হাজার হাজার ঘরবাড়ি, বহু সেতু এবং ৪০ কিলোমিটারেরও বেশি সড়ক সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চলে উদ্ধারকারীরা এখনও পৌঁছাতে পারেননি।
ভাটির জেলাগুলোয় মরদেহের স্তূপ
নদীর খরস্রোতে ভেসে যাওয়া মরদেহগুলো বহু দূরের ভাটি এলাকাগুলোয় ছড়িয়ে পড়েছে। রসুয়া ও নুয়াকোট অঞ্চল থেকে ভেসে যাওয়া মরদেহ ও দেহাংশ চিতওয়ান, তানাহুন, নাওয়ালপরাসি, ধার্ডিং ও পোখরা অঞ্চলে পাওয়া যাচ্ছে। চিতওয়ানের ত্রিশূলী ও নারায়ণী নদীর অংশ থেকে শতাধিক মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে স্থানীয় হাসপাতালগুলোর মর্গে মাত্র ৩০ থেকে ৫০টি মরদেহ রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। সংকট মোকাবিলায় চিতওয়ান জেলা প্রশাসন ভরতপুর মহানগরীর একটি অব্যবহৃত শিল্প প্রশিক্ষণ ভবনকে সাময়িক মর্গ হিসেবে গড়ে তুলছে। সেখানে প্রায় আড়াইশ মরদেহ রাখা সম্ভব হবে।
পোখরা, ধার্ডিং ও নাওয়ালপরাসির হাসপাতালগুলোতেও ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি মরদেহ জমা হয়েছে। তুলনামূলক কম ক্ষতিগ্রস্ত কিছু মরদেহ পাশের জেলাগুলোয় স্থানান্তর করা হচ্ছে। পচন ধীর করতে অস্থায়ী মর্গগুলোয় এয়ারকন্ডিশনার বসানো এবং ড্রাই আইস (শুষ্ক বরফ) ব্যবহার করা হচ্ছে।
স্বজনের আহাজারি ও শনাক্তকরণ জটিলতা
উদ্ধার কেন্দ্র ও অস্থায়ী মর্গগুলোর বাইরে অপেক্ষা করছেন নিখোঁজদের স্বজন। কেউ রসুয়া, কেউ নুয়াকোট, আবার কেউ গোর্খা জেলা থেকে ছুটে এসেছেন প্রিয়জনের খোঁজে। দীর্ঘ সময় পানিতে ভেসে থাকার কারণে অধিকাংশ মরদেহ বিকৃত হয়ে গেছে। শুধু মুখ দেখে চেনা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। পুলিশ শনাক্তকরণ কাজ পরিচালনা করছে। মৃতদেহের ছবি তোলা, আঙুলের ছাপ নেওয়া, ময়নাতদন্ত এবং ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের কাজ চলছে। যেসব মরদেহের চেহারা কিছুটা চেনার যোগ্য, সেগুলোর ছবি প্রকাশ করা হচ্ছে।
নিখোঁজ ব্যক্তিদের অনুসন্ধানের নির্দেশ চীনা প্রেসিডেন্টের
এএফপির খবরে বলা হয়েছে, দুর্যোগে নেপালের পাশাপাশি চীনের তিব্বত অংশেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সেখানে সীমান্ত পয়েন্টগুলো কাদা ও পাথরের স্তূপে ঢেকে গেছে। বহু পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দা সেখানে আটকা পড়েছিলেন। তিব্বত অংশে আটকে পড়া প্রায় ৫৫৫ পর্যটক ও ৪৯৯ বাসিন্দাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
উদ্ধারকাজ পরিচালনার কৌশল নিয়ে চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে গতকাল পলিটব্যুরো বৈঠক করেছে। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বলা হয়, ‘কর্তৃপক্ষ বৈজ্ঞানিকভাবে অনুসন্ধান ও উদ্ধার পরিকল্পনা তৈরি করবে। এবং চীন ও বিদেশি নিখোঁজ ব্যক্তিদের খোঁজে সর্বাত্মক চেষ্টা চালাতে হবে।’
টানেলে আটকা শতাধিক শ্রমিক
নেপালের ত্রিশূলী-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি সুড়ঙ্গে এখনও ১০০ জনেরও বেশি শ্রমিক আটকা পড়ে আছেন। সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার ও উদ্ধারকারী দল সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ খুঁজে বের করে তাদের উদ্ধারে চেষ্টা চালাচ্ছে। সেখান থেকে ইতোমধ্যে ৩৫০ শ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দাকে উদ্ধার করা হয়েছে। ভারত সীমান্তঘেঁষা নদীগুলো থেকেও নেপাল থেকে ভেসে আসা বেশ কয়েকটি মরদেহ উদ্ধার করেছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ।
চীন ও নেপাল সরকার যৌথভাবে উদ্ধারকাজ তদারকি করছে। আন্তর্জাতিক ত্রাণ সহায়তার জন্য নেপাল সরকার আবেদন জানিয়েছে। তবে এই মুহূর্তে পরিস্থিতি সামাল দিতে নিজেদের নিরাপত্তা বাহিনী দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছে বলে জানিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
নতুন করে বন্যার আশঙ্কা
এদিকে, বিপর্যয় এখনও পুরোপুরি কাটেনি। ভূমিধস ও ধ্বংসস্তূপের কারণে নদনদীর স্বাভাবিক প্রবাহ আটকে জায়গায় জায়গায় কৃত্রিম হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে। তিব্বত অংশের একটি কৃত্রিম বাঁধে অতিরিক্ত পানি জমে উপচে পড়তে শুরু করায় নতুন করে বন্যার আতঙ্ক দেখা দেয়। ফলে গতকাল বেশ কয়েক ঘণ্টার জন্য উদ্ধারকাজ স্থগিত রাখতে হয়েছিল। পরবর্তী সময় ঝুঁকি কিছুটা কম মনে হওয়ায় পুনরায় উদ্ধারকাজ শুরু করা হয়।
চীনের সরকারি সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তিব্বত অংশে কৃত্রিমভাবে অবরুদ্ধ হ্রদটিতে আগামী তিন দিনে আরও প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি জমা হতে পারে। আগামী মঙ্গলবার নাগাদ এই হ্রদের পানির প্রবাহ চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
যদি এই কৃত্রিম বাঁধ ভেঙে যায়, তবে ভাটির অঞ্চলে আবারও সুনামির মতো পাহাড়ি ঢল আছড়ে পড়বে। ফলে উদ্ধারকারীদের সামনে এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ– একদিকে নিখোঁজ হাজারো মানুষকে খুঁজে বের করা, অন্যদিকে সম্ভাব্য পরবর্তী বিপর্যয় ঠেকানো এবং নদীতীরবর্তী এলাকাকে নিরাপদ রাখা। এর ওপর চলতি সপ্তাহান্তে রসুয়া এলাকায় ভারী বৃষ্টিপাতেরও পূর্বাভাস রয়েছে। ফলে নতুন করে বিপর্যয়ের আশঙ্কায় আতঙ্কিত সীমান্ত অঞ্চলের মানুষ।