মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গেল দেবদূত
মূল : লাসলো ক্রাসনাহরকাই।। অনুবাদ : সৈয়দ মাজহারুল ইসলাম
প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬ | ০৭:১৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
পর্ব :: ৩
চুম্বক অংশ:
“তুমি যদি ভাবো কিছু বিনামূল্যে পাচ্ছ– তাহলে বুঝবে, পণ্যটা তুমি নিজেই–”
অথবা
“আমরা এখনও ভবিষ্যতের একেবারে শুরুতেই আছি– কিন্তু সামনে এগোনোর প্রশ্ন নয়– বরং যা আছে তা ধরে রাখার লড়াই।”
সে কণ্ঠ নামাল– তার মুখ শুকিয়ে গিয়েছিল– পাশে রাখা বোতল খুঁজে নিয়ে এক চুমুক খেল, গলা পরিষ্কার করল–
বলতে থাকো–
দেখো– সে বলা শুরু করল– ঠিক এভাবেই হবে– যেমনটা আমি বলছি– কেউ হয়তো বলবে, আমি শুধু তোমার মনোবল ধরে রাখতে এসব বলছ– আংশিক সত্য– কিন্তু আরেকটি কারণও আছে– কারণটা হলো ভবিষ্যৎ–
আমরা এখনও ভবিষ্যতের একেবারে শুরুতেই আছি–
– বিশ্বাস করো, আমরা সত্যিই খুব ধনী হয়ে গেছি– কিন্তু সমস্যা হলো, আমাদের ঘরে এখন অতিরিক্ত ভিড় জমে গেছে–
এখন আর সামনে এগোনোর প্রশ্ন নয়– বরং যা আছে তা ধরে রাখার– এই বর্তমান জীবনমান টিকিয়ে রাখার–
এই ভিড়, এই কোলাহলের মধ্যেই– আমাদের সবাইকে একসঙ্গে যুক্ত হয়ে– অনাগত সময়কে রূপ দিতে হবে– এটা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে, কারণ গোলমালটা অসহ্য মাত্রায় পৌঁছেছে– তবে আমি কিন্তু এই গোলমালের কথা বলছি না– সে মাথাটা ওপর দিকে ঝাঁকিয়ে ইশারা করল– ঠিক তখনই আরেক দফা গ্র্যাড মিসাইল মাথার ওপর দিয়ে শোঁ শোঁ করে ছুটে গেল– কয়েক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা– কী হয়– কিন্তু কিছুই হলো না– একে একে সব মিলিয়ে আরও চল্লিশটা শোঁ শোঁ করে উড়ে গিয়ে দূরে কোথাও আঘাত করল–
– ওরা কি আবার আমাদের জন্য ফিরে আসবে বলে মনে হয়?
– তুমি কি ভবিষ্যৎ থেকে ফিরে আসার কথা বলছ, বন্ধু? না, সেখান থেকে কেউ আসবে না– কিন্তু ওরা অবশ্যই আসবে– কারণ আমরা পাল্টা আক্রমণ করব– সুতরাং পেটের সামান্য রক্তক্ষরণ দেখে প্যান্ট নোংরা করার দরকার নেই– ওরা আসবে– ততক্ষণে, দয়া করে, আমি যা বলছি তাতে মনোযোগ দাও–
দেখো, আমরা এখন জড়বস্তুর সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তুলতে ভালোবাসি– ধরো, সে সঙ্গীর দিকে ফিরে বলল– ‘তোমারটার নাম কী? আমারটার নাম জোরিয়া… সুন্দর, তাইনা’ ওর কাছেও থাকবে ঠিক এমনই একটা। ধীরে ধীরে জিনিসটা কেবল যন্ত্র থাকবে না– গভীরভাবে ব্যক্তিগত হয়ে উঠবে; নিজের অভিজ্ঞতা, নিজের চিন্তা বয়ে নিয়ে চলবে; এভাবেই আমরা তাতে আবেগ জুড়ে দেব– এটাই আমাকে জোরিয়ার সঙ্গে বেঁধে রাখবে, যখন আমরা আলাদা– যেমন এখন– ধরলাম সে এখন হামবুর্গে, লাউয়েনস্টাইনস্ট্রাসে ১৫ নম্বরে; আর আমি এই নোংরা গর্তে– সুতরাং কবজির এই ব্রেসলেটের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা হবে একেবারেই আলাদা– হামবুর্গে, লাউয়েনস্টাইনস্ট্রাসে ১৫ নম্বরে জোরিয়ার কাছে ফুলের দোকান থেকে তাজা গোলাপের তোড়া পাঠানোর চেয়েও অনেক বেশি অন্তরঙ্গ, অনেক বেশি নিবিড়; শিগগিরই আমি এই ছোট্ট যন্ত্রটা পরব, জোরিয়াও পরবে– এটাই হবে তার ক্রিসমাসের উপহার; এই দামি, অথচ অদ্ভুতভাবে ঘনিষ্ঠ ছোট্ট ব্রেসলেট!, আর তখন– এই প্রিয় বন্ড টাচটাই ধীরে ধীরে জোরিয়া হয়ে উঠবে–
তোমার মাথাটা আবার কাদায় ঝুলে পড়ছে– সে সঙ্গীকে বকা দিল– যেন আবার নেমে এসে তার কাছে হামাগুড়ি দিয়ে যাবে– কিন্তু গেল না– বাঁ চোখের ব্যান্ডেজের নিচ থেকে রক্ত গড়িয়ে নামছিল– ঝরঝর করে নয়, তবু থামছিল না– ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে এমনই চলছিল– সে ব্যান্ডেজটা একটু সরাতে চেয়েছিল, কিন্তু মনে হলো তাতে বরং আরও খারাপ হচ্ছে– তাই দ্রুত থামল–
তারপর সে আবার বলল–
–আমি কিছুই অনুভব করতে পারছি না।
–পারছো না– সে শান্ত স্বরে মেনে নিল– এটাই স্বাভাবিক; আর এখন নতুন করে ব্যান্ডেজ বাঁধারও কোনো উপায় নেই। তাই আমাদের দুজনকেই একসঙ্গে এটাকে পার হতে হবে– নইলে আমরা এখানেই শেষ– সে একটু থামল, যেন ভেতরের কষ্টটাকে সামলে নিচ্ছে না– কিন্তু শুধু ওদের দেখানোর জন্য আমরা এখানে মরব না। আরেকটু শোনো… আমার কথা–
সে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে অন্যজনের ঝুলে পড়া মাথাটা আবার গুটানো জ্যাকেটের ওপর তুলে রাখল– তারপর ওর পেটের ব্যান্ডেজ ছুঁয়ে দেখল গিঁট এখনও কোমরের চারপাশে যথেষ্ট শক্ত আছে কিনা– তারপর কাদার মধ্যে দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে নিজের প্যালেটে ফিরে এলো– কিনারা হাতড়ে উঠে বসল– গোঙাল– রক্তমাখা হাত প্যান্টে মুছল– চোখের ব্যান্ডেজে হাত দিতে গিয়েও নিজেকে সামলাল–
তবুও তার মুখ থেকে কথা থামল না–
এখানেই আমরা পরের স্তরে যাই– কারণ ডিজিটাল জগতে তুমি যখন ইন্টারনেটে কিছু আপলোড করো, সেটা সেখানে চিরকালের জন্য থেকে যায়– আমরা এটা ভালোভাবে বুঝি না– ভাবি, যা আপলোড করছি, সেটা বোধহয় নেই– কিন্তু আছে– এবং থাকবে– চিরকাল–
তাই আমাদের দায়িত্ব কেবল এমন তথ্যই আপলোড করা, যা আমরা সত্যিই সবাইকে জানাতে চাই– এটা গুরুত্বপূর্ণ– একবার আপলোড করলে, মুছে ফেললেও, সেটা মিলিয়ে যায় না– কখনোই না–
তাই আমাদের মনোভাব পাল্টাতে হবে– কারণ ডিজিটাল ব্যবস্থাগুলো আমাদের আরও শৃঙ্খলাবদ্ধ, আরও সচেতন, আরও বুদ্ধিমান হতে বাধ্য করে– ঠিক যেমন আমরা জীবনের অন্য সব ক্ষেত্রেই হতে চাই– আর এখন আমি এমন একটা কথা বলব, যা তোমার কাছে বিস্ময়কর লাগতে পারে–
কোনো কিছুই বিনামূল্যে নয়– তুমি যদি ভাবো কিছু বিনামূল্যে পাচ্ছ– তাহলে বুঝবে, পণ্যটা তুমি নিজেই–
একটা অ্যাপ তৈরি করতে ডিজাইন লাগে, প্রযুক্তি লাগে, উন্নয়ন লাগে, পরিমার্জন লাগে, হালনাগাদ লাগে– আরও হাজারটা কাজ– এসব কীভাবে বিনামূল্যে হতে পারে? যারা বিনামূল্যে দিচ্ছে তারা আসলে কিনছে– তোমার মনোযোগ, তোমার আচরণ– বদলে তুমি বিজ্ঞাপন দেখবে– আর সেই বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তোমার পছন্দ, তোমার মনোভাব গড়ে উঠবে–
আমি বলছি না এটা ভুল– এটা কারসাজি; অনেকটা মূলত আগেকার ফেরিওয়ালাদের মতোই– যারা পণ্য নিয়ে ঘুরত, গলা ফাটিয়ে তার প্রশংসা করত–
পার্থক্য শুধু এই যে এখন তুমি আছ ডিজিটাল জগতে– দৃশ্যত বিনামূল্যের অ্যাপের ভেতরে– কিন্তু পরিসর অনেক বড়– মুনাফাও–
ফেসবুক তোমার কাছ থেকে বছরে বারো ডলার আয় করে– বিনিময়ে তুমি তাদের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করো– আর তারা তোমার তথ্য বিক্রি করে– এটাই ব্যবসা–
সমস্যা এটা নয়– সমস্যা হলো তুমি যদি এটা সম্পর্কে সচেতন না হও– তুমি ভাববে ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম– সবই বিনামূল্যে– কিন্তু মোটেও নয়– তুমি বিজ্ঞাপনের জন্য নিজেকেই বিক্রি করছ– তোমাকে জানতে হবে– কী পাচ্ছ, কত দামে পাচ্ছ– অসতর্কতা আর আরামপ্রিয়তা ঝেড়ে ফেলতে হবে– কারণ সহজভাবে বললে– বোকামি নিজেই এক ধরনের প্রতিবন্ধকতা–
প্রযুক্তি তো কেবল প্রযুক্তিই– এটা কিছু জিনিস সম্ভব করে, কিন্তু ব্যবহার করবে কি না, সেই সিদ্ধান্তটা শেষ পর্যন্ত তোমারই; প্রযুক্তিকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই– যেমন, স্মার্টফোন থাকলে তুমি আর পথ হারাবে না– ঘরে বসেই কাজ করবে, গান শুনবে, পিৎজা অর্ডার করবে– এসব আমাদের বদলে দিচ্ছে–
আর আমরাও তো বদলাই– যেমন ধূমপান– একসময় কেমন যেন অগ্রহণযোগ্য মনে হোক– অথচ এখন কেমন স্বাভাবিক–
প্রক্রিয়াটা আশ্চর্য দ্রুত– আমরা খুব সহজে শিখি– খুব সহজে বদলাই–
এমনকি– দুই দিনেই আমরা দারিদ্র্য দূর করতে পারি, বন্ধু– আমাদের কাছে মডেল আছে–
–আমার মনে হয় না ওরা আর ফিরে আসবে–
–অবশ্যই আসবে– ধুর– কান্না থামাও– আমার কথা শোনো–
আমরা বড্ড বেশি অপচয়ী– এখনই তা বন্ধ করতে হবে– তা না হলে আমাদের জীবনমান নামবে– ব্যক্তিগতভাবেও, বৈশ্বিকভাবেও–
আরেকটা বিষয় আছে– আমি একে বলি ’ক্যাথেড্রাল নির্মাণের ক্ষমতা’– যেটা আমরা হারিয়ে ফেলেছি–
মধ্যযুগে মানুষ এমন স্থাপনা বানাত, এটা জেনেই যে তারা নিজেরা কখনও শেষটা দেখবে না– তবুও শুরু করত– আজ আমরা তা পারি না– আমাদের চিন্তা স্বল্পমেয়াদি– আমাদের সেই ক্ষমতা ফিরে পেতে হবে– কারণ আমাদের স্বপ্ন দরকার– বড়, সাহসী, দূরদর্শী স্বপ্ন–
–ধুর, রাখো তোমার স্বপ্ন– আমার পানি দরকার,
–পানি নেই– এই নাও, একটু ভদকা– তেষ্টায় কাজ দেয়– তুমি কাতরিয়ো না– বুঝতে পারছি তুমি কষ্টে আছ– আমিও আছি– পাত্তা দিও না–
[ক্রমশ]
- বিষয় :
- গল্প
