বৃক্ষের কাছে শিখেছি
চরাচরের জিরাফ
প্রচ্ছদ :: আনিসুজ্জামান সোহেল
ধ্রুব এষ
প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৬:৫১
জিরাফের মাথায় জিরাফ দাঁড়িয়ে আছে।
অন্ধকারে ঝাউগাছ দেখে মনে হয়।
এ কথা জলপাইহাটিতে আছে।
জীবনানন্দ দাশের ‘জলপাইহাটি’ উপন্যাস দুইবার পড়েছে ন্যাথানিয়েল। বছর ছয়েক আগে একবার। গত ছয় দিনে একবার। ঝাউগাছ ছয় বছরের মধ্যে দেখে নাই যদিও। চোখে পড়ে নাই।
ন্যাথানিয়েলদের টাউনে আর ঝাউগাছ নাই। একশ বছর আগে ছিল। কলেজ বার্ষিকীতে টাউনের কলেজের ফিজিক্সের অধ্যাপক টি. এস. ফেয়ারক্রস লিখেছেন– ফড়িংউড়ায় কিছু ঝাউগাছ আছে। উইলি নিশ্চিত করেছে ন্যাথানিয়েলকে। বিরহবেদনায় করুণ দিন যাচ্ছে উইলির। ডেভিড কাকার মেয়ে লিন্ডা সাইপ্রাস চলে গেছে তিন বছরের জন্য। বলে গেছে ফিরে বিয়ে করবে উইলিকে। মুশকিল হলো উইলির সেলফ কন্ট্রোল নাই। তিন বছর দীর্ঘ সময়। ছয়ত্রিশ মাস। ছয়ত্রিশ ঘণ্টা হয় নাই ‘জগদ্বিখ্যাত’ ফিওনা একটা ওল্ডি-গোল্ডি গানের লিংক দিয়ে রেখেছে উইলিকে। বিখ্যাত অ্যাবা গ্রুপের ‘টেইক আ চান্স।’ উইলি শুনেছে।
ইফ ইউ চেঞ্জ ইয়োর মাইন্ড
আ’ম দ্য ফার্স্ট ইন লাইন
টেইক আ চান্স অন মি
মাইন্ড যদি চেঞ্জ হয়ে যায় উইলির? উইলির সঙ্গে কোনোভাবেই ফড়িংউড়া যাবে না ন্যাথানিয়েল। উইলি মদ খাবে, মাতাল হবে, সব মাটি করবে। সর্বোপরি কবিতা শোনাবে। –বিরহ বেদনার বাঙ্ময় প্রকাশ বলে যেটাকে আখ্যায়িত করা যেতে পারে।
ন্যাথানিয়েল কল দিল ছোট বৃক্ষকে, ‘ছোট বৃক্ষ, তুমি কোথায়?’
‘ঘরে। কেন?’
‘ঘরে? কেন?’
এ সময় ছোট বৃক্ষ ঘরে থাকে না। শিল্পকলা একাডেমি বা নাটক সরণি এলাকায় থাকে।
‘আমার জ্বর’ বলে ছোট বৃক্ষ হাসল।
‘জ্বর? কত? জ্বর হওয়ায় তুমি খুশি মনে হয়? এদিকে জিরাফের মাথায় জিরাফ দাঁড়িয়ে আছে।’
‘কী?’
‘জিরাফের মাথায় জিরাফ দাঁড়িয়ে আছে। দেখা যায়।’
‘কোথায় দেখা যায়?’
‘সেই এক স্থান আছে–।’
‘সবচেয়ে সুন্দর করুণ?’
‘তুমি ব্রিলিয়ান্ট ছোট বৃক্ষ। পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর করুণ স্থান ছাড়া সেই পটভূমি রচিত হয় না। ঠিক।’
‘জিরাফের মাথায় জিরাফ। পিঠে না? মাথায়?’
‘মাথায়। আমি দেখতে যাব। তুমি যাবে?’
‘আপনার সঙ্গে? যাব? চলেন। কবে? কখন?’
‘এবে। এখন।’
‘এখন যাব না। আমার জ্বর।’ বলে ছোট বৃক্ষ আবার হাসল। ছোট বৃক্ষ প্রকৃত প্রস্তাবে কাতালিয়া মানকিন। উইলির কবি বন্ধু বিজন মানকিনের বোন। বিজন মানকিন নেশা করে মরেছে। ছোট বৃক্ষ এখনও সেই ট্রমা কাটিয়ে উঠতে পারে নাই। বিজন মানকিনকে দেখেছে ন্যাথানিয়েল। আনালে বিনালে, গাড়া-গপ্পরে। কাতালিয়ার সঙ্গে তখনও ন্যাথানিয়েলের পরিচয় হয় নাই। –কাতালিয়া একরকম ক্যাকটাসের ফুল। সাদা রঙের হয়। কাতালিয়া মানকিন কালো রঙের। চোখে কাজল দেয়। নাকফুল পরে। ছোট বৃক্ষ কেন? বড় বৃক্ষ একজন আছেন। ন্যাথানিয়েলরা ডাকে বৃক্ষদাদা। বৃক্ষদাদা কাতালিয়া মানকিনের নাম দিয়েছেন ‘ছোট বৃক্ষ’। আমার জ্বর বলে হাসে কেন সে? ছোট বৃক্ষ?
‘তোমার জ্বর কত? নিরানব্বই?’
‘না, আমার জ্বর। একশ ছয়। আমি রাখি।’
ছোট বৃক্ষ লাইন কেটে দিল। ন্যাথানিয়েল কিছু বুঝতে পারল না।
বৃক্ষদাদা থাকেন বাসাবো এলাকায়। বইপত্র আর অ্যানটিকে ঠাসা তাঁর ঘর। ‘ওল্ড কিউরিও শপ’ মনে হয়। মাঝেমধ্যে যায় ন্যাথানিয়েল। বৃক্ষদাদা ধূমপায়ী। অম্বুরি তামাক সেবন করেন হুঁকোতে। অম্বুরি তামাকের ঘ্রাণে ভূত আসে– এ রকম কথা আছে। চার্চের ঘণ্টাবুড়ো পিতরের কাছে ছেলেবেলায় শুনেছে ন্যাথানিয়েলরা। পিতর আছে। নব্বইয়ের ওপর বয়স হয়ে গেছে। এখনও চার্চের ঘণ্টা নিয়মিত দেয়। বড়দিনের আগে পাহাড়ে যায়। পথ দেখিয়ে টাউনে নিয়ে আসে সান্তাকে। অম্বুরি তামাকের গল্প বলে এখনও। এমেলিয়ার দুই মেয়েকে বলেছে। কুইনি টুইনি। তারা চোখ বড় করে তাদের ন্যাথানিয়েল মামাকে বলেছে, ‘পিতর দাদা হুঁকো টানলে ভূত আসে তুমি জানো?’
বৃক্ষ দাদার ঘরে কি ভূত আসে?
সেটা ছিল এক কার্তিকের সন্ধ্যা। বৃক্ষদাদার সঙ্গে নিরুৎপাত দেখা করতে গিয়েছিল ন্যাথানিয়েল– বৃক্ষদাদার ওল্ড কিউরিও শপে এক নাক বোঁচা মেয়েকে দেখল– শার্ট পরে আছে, ট্রাউজারস পরে আছে– চেয়ারে পা উঠিয়ে বসে গুড়ুক গুড়ুক করে তামাক সেবন করছে। অম্বুরি তামাক। বৃক্ষদাদা উচ্ছ্বসিত হলেন, ‘হেই ন্যাথানিয়েল, কতদিন পর? বসো। বসো। এই যে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি, এ হলো কাতালিয়া। কাতালিয়া মানকিন। আমি নাম রেখেছি ছোট বৃক্ষ।’
‘হাই! আমি ন্যাথানিয়েল।’
ছোট বৃক্ষ বলল, ‘ন্যাপথলিন।’
‘ন্যাথানিয়েল।’
‘সেটা বলিনি। ন্যাপথলিন মনে রাখলে ন্যাথানিয়েল মনে থাকবে। হুঁকো টানবেন?’
বৃক্ষদাদা বললেন, ‘টানবে না কেন? দাও ওকে।’
সেই সন্ধ্যা কত বছর আগের? দুই বছর? দুই হাজার বছর? বিজ্ঞানমনস্ক রিচার্ড জটিল কথা বলেছে, ‘সময়ের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও ভেদ নাই। সময় ফ্ল্যাট।’ বিজ্ঞান অ-মনস্ক ন্যাথানিয়েল বুঝে নাই। মনে মনে যে কোনো ঘটনার কালান্তর ঘটিয়ে আনন্দ পায় সে। ১০ মিনিট আগের ঘটনাকে ১০ লক্ষ বছর আগে নিয়ে যায়। ইজিপ্টের প্রতি তার ফ্যাসিনেশন আছে। কিছু ঘটনাকে এনশাইন্ট ইজিপ্টে নিয়ে যায়। এই হিসাবে সেই সন্ধ্যা পাঁচ হাজার বছর আগের। বৃক্ষদাদা তখন আলেকজান্দ্রিয়ার শিল্পগুরু আখনাতেন হয়তো। ন্যাথানিয়েল সেনসুরেত নবীন চিত্রকর। ছোট বৃক্ষ কাতালিয়া নেফার। –আখনাতেন সেনসুরেতকে নির্দেশ দিয়েছেন উৎকৃষ্ট রূপে ফিগার অনুশীলন করতে। সেনসুরেত উৎকৃষ্ট ফিগার অনুশীলন করেছে। সেটা নেফারের। আখনাতেন ক্রোধান্ধ হয়েছেন। –এ জাতীয় ফ্যান্টাসি তার মাথায় আসে কেন? ন্যাথানিয়েল কখনও চিন্তা করে দেখে নাই। আসে।
ছোট বৃক্ষ ফোন কেটে দিল, সত্যি কি তার একশ ছয় ডিগ্রি জ্বর? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চ্যাটজিপিটির খয়রাতি সাহায্য নিল ন্যাথানিয়েল।
‘১০৬ ডিগ্রি জ্বর হতে পারে মানুষের?’
চ্যাটজিপিটি লিখিত দিল, হ্যাঁ। ১০৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট জ্বর মানুষের হতে পারে। তবে এটা অত্যন্ত উচ্চমাত্রার জ্বর, যাকে মেডিকেল ভাষায় হাইপারপাইরেক্সিয়া বলা হয়। এই অবস্থায় নিম্নলিখিত সমস্যা হতে পারে–
ব্রেন ড্যামেজ (মস্তিষ্কে প্রভাব)
খিঁচুনি
শ্বাসকষ্ট
অজ্ঞান হয়ে (অসমাপ্ত)
মুশকিলের কথা। ছোট বৃক্ষর নিশ্চয় ব্রেন ড্যামেজ হয় নাই? খিঁচুনি, শ্বাসকষ্ট দেখা দেয় নাই? ছোট বৃক্ষ নিশ্চয় অজ্ঞান হয়ে যায় নাই? তবে? আবার কল দিল ন্যাথানিয়েল। ছোট বৃক্ষ ধরল, ‘কী হয়েছে? আমার জ্বর।’
‘সত্যি তোমার ১০৬ ডিগ্রি জ্বর?’
‘দরজা খুলে দেখেন।’
‘কী?’
‘দরজা খুলে আমার জ্বর মেপে দেখেন।’
বোকা হয়ে দরজা খুলল ন্যাথানিয়েল। ছোট বৃক্ষকে দেখল। ছোট বৃক্ষ হাসল, ‘আপনার ঘরে থার্মোমিটার আছে?’
ন্যাথানিয়েল বলল, ‘না।’
‘তবে জ্বর কীভাবে মাপবেন?’
‘চুমু দিয়ে।’
ছোট বৃক্ষ হাসল, ‘আপনি কি গাছ?’
ন্যাথালিয়েল হাসল।
ছোট বৃক্ষ ন্যাথানিয়েলকে গাছ হতে দেখল। তবে সেটা এখানে না।
ন্যাথানিয়েল হিজল গাছ হলো।
চর উঠেছে, ফড়িং ওড়ে, মানুষজন বলে ফড়িংউড়ার চর, সেই চরে দেখা গেল ন্যাথানিয়েল হিজল গাছ আর নাক বোঁচা ছোট বৃক্ষকে। ছোট বৃক্ষ আরেকটা হিজল গাছ হলো। ভিনসেন্ট নক্ষত্রের রাত পেইন্ট করে দিলেন। দুই হিজল গাছ নিকটবর্তী হলো। চরের ফড়িঙের দল এই রাতে ঘুমায়। তারা কিছু দেখল না।
বহুদূর থেকে কিছু জিরাফের মাথায় জিরাফ দাঁড়িয়ে দেখল।
- বিষয় :
- বৃক্ষরোপণ
