ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

সহযাত্রীর চোখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সহযাত্রীর চোখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
×

মুহিত হাসান

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৫৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

শতবর্ষী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সত্তর বছরেরও অধিককাল ধরে যুক্ত মনীষীর কলমে যদি উঠে আসে বাংলাদেশের জাতীয় জীবন ও উত্তাল সময়রেখার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জুড়ে থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির কীর্তিকথার বিবরণ ও বিশ্লেষণ– তবে তাকে বিরল প্রাপ্তি বললে বিন্দুমাত্র অত্যুক্তি হবে না। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় : ইতিহাসে, স্মৃতিতে’ বইটি ঠিক তেমনই এক রত্নভান্ডার। তাঁর সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সংযোগ ঘটে ১৯৫২ সালে, ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী হিসেবে। আর ১৯৫৭ সালে একই বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগদানের পর সেই সংযোগ স্থায়ী রূপ নেয়, ক্রমে ক্রমে যা হয়ে ওঠে অবিচ্ছেদ্য। জ্ঞানপিপাসু সাধারণ ছাত্র থেকে প্রাজ্ঞ ইমেরিটাস অধ্যাপক– ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে তাঁর এই দীর্ঘ যাত্রাপথে তিলে তিলে সঞ্চিত তাবৎ স্মৃতি ও ভাবনার সমাহার একত্রিত হয়েছে বক্ষ্যমাণ গ্রন্থে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর কাছে নিছক নিজের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা কর্মস্থলের পরিচয় ছাপিয়ে কেন ‘আলমা ম্যাটার’ হয়ে উঠল, সেই প্রশ্নের উত্তর আছে বইয়ের ভূমিকাতেই– ‘ইতিহাসের টানাপোড়েন ও ভাঙাগড়ার প্রক্রিয়াতে এই বিশ্ববিদ্যালয়কে যেভাবে অংশগ্রহণ করতে হয়েছে এবং একই সঙ্গে ভুক্তভোগীও হয়েছে, তেমনটি খুব কম বিশ্ববিদ্যালয়ের বেলাতেই ঘটেছে।’
বইয়ের প্রথম প্রবন্ধ ‘আলোতে অন্ধকার এবং অন্ধকারে আলো’ বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাপর্বের চালচিত্রের ব্যতিক্রমী পুনর্বিচার। নির্দ্বিধায় সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী দেখান, ইংরেজশাসিত অবিভক্ত ভারতবর্ষে প্রতিষ্ঠিত আর সব বিশ্ববিদ্যালয়ের মতোই ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরও প্রতিষ্ঠা ঘটেছে ব্রিটিশের হাতে, রাজনৈতিক কারণে।’ কিন্তু সেই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উঠে আসা ছাত্ররাই বৃহত্তর আন্দোলনের সূচনা করে স্বদেশকে মুক্তি দিয়েছে; তথাকথিত ‘আলোকিত মানুষ’ গড়ার ছদ্মবেশে ‘অনুগত নাগরিক’ গড়ার আয়োজনকে তছনছ করে আলোর নিচে লুকিয়ে থাকা অন্ধকারকেও দূর করেছে।
‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ : বিচারের দুই নিরিখে’ এ বইয়ের দীর্ঘতম রচনা; যেন কার্যত বইটির মূল ‘আত্মা’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একশ বছরের পথপরিক্রমাকে এ প্রবন্ধে যেমন ফিরে দেখা হয়েছে, তেমনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জোয়ারের কালে ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানটির সম্ভাব্য সংকটের কথাও বাদ পড়েনি। ঠিক কোনখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাপ্তি ও অনন্যতা, আর কোথায় তার সংকীর্ণতা আর ব্যর্থতা– তা বিশদে চিহ্নিত করতে লেখক ভোলেননি। তাঁর মতে, এই জনপদের ইতিহাসের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে নিবিড় সংযোগ, তাতে যতি পড়লে প্রতিষ্ঠান ও জনসাধারণ উভয়েরই ক্ষতি। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যদি ইতিহাস ও সাহিত্যের পঠনপাঠন সংকুচিত করে তোলে, তবে সে জৌলুস এবং মনন দুইই হারাবে– কেননা এ ‘দুটি বিষয়ে জ্ঞান না থাকলে জ্ঞানার্জন কখনোই পরিপূর্ণ হয় না।’
‘একাত্তর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রবন্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কীভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের নেপথ্যে অসাধারণ ভূমিকা রেখেছিল, তা নিয়ে এক গভীর দৃষ্টিদায়ী বিশ্লেষণ লভ্য। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী নিজে যুগপৎ বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসের নির্মোহ সাক্ষী ও অনলস ব্যাখ্যাকার। ফলে একাত্তরের পটভূমি রচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা তিনি যখন মূল্যায়ন করতে বসেন তখন তা সচেতন পাঠকের মনোযোগ কোনোভাবেই এড়িয়ে যেতে পারে না। দেশভাগ-পরবর্তী পূর্ববাংলার ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল ক্ষণে কীভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংযুক্ত হয়ে দিশা দেখিয়েছিল, তা শান্ত ভঙ্গিতে অকাট্য যুক্তি দিয়ে তিনি তুলে ধরেছেন।
 ‘মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীরা’ও এ বইয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মতোই সেখানকার কর্মচারীরাও মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন ও যুদ্ধের নৃশংসতার বলি হয়েছেন। একাত্তরের অবরুদ্ধ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের অসহায় দিনযাপন ও অদম্য মুক্তির আকাঙ্ক্ষার চালচিত্র পাঠককে আপ্লুত করবে। একাত্তরের শহীদ, কিংবদন্তি মধুর ক্যান্টিনের প্রতিষ্ঠাকালীন কর্ণধার মধুসূদন দে-কে নিয়ে রচিত ‘মধু দা– ওই একজনই’ একাত্তর-সংক্রান্ত বাকি দুটি প্রবন্ধের সঙ্গে মিলিয়ে পাঠ করলে পাঠক উপকৃত হবেন। 
শিরোনামেই স্পষ্ট, ‘স্মৃতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ মূলত সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক অম্ল-মধুর স্মৃতির সমাহার। তবে নিছক স্মৃতিকথার গণ্ডি ছাপিয়ে (তাঁর আর সব রচনার মতোই) এ লেখাও সমকালীন ইতিহাসের অজানা অধ্যায়ে আলো ফেলে অন্তরঙ্গ ভঙ্গিতে। যেমন– ‘আমরা টের পাচ্ছিলাম যে আমেরিকার চোখ পড়েছে পূর্ববাংলার ওপরে। ...শুরুতে পাঠ্যসূচিতে কোনো আমেরিকান লেখকের উপস্থিতি ছিল না; কিছুদিন পরে দেখা গেল আমেরিকান সাহিত্য বলে একটি বিকল্প পত্র এসে গেছে। বইপত্র সব আমেরিকান দূতাবাস থেকে আসছে। বৃত্তিও দেওয়া হচ্ছে আমেরিকায় যাবার। আরও পরে দেখেছি বরিস পাস্তারনেকের ড. জিভাগো উপন্যাসটির কপি বিনামূল্যে বিতরণ করা হচ্ছে শিক্ষকদের মধ্যে, কংগ্রেস ফর কালচারাল ফ্রিডমের বেনামিতে।’ ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের ক্লাব’ লেখাটিও স্মৃতির আখরে কার্যত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দলাদলি ও দৈনন্দিন জীবনাচারের তীক্ষ্ণ মূল্যায়ন। একইভাবে ‘জগন্নাথ হলের দুর্ঘটনা’ বিপর্যয়ের পরিপ্রেক্ষিতে তাৎক্ষণিক মন্তব্য-প্রতিবেদনের গণ্ডি ছাড়িয়ে হয়ে উঠেছে মানবিক হাহাকারের দলিল। 

আরও পড়ুন

×