ঢাকা বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬

লোক-দার্শনিক ও মানুষ ‘সরদার স্যার’

লোক-দার্শনিক ও মানুষ ‘সরদার স্যার’
×

সরদার ফজলুল করিম [১ মে ১৯২৫–১৫ জুন ২০১৪]

খন্দকার সাখাওয়াত আলী

প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬ | ০৭:২৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

সরদার ফজলুল করিমের (১৯২৫-২০১৪) সঙ্গে আমার পরিচয় মূলত আশির দশকে। কৈশোর বয়স থেকেই আমি বই আশ্রয়ী মানুষ। বলা যায় বইয়ের অভিভাবকত্বে মানুষ হয়েছি। মায়ের মৃত্যুর পর (১৯৮১) বইকে আরও গভীরভাবে আঁকড়ে বাঁচতে শিখি। সেই সময়ে সরদার ফজলুল করিমের ‘প্লেটোর সংলাপ’ বইটি আমার হাতে আসে। তাঁর সক্রেটিসীয় দার্শনিক আলাপ-রীতি ও প্লেটোর বইয়ের অনুবাদ, সরল-ভাষা ভিন্নভাবে–আমি তাঁকে আবিষ্কার করি। পরে আমাদের পরিচয় অন্তরঙ্গ হলে তাঁকে আরও গভীরভাবে জেনেছি। স্যারের নিজের কাছেও তাঁর এই বইটি ছিল বিশেষ প্রিয়। এই বইয়ের মাধ্যমে সরদার ফজলুল করিম গভীরভাবে আমার মনে রেখাপাত করে যান এবং স্থায়ীভাবে জায়গা করে নেন।
দ্বিতীয়ত, তাঁর নামের সঙ্গে পরিচয়ের আরেকটি মাধ্যম ছিল সংবাদ ও বদরুদ্দীন উমরের (১৯৩১-২০২৫) সংস্কৃতি জার্নালটি। আশির দশকে এই জার্নালে (সংস্কৃতি) তিনি ফ্রেডারিক এঙ্গেলসের অ্যান্টি ডুরিং গ্রন্থটি ধারাবাহিকভাবে অনুবাদ করছিলেন। ‘সংবাদ’-এর বিশেষ দিবস উপলক্ষে নানাভাবে তাঁর লেখার সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। সেসব লেখা মূলত খুবই আন্তরিক এবং ব্যক্তিগত, সময় আর সামাজিক অনুষঙ্গ। সরদার ফজলুল করিমের সঙ্গে তৃতীয় পর্যায়ে আমার আরও গভীর সম্পর্কটি স্থাপিত হয় তাঁর সরাসরি ছাত্রী ডক্টর হাফিজা বেগমের মাধ্যমে। তিনি ছিলেন স্যারের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি বিভাগের সরাসরি ছাত্রী। তিনি সম্পর্কে আমার মেজো ভাইয়ের স্ত্রী। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপনা করেছেন দীর্ঘ সময়, বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী। স্যার তাদের রাজনৈতিক দর্শন পড়াতেন। তিনি স্যার সম্পর্কে একটি গল্প করতেন, কার্ল মার্ক্স ও ফ্রেডারিক এঙ্গেলসের কমিউনিস্ট পার্টির ম্যানিফেস্টো ছোট্ট লাল রঙের গ্রন্থটির সঙ্গে তাঁর শিক্ষার্থীদের পরিচয় করবার জন্য অদ্ভুত স্যাটারিক একটি উদাহরণ ক্লাসরুমে টানতেন। ‘আপনারা ভোগ ফ্যাশন নিশ্চয়ই চেনেন, তাঁর বিপরীতে একটি বইয়ের দোকান দেখবেন, ‘জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ’ নামে পাবেন। সেই বইয়ের দোকানে গিয়ে দশ টাকায় কমিউনিস্ট পার্টির ম্যানিফেস্টো বইটা কিনবেন।’ স্যারের প্রসঙ্গ উঠলেই ডক্টর হাফিজা, বারবারই এ গল্পটা শোনাতেন। ডক্টর হাফিজার সে গল্প আমার মনে দারুণভাবে রেখাপাত করে যায়। আজকের যে সাহিত্য প্রকাশ তখন তাঁর নাম ছিল জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী। কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সেই প্রকাশনা সংস্থার এক ধরনের সংশ্লিষ্টতা ছিল। সেই সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে মার্ক্সবাদী সাহিত্যের বইপত্র জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনীতে পাওয়া যেত। 
চতুর্থত, ব্যক্তি সরদার ফজলুল করিমের সঙ্গে আমার সরাসরি পরিচয় নব্বইয়ের দশকের, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙনের পর। আমি তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের ছাত্র। আমার শিক্ষক প্রফেসর অনুপম সেনকে সঙ্গে নিয়ে, সঙ্গে আমার দুই কমরেড অ্যালেক্স আলীম ও চৌধুরী আনোয়ারুল করিম, আমরা চারজন মিলে দুদিনব্যাপী মার্ক্সবাদবিষয়ক একটি জাতীয় সম্মেলন করি। আমি, অ্যালেক্স আলীম ও চৌধুরী আনোয়ারুল করিম তিনজনই তখন কমিউনিস্ট পার্টিতে সক্রিয়। এই সম্মেলনে আমরা ঢাকা থেকে দেশের বিশিষ্ট মার্ক্সবাদী চিন্তাবিদদের জড় করেছিলাম। 
প্রফেসর অনুপম সেন এই সম্মেলনের সমস্ত আর্থিক সহায়তা করেছিলেন। প্রফেসর এম. এম. আকাশ ঢাকা থেকে অতিথিদের চট্টগ্রামে আনতে বিশেষ সহায়তা করেছিলেন। সরদার স্যারকে আনার ব্যাপারে অনুপম সেন ও আমি বিশেষ উৎসাহিত ছিলাম। সেই সম্মেলনে আমরা সরদার ফজলুল করিম, বদরুদ্দীন উমর, হায়দার আকবর খান রনো (১৯৪২-২০২৪), মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, এম.এম. আকাশ, আনু মুহাম্মদ, মনজুরুল হাসান খানসহ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর মাহবুবউল্লাহ, প্রফেসর আফতাব আহমাদ (১৯৪৯-২০০৬), প্রফেসর হাসানুজ্জামান চৌধুরীসহ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রামের প্রগতিশীল সকল বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদদের আনতে পেরেছিলাম। খুবই প্রাণবন্ত ছিল দুদিনব্যাপী এই সম্মেলন। 
আমরা প্রধানত তিনটি বিষয় নিয়ে গভীর আলোচনা করেছিলাম। মার্ক্সীয় দর্শনের ভবিষ্যৎ, বিশ্বব্যবস্থা ও কমিউনিস্ট আন্দোলনের ভবিষ্যৎ এবং নতুন করে ভাঙনের মুখে কমিউনিস্ট পার্টি। স্যার আমার সেমিনারের শেষে আমাদের বাসায় এসেছিলেন। ছাত্রীর রান্না দুপুরের খাবার খেয়েছিলেন। দেখা করেছিলেন, তাঁর পুরোনো কমরেড চিরেন্দ্র কুমার সরকারের সঙ্গে। চিরেন্দ্র সরকার তখন ছিলেন শয্যাশায়ী (Bed-ridden)। চট্টগ্রামের আমাদের পরস্পরের পরিচয় পরে আরও গভীর ও নিবিড় হয়েছে। 
সরদার স্যার প্লেটোর সঙ্গে নিজের সম্পর্ক তুলে ধরতে গিয়ে তিনি লিখেছিলেন–‘প্লেটো আমার দ্বিতীয় পিতা’। ১৯৯৪ সালে কাজের সূত্রে আমি ঢাকায় এলে, আমাদের সম্পর্ক ‘পিতা-পুত্রে’র মতো এক গভীর মায়ার জড়ায়। সেই অর্থে ‘সরদার স্যার আমার দ্বিতীয় পিতা’। 

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, স্যারে মৃত্যুর পর কিংবা আগে এটিই তাঁর ওপর আমার প্রথম লেখা। স্যারের ওপর বই লিখতে গিয়ে, সে লেখা আর শেষ করা হয়নি। সে প্রসঙ্গ আজ থাক। সরদার স্যার বরিশাল জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে ঢাকা কলেজে পড়াশোনা করেন। পরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪৫ সালে দর্শনশাস্ত্রে অনার্স ও ১৯৪৬ সালে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনশাস্ত্রে শিক্ষকতা করেন। ছাত্রজীবন থেকেই শোষণমুক্ত মানবতাবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে আন্দোলন-সংগ্রামে জড়িত ছিলেন। দর্শনে মাস্টার্স শেষ করলে, বিভাগীয় প্রধানের অনুরোধে তিনি দর্শনে ক্লাস নেওয়া শুরু করেন। তিনি দর্শনে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। পরে তাঁর বিদেশে পড়ার সুযোগ হয়। তিনি ব্রিটিশ স্কলারশিপ পান। কমিউনিস্ট পার্টির সংশ্লিষ্টতার কারণে, তিনি পার্টির অনুমতি নিতে কলকাতায় যান, কমরেড মুজফফর আহমদের (১৮৮৯-১৯৭৩) সঙ্গে দেখা করতে। স্কলারশিপের কাগজ দেখিয়ে অনুমতি চাইলে কমরেড মুজফফর আহমদ বলেছিলেন, ‘আপনি বিদেশে যাবেন পড়াশোনার করতে আর আমরা ভেরেন্ডা ভাজবো।’ অর্থাৎ তিনি তাঁকে সার্বক্ষণিক কর্মী হিসেবে পার্টি করবার আহ্বান জানান। ঢাকায় ফিরে তিনি পার্টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়ে পড়েন। তখন কমিউনিষ্ট পার্টি নিষিদ্ধ ছিল এবং আত্মগোপনে চলে যান কমিউনিস্ট পার্টির নিদের্শনা নিয়ে । 
তাঁর সমসাময়িক তিন বন্ধুর বিষয়ে তিনি আবেগপ্রবণ স্মৃতিচারণ করেছেন। তারা তিনজন কমরেড রবীন্দ্রনাথ গুহ (১৯২৩-২০০২), প্রফেসর নাজমুল করিম (১৯২২-১৯৮২) ও প্রফেসর মুনীর চৌধুরী (১৯২৫-১৯৭১)। রবীন্দ্রনাথ গুহ, রবি গুহ নামে বেশি পরিচিত ছিলেন। রবি গুহ তাঁকে কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে নিয়ে আসেন। তিনি আজীবন ছিলেন সাম্যবাদী নেতা। যাকে ‘অগ্নিঝরা দিনের সাথি’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। তাঁর জন্ম বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনীতে। সারাজীবন সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য লড়ে গেছেন। আরেকজন প্রফেসর নাজমুল করিম, তিনি সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা। প্রফেসর মুনীর চৌধুরী ছিলেন বাংলাদেশের একজন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, নাট্যকার, সাহিত্য সমালোচক এবং ভাষাসংগ্রামী। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন এবং ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে কারাবরণ করেন। ১৯৫২ সালে জেলে থাকাকালীন তিনি বিখ্যাত নাটক ‘কবর’ রচনা করেন। ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সৈন্যরা রাজাকার আলবদরদের সহায়তায়, তাঁকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে হত্যা করে। সরদার স্যার এঁদের তিনজনকে খুব পছন্দ করতেন, ভালোবাসতেন। এদের সম্পর্কে স্যারের মুখে বহু গল্প শুনেছি। 
রাজবন্দি হিসেবে ১১ বছর বিভিন্ন পর্যায়ে কারা জীবনযাপন করেন। স্যার আত্মগোপন অবস্থায় উনিশশো চুয়ান্ন সালে জেল থেকেই সরাসরি যুক্তফ্রন্টের টিকিট নিয়ে পাকিস্তান আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন। কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হিসেবে তিনি আইনসভায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। স্যার বারবার গর্ব করার স্বরে গল্প করতেন, তাঁর নির্বাচিত হবার খবর আমেরিকা দৈনিক সংবাদপত্রে আট কলামে হেডলাইন হয়েছিল লাল রঙে। জেল থেকে বের হন উনিশশ তেষট্টি সালে। ১৯৬৩-৭১ সাল পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করেন বাংলা একাডেমির সংস্কৃতি বিভাগের মুখ্য কর্মকর্তা হিসেবে।
বাংলা একাডেমিতে যোগদানের পাশাপাশি তিনি, আমার বিবেচনায় রাজনৈতিক কাজ হিসেবে, দর্শনের ক্ল্যাসিক গ্রন্থগুলো অনুবাদের দায়িত্ব নিজের ঘাড়ে তুলে নেন। স্যার প্রায় একটি কথা বার বার বলতেন আর বেশ গর্ব কবে বলতেন, ‘আমি কৃষকের পোলা’। আর তাঁর নিজস্ব অনুবাদের দর্শনের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলতেন, ‘আমার কৃষক বাবা, আমার কৃষক বোকা বাবা, মুখটি স্মরণ করেই আমি বাংলায় আমার সব লেখা লিখেছি’। এটাই ছিল তাঁর ইংরেজি ভাষা থেকে দর্শনের ক্ল্যাসিকগুলো বাংলা ভাষায় অনুবাদ করার মূল অনুপ্রেরণা ও প্রণোদনা। তিনি প্লেটো, অ্যারিস্টটল, রুশোর মূল বইগুলো একক উদ্যোগে অনুবাদ করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে অনুবাদ করেন ফ্রেডরিক এঙ্গেলসের এন্টি ডুরিং। উল্লেখযোগ্য দর্শনবিষয়ক অনূদিত গ্রন্থগুলো যথাক্রমে–প্লেটোর সংলাপ, প্লেটোর রিপাবলিক, অ্যারিস্টটলের পলিটিক্স, রুশোর সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট, আমি রুশো বলছি (দি কনিফেশানস), ও দর্শনকোষ। উল্লেখ্য যে, প্লেটোর রিপাবলিক-এর বর্তমান অনুবাদ জোয়েট, কর্নফোর্ড এবং লির ইংরেজি অনুবাদের ভিত্তিতে স্যারের একটি পূর্ণাঙ্গ বাংলা অনুবাদ করেছিলেন। সরদার ফজলুল করিমের ‘প্লেটোর রিপাবলিক’ অনুবাদ এবং প্লেটোর দর্শন আলোচনার ক্ষেত্রে যা বাংলা সাহিত্যে একটি মূল্যবান সংযোজন। সরদার ফজলুল করিমের অ্যারিস্টটল-এর পলিটিকস বিশ্বজ্ঞান ভান্ডারের চিরায়ত জ্ঞানের বাংলা রূপান্তর। বাংলাদেশে পলিটিক্‌স-এর এরূপ পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ এই প্রথম। যা ছিল সরদার ফজলুল করিমের দীর্ঘ ছয় বছরের একনিষ্ঠ পরিশ্রমের এক ফসল। 
অনুবাদের ক্ষেত্রে সরদার ফজলুল করিম তিনটি বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছেলেন, প্রথমত, অনুবাদ হতে হবে সহজবোধ্য ও সাবলীল। দ্বিতীয়ত, অনুবাদ কাজটিকে তিনি ভাষার রূপান্তর হিসেবে বিবেচনা করতেন। অর্থাৎ আক্ষরিক ভাষায় অনুবাদের পরিবর্তে ভাষার-রূপান্তর। তৃতীয়ত, অনুবাদের মর্ম সাধারণ পাঠকের কাছে সহজবোধ্য করার জন্য, নিজস্ব বিশ্লেষণসহ একটি বিশদ ভূমিকা যেমন তিনি লিখতেন। তেমনি গ্রন্থের পরিশিষ্টে সমগ্র গ্রন্থের আলোচিত বিষয়ের একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণও পেশ করতেন। এই বইগুলো অনুবাদ করার তাঁর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বাঙালি শিক্ষার্থী এবং রাজনৈতিক কর্মীদের রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে পরিচিত করবার জন্যে। তাঁর অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ বই দর্শনকোষ; যা রাজনীতি এবং দর্শনের মৌলিক ধারণাগুলো বাংলা ভাষায় রাজনৈতিক কর্মী এবং শিক্ষার্থীদের জন্য তিনি তুলে ধরেছেন; যা ছিল বাংলায় দর্শন চর্চার একটি জ্ঞানভিত্তি সচেতন প্রচেষ্টা। এই কাজগুলো তাঁর জন্য সহজ হয়েছিল, একাত্তুর সালে দেশ স্বাধীন হবার পর, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের কারণে। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস তাঁকে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে কাটাতে হয়। ১৯৭২-৮৫ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ছিলেন। জাতীয় অধ্যাপকের মর্যাদায় ভূষিত হন তিনি। শিক্ষকতা ও অনুবাদ কাজের অবদানের জন্য তাঁকে সরকার বাংলা একাডেমি ও স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করে। 
অনূদিত গ্রন্থের বাইরে সরদার ফজলুল করিম বেশ কিছু আত্মজৈবনিক লেখা লিখেছেন। যেসব লেখায় ব্যক্তি, সমাজ ও প্রতিষ্ঠানের নানা ঐতিহাসিক চিত্র উঠে এসেছে। সরদার ফজলুল করিমের জ্ঞান চর্চা ও কাজে দুটি ভূমিকা সুস্পষ্ট। একদিকে তিনি অর্গানিক ইন্টেলেকচুয়াল হিসেবে যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক, জ্ঞান সৃষ্টিতে অবদান রেখেছেন, জ্ঞানের ভাষান্তরের মাধ্যমে তিনি জাতীয় ভাবসম্পদ তৈরিতে গভীর অবদান রেখেছেন। অন্যদিকে জীবনের অভিজ্ঞতাকে দার্শনিক প্রশ্ন দিয়ে, অনুসন্ধানী মন ও প্রশ্ন দিয়ে দিয়ে, ব্যক্তি মানুষ ও গোটা জাতিকে তার জাতিসত্তা ও ব্যক্তির মানবসত্তা কিংবা মনুষ্যত্ব আবিষ্কারে বারবার প্রশ্নের সম্মুখীন করেছেন। মানুষকে, নিজেকে নিজের বিবেকের সামনে দাঁড় করিয়েছেন। 
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পুনরায় শিক্ষক হিসেবে ফিরে আসার বিষয়টি বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। ১৯৭২ সালের এক সকালে প্রফেসর আবদুর রাজ্জাক (১৯১৪-১৯৯৯) বাংলা একাডেমিতে সরদার ফজলুল করিমের রুমে এসে ঢুকলেন এবং তাঁকে বললেন, ‘সরদার ব্যাগ গুছাইয়া লন, আমার লগে যাইবেন।’ রাজ্জাক স্যারের সঙ্গে গাড়িতে এসে দেখেন, গাড়িতে রয়েছেন স্বাধীন বাংলাদেশের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী (১৯২২-১৯৭৮)। তিনি ছাত্রছাত্রীদের কাছে ‘ম্যাক’ নামে বেশি পরিচিত। গাড়ি চলতে থাকে বঙ্গভবনের দিকে। বঙ্গভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের (১৯২০-১৯৭৫) সামনে গিয়ে উপস্থিত হন। বঙ্গবন্ধু চেয়ার থেকে উঠে সরদার ফজলুল করিমের দিকে এগিয়ে এসে তাঁকে জড়িয়ে ধরে বলেন, ‘কমরেড আইছেন।’ প্রফেসর আবদুর রাজ্জাকের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘স্যার, আমার কমরেড আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টারি করব।’ এভাবেই সরদার ফজলুল করিম দ্বিতীয়বারের মতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসেন। ঘরের ছেলে ঘরে ফেরার মতো। সরদার ফজলুল করিম তাঁর জবানিতে বলেন, লাইব্রেরির এক কর্মী তাঁর এই ফিরে আসাকে অদ্ভুতভাবে বর্ণনা করে বলতেন, ‘সেই যে আটচল্লিশ সালে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আত্মগোপনে গেলেন, ফিরে এলেন দেশটারে স্বাধীন ক্যারা, আপনি বড় শক্ত মানুষ।’
তাঁর আত্মজীবনী ও অন্যান্য বইটি বিশেষ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এ ছাড়াও রয়েছে নানা কথার পরের কথা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ববঙ্গীয় সমাজ: অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক-এর আলাপচারিতা, রুমীর আম্মা ও অন্যান্য প্রবন্ধ, চল্লিশের দশকের ঢাকা (প্রথম তাঁর কমরেড কিরণঙ্কর সেনগুপ্তের সঙ্গে ও পরে এককভাবে এ বইটি লেখেন), নূহের কিশতি এবং অন্যান্য প্রবন্ধ। 
স্যারের ২০০৯ সালে প্রকাশিত ছোট একটি বই আজ আমার সার্বক্ষণিক সাথি। গ্রন্থটির নাম ‘আমি মানুষ’। এই বইটি আমার দেখা সরদার ফজলুল করিমকে খুঁজে পাই। আশি বছর ঊর্ধ্ব সরদার ফজলুর করিম নিজের কাজে মগবাজারে জ্যোতি আর রবিকে দেখতে যাচ্ছেন। পড়াতে যাচ্ছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে কিংবা আর কে মিশন রোডের সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটিটে। ঘুরে বেড়াচ্ছেন শাহবাগের বইয়ের দোকানে কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। হাফহাতা শার্ট, কাঁধে শান্তিনিকেতনী ব্যাগ আর হাতে পা ভাঙার পর থেকে সাথি সেই লাঠি। টুকটুক ছোট ছোট পায়ে হাঁটছেন, আর তরুণ-যুবারা তাঁর পিছু নিচ্ছেন। তিনি তাদের সঙ্গে মানুষ আর জীবনকে ঘিরে নানা প্রশ্নে আর আলাপে জড়িয়ে পড়ছেন। কখন আমাদের নিজেকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন, ‘আমি মানুষ’ পরিচয়টি। এ ছোট্ট বই ক্ষুদ্র নাম ভূমিকায় তিনি লিখছেন, ‘আমি কি মানুষ? যখন এ প্রশ্নের আমি জবাব দিতে পালাম না … তখন আমার এক স্নেহাস্পদ কয়েকটি শিরোনামের মুদ্রণ আমার চোখের সামনে রেখে জিজ্ঞেস করলেন, এই শিরোনামগুলোকে আপনি কি স্বীকার করেন না? আমি শিরোনাম কয়টির দিকে তাকিয়ে ধরা গলায় স্নেহাস্পদকে বলেছিলাম: তুমি আমাকে জীবন ফিরিয়ে দিলে। তোমাকে এ জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি আমার জীবন দিয়ে (২০০৮)।’
স্যারকে ঘিরে আরও দুটি কথা খুব মনে পড়ে। যখনই আমি স্যারের ঢেরায় যেতাম। তাঁকে প্রতিবারই নতুনভাবে জয় করতে হতো। ‘তরুণ কেন আসে বৃদ্ধের কাছে, বৃদ্ধ জানতে চায়, জানতে চায়’। কিংবা ‘যে আমাকে ভালোবাসলো সে আমার চেয়ে বড়। সেই অর্থে আকাশ-লীনা আমার চেয়ে বড়, সাখাওয়াত আমার চেয়ে বড়।’ তাঁর মন আর প্রাণ জুড়ে ছিল– সাম্যবাদী এক সর্বজনীন মানবিক প্রেমময়তা। 
তাই সরদার স্যার আমার কাছে একজন লোক-দার্শনিক ও মানুষ। দুটি সত্তাই তাঁর মাঝে প্রবল ও সমানভাবে উপস্থিত। তিনি অর্গ্যানিক ইন্টেলেকচুয়াল হিসেবে শিক্ষকতা ও জ্ঞান উৎপাদনে যেমন সফল; সমানভাবে সফল জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত উদযাপনে। মানুষের সঙ্গে সংলাপ তৈরি করে, মানুষের প্রাকৃত দার্শনিক সত্তা অর্থাৎ মানুষের সহজাত অনুসন্ধিৎসু মন, অস্তিত্বের মূল খোঁজার প্রবণতা এবং প্রকৃতির সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ককে বোঝাতে পেরেছেন সরল ও সহজ কথায়-আলাপ আর লেখায়। আমার কাছে তাঁর মৃত্যু নেই। মৃত্যুর পরও স্যার হাজার বছর নিজের সলতের জোরে মানুষ ও তাঁর মানবিক সত্তার মাঝে, মানুষের সংগ্রামে বেঁচে থাকবেন। আমার কাছে সরদার ফজলুল করিম মানে, একজন লোক-দার্শনিক, একজন দার্শনিক মানুষ এবং একজন সামাজিক শিক্ষক। 
কেবল একজন সরদার ফজলুল করিমই এমন ও বাক্য লিখতে পারেন। তাঁর ‘ত্রিশ হাজার বছর পর’ ছোট প্রবন্ধটি আমাদের সে কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। যে প্রবন্ধে তিনি লিখছেন, ‘মহৎ কোনো চিন্তার সাক্ষাৎ পেলে চিন্তাটা কার সে প্রশ্নের চাইতে, বড় হচ্ছে চিন্তার মহত্ত্বটি। মহৎ সত্যের কোন বিকল্প নেই, তেমনি মহৎ চিন্তার মালিকানা নিয়েও বিরোধের কোন হেতু নেই।’ এ প্রবন্ধের শেষ প্যারাটি সমসাময়িক পৃথিবীর জন্য খুবই প্রাসঙ্গিক। তিনি লিখেছেন, ‘আজকের পৃথিবী ক্ষুদ্র বটে। আবার বিচিত্ররূপে বৃহৎও বটে। রাশিয়ার ব্যাপার যেমন রাশিয়ার ব্যাপার, তেমনি আমাদেরও ব্যাপার। আমেরিকার যেমন আমেরিকার ব্যাপার, তেমনি আমাদের ব্যাপার। যেমন বাংলাদেশের, তেমনি পৃথিবীরও। আবার এও সত্য যে, রাশিয়ার ব্যাপারে আমাদের ব্যাপার হলেও রাশিয়ার কোন সরকার বা ব্যবস্থা ডুবলে বা আদর্শগতভাবে ব্যর্থ হলে আমাদের ডুবতে হবে কিংবা আদর্গতভাবে ব্যর্থ বলে প্রমাণিত হতে হবে, তেমন কোন স্বতঃসিদ্ধ কথা নেই।’ 
আমাদের সরদার স্যার, লাল সালাম কমরেড। 

আরও পড়ুন

×