বেগম রোকেয়ার প্রয়াণ আখ্যানের দুর্লভ সংকলন
রিক্তা রিচি
প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৫৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
বেগম রোকেয়ার প্রয়াণের মধ্য দিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে নারীজাগরণ ও প্রগতিশীল চিন্তার এক স্বর্ণযুগ থমকে যায়। তিনি কেবল নারীশিক্ষার প্রসার বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেই ক্ষান্ত হননি; বরং সমাজে প্রচলিত কুসংস্কার, বাল্যবিবাহ, পর্দার নামে গৃহবন্দিত্ব এবং পুরুষতান্ত্রিক বিদ্বেষের বিরুদ্ধে আমৃত্যু সংগ্রাম করেছেন। নারীকে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি সমাজে তাদের ন্যায্যতা, অধিকার ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিতে তিনি ছিলেন আপসহীন। তাই তাঁর আকস্মিক তিরোধানে তৎকালীন সমাজ সংস্কার ও নারী আন্দোলনের গতি সাময়িকভাবে শ্লথ হয়ে পড়েছিল।
রোকেয়ার প্রয়াণকালে উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের শেষ অধ্যায় চলছিল। এর পরপরই তৈরি হওয়া সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও দেশভাগের প্রাক্কালে তাঁর মতো অসাম্প্রদায়িক ও সাম্যবাদী চিন্তকের উপস্থিতি অত্যন্ত জরুরি ছিল। বিশেষ করে নারীদের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও সামাজিক মর্যাদার প্রশ্নে তাঁর শূন্যতা গভীরভাবে অনুভূত হয়। তাঁর মৃত্যু সে সময়ের সমাজসচেতন চিন্তকদের গভীরভাবে ব্যথিত করেছিল।
প্রয়াণের পর তৎকালীন বিভিন্ন সাময়িকী ও সংবাদপত্রে রোকেয়া স্মরণে বিশিষ্টজনের আবেগঘন স্মৃতিচারণ প্রকাশিত হয়। ‘মাসিক মোহাম্মদী’ ও ‘মোয়াজ্জিন’-এর মতো সাময়িকীগুলো তাঁর স্মরণে বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে। কবি শাহাদাৎ হোসেন ও সাংবাদিক মুজীবুর রহমান খাঁ বিএ তাদের লেখায় উল্লেখ করেন– রোকেয়া কেবল প্রথা ভাঙার বিদ্রোহই করেননি, বরং এক অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজকে নতুন করে গড়ে তোলার আলো জ্বালিয়েছিলেন। এ ছাড়া আবুল ফজল, আবদুল কাদির, বিভূতি চৌধুরী, খান মোহাম্মদ মঈনুদ্দীন ও বন্দে আলী মিয়াসহ বহু গুণী সাহিত্যিক স্মৃতিকথায় তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। ক্রোড়পত্রে প্রকাশিত সেসব স্মৃতিচারণমূলক কবিতা, গদ্য এবং প্রয়াণকালে প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্যের বিরল নথিপত্র একত্র করে গবেষক ডক্টর আবুল আহসান চৌধুরী সংকলন ও সম্পাদনা করেছেন ‘রোকেয়ার প্রয়াণলেখ: সাময়িকপত্রের সাক্ষ্য ও অন্যান্য’ গ্রন্থটি। তিরোধানের পর কবি গোলাম মোস্তফা রোকেয়াকে স্মরণ করে রচনা করেন ‘দুঃসাহসিকা’ কবিতা। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন সম্রাট শাহজাহান প্রিয়তমার ভালোবাসায় ‘তাজমহল’ গড়েছিলেন, আর বেগম রোকেয়া জাতির জন্য গড়ে গেছেন মহীয়সী ত্যাগের ‘নূরমহল’। প্রেমে, পুণ্যে ও কর্মগরিমায় তাঁকে শাহজাহানের চেয়েও মহান আখ্যা দেন তিনি। অন্যদিকে ১৩৩৯ সালে ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় বিশিষ্ট লেখিকা বেগম শামসুন নাহার মাহমুদ লেখেন, “তাঁর কীর্তির চেয়ে, তাঁর প্রতিষ্ঠিত বালিকা বিদ্যালয়ের চেয়ে তিনি ছিলেন ঢের ঢের বড়।”
সেসময় কেবল সাহিত্য পত্রিকাতেই নয়, রোকেয়ার প্রয়াণসংবাদ গুরুত্বের সঙ্গে ছাপা হয় ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’, ‘দ্য স্ট্যাটসম্যান’, ‘দ্য অমৃতবাজার পত্রিকা’, উর্দু সাময়িকী ‘দ্য মুসলমান’ এবং সাপ্তাহিক ‘নবশক্তি’তে। পাশাপাশি ‘প্রদীপ’, ‘বঙ্গলক্ষ্মী’, ‘গুলিস্তাঁ’ ও ‘প্রবাসী’র মতো প্রভাবশালী সাময়িকীতেও তাঁর চিরবিদায়ের খবর স্থান পায়।
উৎপত্তি ও আদর্শগত দিক থেকে পত্রিকাগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল বৈচিত্র্যময়। যেমন– ‘মাসিক মোহাম্মদী’ ও ‘মোয়াজ্জিন’ কাজ করত মুসলিম সমাজের ধর্মীয় ও নৈতিক পুনর্জাগরণ নিয়ে; ‘দ্য স্ট্যাটসম্যান’ পেশাদার সাংবাদিকতার মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেছিল শিক্ষিত এলিট সমাজে; ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’র কেন্দ্রে ছিল ব্রিটিশবিরোধী জাতীয়তাবাদ; আর ‘প্রবাসী’ হয়ে উঠেছিল রবীন্দ্র-পরবর্তী সাহিত্যিকদের প্রধান বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাকেন্দ্র। পত্রিকাগুলোর নীতি ও মতাদর্শ আলাদা হলেও বেগম রোকেয়ার প্রয়াণকে সবাই একই কণ্ঠে তৎকালীন ভারতীয় উপমহাদেশের এক অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছিল। সংকলনটির কাজ করতে গিয়ে গবেষক আবুল আহসান চৌধুরী যথার্থই মন্তব্য করেছেন– শিক্ষা, সাহিত্য বা সমাজসেবায় সম্পৃক্ত কোনো বাঙালি নারীর তিরোধান বাংলার জনজীবনে ইতঃপূর্বে এমন গভীর প্রভাব ফেলেনি। দীর্ঘ নিষ্ঠা ও নিজস্ব সংগ্রহের মাধ্যমে তিনি বিলুপ্তপ্রায় অনেক ঐতিহাসিক দলিল এই গ্রন্থে উদ্ধার করেছেন। বইটিতে এমন কিছু পত্রিকায় প্রকাশিত শোক সংবাদ এবং রোকেয়ার অপ্রকাশিত দুটি চিঠি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, যা আগে কোনো গবেষকের নজরে আসেনি। প্রায় এক শতাব্দী অতিক্রান্ত হলেও বেগম রোকেয়ার দর্শন ও সংগ্রাম আজও সমান প্রাসঙ্গিক।
কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াই করা, অধিকার আদায় করা এবং আত্মমর্যাদা নিয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচার যে বার্তা তিনি দিয়ে গেছেন, তা আজও আমাদের নতুন পথ দেখায়। বিশেষ করে নারী পাঠকের জন্য এই গ্রন্থ অনুপ্রেরণার এক অনন্য উৎস।
- বিষয় :
- বই