ঢাকা বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬

সাক্ষাৎকার

দ্বান্দ্বিকতা উপস্থাপনে উপন্যাসই সেরা

দ্বান্দ্বিকতা উপস্থাপনে উপন্যাসই সেরা
×

হুয়ান গাব্রিয়েল ভাস্কুয়েজ

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬ | ০৭:২৩ | আপডেট: ০১ মে ২০২৬ | ০৭:২৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

সামসময়িক লাতিন কথাসাহিত্যে অগ্রগণ্যদের অন্যতম হুয়ান গাব্রিয়েল ভাস্কুয়েজ। ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ভিয়েনার আকাদিম অব ফাইন আর্টস ভবনে মুখোমুখি হয়েছিলেন জার্মান লেখক, সাংবাদিক ফিলিপ ব্লমের। আলাপ করেছেন ২০২২ সালে প্রকাশিত ‘রেট্রোস্পেকটিভ’ উপন্যাসসহ কথাসাহিত্যের নানান দিক নিয়ে।
শ্রুতিলিখন ও অনুবাদ তারেক মিনহাজ। 
lযারা হুয়ানের কাজের সাথে পরিচিত নন, তাদের জন্য বলছি—হুয়ান গাব্রিয়েল ভাস্কুয়েজ একজন ঔপন্যাসিক, সেই সাথে একজন সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক ভাষ্যকার। তিনি এ পর্যন্ত আটটি উপন্যাস লিখেছেন, তাই না হুয়ান?
ll আমারও তাই মনে হয়। অবশ্য এর মধ্যে প্রথমদিকের দুটো ভুলে যেতে চাই, তবে হ্যাঁ, আট সংখ্যাটিই ঠিক আছে।
lবেশ, তবে আটটিই ধরছি। এ ছাড়া তিনি একজন জনপ্রিয় বক্তা এবং স্প্যানিশ পত্রিকা ‘এল পায়িস’-এ নিয়মিত কলাম লেখেন। আজকের আলোচনার মূল বিষয় হচ্ছে তাঁর নতুন উপন্যাস ‘রেট্রোস্পেকটিভ’। এটি অত্যন্ত চমকপ্রদ একটি উপন্যাস। একজন চলচ্চিত্র পরিচালককে নিয়ে এই গল্প, যিনি একসময় রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন, চীনে ‘রেড গার্ড’ ছিলেন, কলম্বিয়ায় বিদ্রোহী যোদ্ধা ছিলেন এবং পরে চলচ্চিত্র পরিচালক হয়েছেন। তাঁর নাম সের্হিও কাবরেরা। আপনারা চাইলে তাঁর সাথে দেখাও করতে পারেন, তিনি বর্তমানে চীনে রাষ্ট্রদূত হিসেবে কর্মরত আছেন এবং বাস্তব পৃথিবীতেই বিচরণ করছেন। হুয়ান কেন একজন জীবিত মানুষকে নিয়ে উপন্যাস লেখার প্রয়োজন মনে করল?
ll সের্হিও কাবরেরা কলম্বিয়ার অন্যতম পরিচিত চলচ্চিত্র নির্মাতা। নব্বইয়ের দশকে তাঁর একটি ছবি কলম্বিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যবসাসফল ছবি হয়। এই শতকের শুরুর দিকে আমাদের বন্ধুত্ব। যতবারই তাঁর সাথে কথা বলেছি, বুঝতে পেরেছি তাঁর জীবন সাধারণ মানুষের মতো নয়। তাঁর জীবন শুধু রোমাঞ্চকর বা অদ্ভুতই নয়, বরং ২০ শতকের ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে  তাঁর উপস্থিতি ছিল। উডি অ্যালেনের ‘জেলিগ’ চরিত্রের মতো। তিনি খুব লাজুক মানুষ। একবার এক সাধারণ ডিনারে আমরা সবাই যখন খুব বুদ্ধিদীপ্ত কথা বলছি ভাবছিলাম, তখন তিনি শান্তভাবে বললেন, “হ্যাঁ, এটা শুনে মাও সে তুং-এর আমলের চীনে রেড গার্ড হিসেবে কাটানো দিনগুলোর কথা মনে পড়ে গেল।” সাথে সাথে আমাদের সবার কথা থেমে যায়। আমরা বুঝলাম যে আমরা আসলে কেউই তেমন বিশেষ কিছু বলছি না, আসল কথাটি রয়েছে তাঁর কাছে। 
তিনি ষাটের দশকে কমিউনিস্ট চীনে তাঁর জীবন এবং পরে কলম্বিয়ায় ফিরে মাওবাদী গেরিলা বাহিনীতে যোগ দেওয়ার গল্প বলতেন। একসময় অনুভব করলাম যে তাঁর জীবন কেবল রোমাঞ্চকরই নয়, বরং এটি আমার ব্যক্তিগত পছন্দনীয় সেই মেজাজের সাথে মিলে যায়, যে মেজাজের অনুবর্তী আমি সবসময় দেখতে চাইছি কীভাবে রাজনীতি এবং ইতিহাস একজন ব্যক্তির জীবনকে গড়ে দিচ্ছে। প্রথম উপন্যাস ‘দ্য ইনফর্মার্স’ থেকেই আমার চেষ্টা ছিল সেই সন্ধিক্ষণকে বোঝা, যেখানে ব্যক্তিগত জীবন এবং রাজনীতির মিলন ঘটে। পারিবারিক জীবন, স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা বা বন্ধুদের সম্পর্কগুলো কীভাবে রাষ্ট্রীয় ও ঐতিহাসিক শক্তির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, সের্হিওর জীবন ছিল তার এক জীবন্ত উদাহরণ। 

২০১২ সালে যখন আমরা দুজনেই কলম্বিয়ায় ফিরে এলাম, তখন আমাদের ঘনিষ্ঠতা আরও বাড়ল। তাঁকে বললাম, “আমিবিশ শতকের বড় বড় রাজনৈতিক আন্দোলনের কথা বলা তোমার এই জীবন নিয়ে কিছু করতে চাই।”
lএটি স্পেনের গৃহযুদ্ধ থেকে শুরু হয়, যার মূলে ছিলেন সের্হিওর বাবা ফাউস্তো কাবরেরা। তাঁর জীবনের এই পর্যায়গুলো সম্পর্কে আমাদের ধারণা দিতে পারেন।
ll সের্হিও ১৯৫০ সালে জন্মেছেন। তাঁর বাবা ফাউস্তো জন্মেছিলেন বিশের দশকে। গৃহযুদ্ধের সময় তাঁর পরিবার রিপাবলিকান বা প্রজাতন্ত্রীদের পক্ষে ছিল, যারা ফ্রাঙ্কোর ফ্যাসিবাদী বাহিনীর কাছে পরাজিত হয়েছিল। ওই পরিবারে একজন পাইলট ও একজন সেনাসদস্য ছিলেন যারা ফ্রাঙ্কোর বিরোধী ছিলেন, আর তাদের ওপর শাস্তির খড়্‌গ নেমে এসেছিল সবচেয়ে বেশি। ফলে তারা স্পেন ছেড়ে লাতিন আমেরিকায় চলে আসেন। প্রথমে সান্তো দোমিঙ্গো ও পরে কলম্বিয়ায় থিতু হন। ফাউস্তো ছিলেন কবি ও অভিনেতা। তিনি কলম্বিয়ার শুরুর দিকের টেলিভিশন আন্দোলনের সাথে যুক্ত হন। ধীরে ধীরে তিনি বামপন্থি আদর্শের দিকে ঝুঁকে পড়েন, এবং কিউবান বিপ্লবের প্রভাবে কট্টর কমিউনিস্ট হয়ে ওঠেন। কলম্বিয়ার মতো একটি রক্ষণশীল দেশে তাঁর জন্য পরিস্থিতি কঠিন হয়ে পড়ে। একসময় তিনি চীন সরকারের পক্ষ থেকে বেইজিংয়ে স্প্যানিশ ভাষা শেখানোর আমন্ত্রণ পান। 
সেখানে গিয়ে তিনি আরও কট্টর হয়ে ওঠেন এবং একসময় সিদ্ধান্ত নেন তাঁর সন্তানদের প্রথাগত শিক্ষা বন্ধ করে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির হাতে তুলে দেবেন সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের আদর্শে গড়ে তোলার জন্য।
lমাও-এর আমলের চীনের সেই দৃশ্যগুলো বইতে সত্যিই আতঙ্কজনক। যেন অন্য কোনো গ্রহের বর্ণনা ...
llসত্যিই অন্য এক জগৎ। কারণ তারা চীনে পৌঁছানোর ঠিক পরেই ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লব’ শুরু হয়। এক অদ্ভুত দ্বৈত জীবন কাটাতেন তারা—বিদেশিদের জন্য বিলাসবহুল হোটেল আর দেশের সাধারণ মানুষের নিদারুণ কষ্ট। সেখানে একটি দৃশ্য ছিল যেখানে তরুণ সের্হিও স্কুলে ছিলেন। ক্লাসে একজন শিক্ষক যুদ্ধ ও বিমান নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, বিপক্ষ দলের (আমেরিকা) বিমানগুলো আসলে দ্রুতগতিসম্পন্ন ও উন্নত। তখন কী ঘটেছিল? অ্যারোডাইনামিক্স বা পদার্থবিজ্ঞানের ওই শিক্ষক যখন সোভিয়েত বিমানের চেয়ে মার্কিন বিমানের শ্রেষ্ঠত্বের কথা বলেন, তখন সেই উগ্র আদর্শিক উন্মাদনার পরিবেশে শিক্ষার্থীরা তাকে সাথে সাথে ‘শত্রুর সহযোগী’ বা ‘বিপ্লব বিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করে। সের্হিও দেখলেন শিক্ষার্থীরা সেই শিক্ষককে ধাওয়া করছে, কোণঠাসা করে ফেলছে এবং এক পর্যায়ে মাটিতে ফেলে মারধর শুরু করল। সের্হিও বিষয়টির সাথে একমত ছিলেন না, কিন্তু একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে সেই ঘটনাটা ছিল এক বিরাট সত্যের উন্মোচন। আমার কাছে খুব অর্থবহ মনে হয়। সের্হিও মনে করেছিল যে, যা ঘটছে তার সাথে পুরোপুরি একমত না হলেও, তাকে সেই দলের অংশ হয়ে থাকতে হবে; অন্যদের মতো তাকেও কাজ করতে হবে। তাই সে মাটিতে পড়ে থাকা সেই অসহায় শিক্ষকের শরীরের কাছে গিয়ে তাঁকে আলতো করে একটি লাথি মারল—যাতে অন্যরা বুঝতে পারে যে সেও তাদেরই দলের লোক।
lআজকের সের্হিও কাবরেরা তাঁর সেই তরুণ বয়সের সত্তা সম্পর্কে কী ভাবেন? উপন্যাসে দেখা যায়, তাঁর পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছিল সেই জঙ্গলে, যখন তিনি চরম নিষ্ঠুরতা ও কষ্টের মুখোমুখি হয়েছিলেন।
llসে আসলে দ্বিধাবিভক্ত। মনে হয় সে তাঁর সেই সময়ের সাহস ও আদর্শবাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, কিন্তু সেই সাহস যে ভুল পথে পরিচালিত হয়েছিল বা নতুন পৃথিবী গড়ার জন্য যে হিংস্র পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছিল—সেটা নিয়ে তাঁর মনে এখন ঘৃণা আছে। নিজের জীবনের প্রতি তাঁর সবসময়ই খুব স্বচ্ছ একটা দৃষ্টি ছিল, যা সবার ক্ষেত্রে দেখা যায় না। সে জানে যে তাঁর ভেতরে এক ধরনের দোদুল্যমানতা বা অস্পষ্টতা আছে। ঠিক এই কারণেই মনে হয়েছে এই জীবনটি তুলে ধরার জন্য ‘উপন্যাস’ হচ্ছে শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। মানুষের মনের দ্বান্দ্বিকতা ফুটিয়ে তোলায় উপন্যাসই সেরা মাধ্যম। 

আরও পড়ুন

×