বিটিআরসির মূল্যায়ন
জেলা-উপজেলায় মোবাইল সেবার মানে বড় ঘাটতি
ফাইল ছবি
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০০:৫৭
দেশজুড়ে মোবাইল নেটওয়ার্কের বিস্তার ঘটলেও সেবার মানে বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে। বড় শহরের তুলনায় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এই ঘাটতি আরও প্রকট। এসব এলাকায় নেটওয়ার্ক দুর্বলতা, কলড্রপ, ভয়েস কলের মান এবং ইন্টারনেটের গতিতে সমস্যা বেশি। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সাম্প্রতিক মূল্যায়নে দেশের চার মোবাইল অপারেটরেরই কোনো না কোনো সূচকে সেবার নির্ধারিত মান পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।
বিটিআরসির মূল্যায়নে দেখা গেছে, উপজেলা পর্যায়ে নির্ধারিত সব সূচকেই সেবার মান পূরণ করতে পারেনি গ্রামীণফোন। রবি একাধিক সূচকে পিছিয়ে রয়েছে। ২জি ভয়েস কলে সবচেয়ে বেশি কলড্রপের হার পাওয়া গেছে বাংলালিংকের। আর উচ্চগতির ইন্টারনেট পরীক্ষায় চার অপারেটরের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল ফল করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিটক।
গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে নেটওয়ার্ক কাভারেজকে সেবার মানের একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, একটি এলাকায় নেটওয়ার্ক পৌঁছালেই গ্রাহকের সমস্যা সমাধান হয় না। সেখানে পর্যাপ্ত নেটওয়ার্ক সক্ষমতা, স্থিতিশীল সংযোগ, ভালো ভয়েস কোয়ালিটি এবং ব্যবহারযোগ্য ইন্টারনেট গতি নিশ্চিত করাও জরুরি।
জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এ ঘাটতির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে সাধারণ গ্রাহকের ওপর। শহরে একাধিক নেটওয়ার্ক বা টাওয়ারের বিকল্প থাকলেও প্রত্যন্ত এলাকায় অনেক সময় নির্দিষ্ট একটি টাওয়ারের ওপরই বড় এলাকার গ্রাহকদের নির্ভর করতে হয়। ফলে নেটওয়ার্কের সক্ষমতা কম হলে বা কোনো কারণে সংযোগ দুর্বল হলে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক গ্রাহক সমস্যায় পড়েন।
কলড্রপের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। বিটিআরসির মূল্যায়নে ২জি ভয়েস কলে বাংলালিংকের কলড্রপের হার সবচেয়ে বেশি। প্রত্যন্ত এলাকায় কথা বলার সময় বারবার কল বিচ্ছিন্ন হলে গ্রাহকদের পুনরায় কল করতে হয়। জরুরি যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও মোবাইলভিত্তিক বিভিন্ন সেবার ক্ষেত্রে এ ধরনের সমস্যা ভোগান্তি আরও বাড়ায়।
ইন্টারনেট সেবাতেও জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে চ্যালেঞ্জ বেশি। উচ্চগতির ইন্টারনেট পরীক্ষায় টেলিটকের দুর্বল ফল এ সমস্যার একটি দিক তুলে ধরেছে। এ বিষয়ে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন সাবির আহমেদ বলেন, দ্রুতগতির ইন্টারনেট নিশ্চিত করতে শুধু নতুন প্রযুক্তি বা নেটওয়ার্ক কভারেজ বাড়ানো যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন পর্যাপ্ত স্পেকট্রাম, সক্ষম নেটওয়ার্ক, শক্তিশালী ব্যাকহল, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং নিয়মিত নেটওয়ার্ক অপ্টিমাইজেশন।
দেশে মোবাইল নেটওয়ার্কের জন্য বর্তমানে প্রায় ৫৬ হাজার টাওয়ার রয়েছে। চাহিদা মেটাতে প্রয়োজন ৭০ হাজারের বেশি। ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলে নতুন টাওয়ার স্থাপনের পাশাপাশি বিদ্যমান অবকাঠামোর সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনও রয়েছে। কারণ শুধু কভারেজ বাড়িয়ে সেবার মান উন্নত করা সম্ভব নয়।
সেবার মান যাচাইয়েও এবার নতুন পদ্ধতি নিয়েছে বিটিআরসি। আগে অপারেটরদের দেওয়া কোয়ালিটি অব সার্ভিসের তথ্যের ওপর অনেকাংশে নির্ভর করত কমিশন। এখন নেটওয়ার্ক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এনএমএস), টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সিস্টেম (টিএমএস) এবং ড্রাইভ টেস্টের মাধ্যমে স্বাধীনভাবে নেটওয়ার্ক পারফরম্যান্স যাচাই করা হচ্ছে। এতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কোন অপারেটর কোথায় কী ধরনের সেবা দিচ্ছে, তার তুলনামূলক চিত্র পাওয়া সম্ভব হবে।
গ্রাহকের অভিযোগের তথ্যও সেবার দুর্বলতার বিষয়টি সামনে আনে। ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত চার অপারেটরের বিরুদ্ধে বিটিআরসিতে ৬৬ হাজার ৭০৫টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এর মধ্যে রবির বিরুদ্ধে ২৪ হাজার ৮৭৪টি, গ্রামীণফোনের বিরুদ্ধে ২১ হাজার ৫২৬টি, টেলিটকের বিরুদ্ধে ১১ হাজার ৫৯৪টি এবং বাংলালিংকের বিরুদ্ধে ৮ হাজার ৭১১টি অভিযোগ রয়েছে।
এসব অভিযোগের বড় অংশ সেবার মান, ইন্টারনেটের গতি ও নেটওয়ার্ক-সংক্রান্ত। গত ১৯ আগস্ট বিটিআরসির গণশুনানিতেও গ্রাহকদের বড় একটি অংশ কলড্রপ, ইন্টারনেটের গতি, ডাটা প্যাকেজ ও নেটওয়ার্ক কভারেজ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। অর্থাৎ অভিযোগ নিষ্পত্তির পরিসংখ্যান থাকলেও মাঠপর্যায়ে সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ এখনও রয়ে গেছে।
- বিষয় :
- বিটিআরসি
- মোবাইল
- ইন্টারনেট সেবা