ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

এই ঘুম চেয়েছিল বুঝি!

এই ঘুম চেয়েছিল বুঝি!
×

মেহেদী উল্লাহ

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:৩১

| প্রিন্ট সংস্করণ

বৃদ্ধকে তার সন্তানরা বাপ বলে স্বীকার করে না। কিন্তু তার জীবনের ঘাম ও পরিশ্রমে গড়া সব সম্পত্তি তারা ঠিকই ভোগ করছে। এই ভোগের অধিকার যেন তাদের জন্মসূত্রে পাওয়া, অথচ দায়িত্ব বা মমতা– কিছুই তাদের হৃদয়ে পিতার জন্য জাগে না।
সন্তানদের মধ্যে বিরোধ লেগেই থাকে। জমির সীমানা, পুকুরের মালিকানা কিংবা গাছের ফল নিয়ে প্রতিনিয়ত চলে ঝগড়া। কোনো বিষয়েই তারা একমত হতে পারে না; যেন একে অপরের বিরুদ্ধে অনন্ত প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। তবু অদ্ভুতভাবে, তাদের মধ্যে একসূত্রে বাঁধা রয়েছে একটি স্বার্থময় প্রত্যাশা– বৃদ্ধ পিতা এখনও বেঁচে আছেন, আর কোনো একদিন মৃত্যুর আগেই হয়তো সমস্ত সম্পত্তি তাদের নামে লিখে যাবেন। সেই আশাতেই তারা আছে, অন্তত মুখে মুখে ঐকমত্যে এক উঠানের ঘরে ঘরে।
বৃদ্ধ জানেন, তার বয়সের ভারে শরীর নুয়ে গেছে, তবু সন্তানদের চোখে তিনি এখনও শুধু এক ‘দলিলবাক্স’। শ্রদ্ধা নেই, সহযোগিতা নেই, এমনকি সামান্য সহমর্মিতার উষ্ণতাটুকুও নেই। 
একরাতে বৃদ্ধ ঘুমিয়ে গেল।
সকালে, ফজরের ওয়াক্তের কিছু আগে তার ঘুম ভাঙল। ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল সে– শরীরের প্রতিটি অস্থি যেন বহু বছরের ভারে ক্লান্ত। অজু সেরে নামাজ পড়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হলো। বহু বছর ধরে যে মসজিদে সে পাঁচ ওয়াক্ত জামাতে নামাজ পড়ে আসছে, সেদিকেই পা বাড়াল।
কিন্তু কিছুদূর যেতেই মনে হলো, এ পথটা যেন বদলে গেছে। চারপাশের গাছগুলো অচেনা, পাখিরা যেন অন্য কোনো ভাষায় ডাকছে। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ সে বুঝল, মসজিদটা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।
চারপাশে একটিও মানুষ নেই। 
ভোরের আলো ফুটল। বৃদ্ধ বিস্মিত চোখে তাকিয়ে দেখল, ত্রিসীমানার মধ্যেও কোথাও কোনো মসজিদের চিহ্ন নেই।
বিহ্বল পায়ে ফিরে এলো বাড়ির দিকে। কিন্তু বাড়ি এসে বুঝল, এটাও আর তার বাড়ি নয়। ঘরগুলোর ভগ্নদশা, দেয়াল ঝরে পড়েছে, উঠোনে আগাছা। 
বৃদ্ধ ছেলেদের নাম ধরে ডাকল একে একে। কোনো সাড়া নেই। আরও জোরে ডাকল, চিৎকার করে উঠল।
চিৎকার শুনে আশপাশের কিছু মানুষ ছুটে এলো। অপরিচিত মুখগুলো বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল তার দিকে। বৃদ্ধ একে একে সন্তানদের নাম বলল। মানুষগুলো হতবাক হয়ে বলল, ‘এই নামগুলো আমরা কোনোদিন শুনিনি। এই গ্রামে এমন কেউ কোনোদিন ছিল না।’
বৃদ্ধ স্তব্ধ হয়ে গেল। কেউ বলল, একশ বছর, কেউ বলল, দুইশ। সবাই বলাবলি করছিল, ঘুমের মধ্যেই বৃদ্ধের কেটে গেছে শতাব্দী!
কিন্তু বৃদ্ধ কিছুই বুঝতে পারল না। শুধু আরও জোরে, মরিয়া হয়ে চিৎকার করে উঠল।
ঠিক সেই মুহূর্তে তার চিৎকারেই ঘুম ভেঙে গেল।
বৃদ্ধ দেখল, সে এখনও নিজের খাটে, ঘরের কোণে। বাইরে আজান ভেসে আসছে ফজরের। সবকিছু আগের মতোই।
তবু বুকের ভেতর অদ্ভুত এক শূন্যতা রয়ে গেল, স্বপ্নটা কি সত্যিই শুধু স্বপ্ন?
বৃদ্ধ অজু করতে করতে মনে পড়ল, রাতে ঘুমানোর আগে সুরা আল-কাহাফের কিছু অংশ পাঠ করেছিল। হঠাৎ তার মনে হলো, হয়তো স্বপ্নের সেই দীর্ঘ সময়ের ঘুম কোরআনের সেই কাহিনিরই কোনো প্রতিধ্বনি– গুহাবাসী তরুণদের মতো, যারা তিনশত নয় বছর পর জেগে উঠে দেখেছিল দুনিয়া বদলে গেছে।
বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসছে নিঃশ্বাসের শব্দ– তার সন্তানরা নিজেদের স্ত্রী-সন্তান নিয়ে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে।
সে ভাবল, প্রিয় সন্তানরা, যদি একদিন তোমরাও ঘুম থেকে উঠে দেখতে পেতে– পেরিয়ে গেছে শত শত বছর! গুহাবাসীদের মতো জেগে উঠে যদি তোমরা বুঝতে, সময় কীভাবে সব মুছে দেয়! কতইনা ভালো হতো। তোমাদের এই বোঝাটা থাকত না, এই অবিরাম কলহ, হিসাব-নিকাশ, অভিযোগ– সবই নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত। 

আরও পড়ুন

×