ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

তিস্তা মহাপরিকল্পনা ঘিরে বহুমাত্রিক ভাবনাসংকলন

তিস্তা মহাপরিকল্পনা ঘিরে বহুমাত্রিক ভাবনাসংকলন
×

এমদাদুল হক মিলটন

প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:০২

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের নদী নিয়ে গবেষণা ও নীতিগত আলোচনার ক্ষেত্র দীর্ঘদিন ধরেই সীমাবদ্ধ। এই বাস্তবতায় রিভারাইন পিপলের প্রকাশনা ‘নদীচিন্তা’-এর প্রথম সংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা সংখ্যা’ হিসেবে প্রকাশিত এই সাময়িকী কেবল একটি প্রকল্পকে কেন্দ্র করে মতামতের সংকলন নয়, বরং তিস্তা নদীকে পরিবেশ, অর্থনীতি, কৃষি, আইন, কূটনীতি, সমাজ ও বহুমাত্রিক বাস্তবতায় দেখার একটি প্রয়াস। প্রাণ ও প্রবাহবিষয়ক ১৪৪ পৃষ্ঠার সাময়িকীটির সম্পাদনা করেছেন নূরননবী শান্ত। 
আগে প্রকাশিত ‘নদী’ বর্ষপত্রের উত্তরসূরি হিসেবে ‘নদীচিন্তা’ এবার আরও বিস্তৃত পরিসরে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। সম্পাদকীয়তে তিস্তার বর্তমান সংকটের মূল হিসেবে নদীভাঙন, নাব্য হ্রাস, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং আন্তঃসীমান্ত পানি ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অববাহিকাভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি, পরিবেশসম্মত প্রযুক্তির ব্যবহার, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং প্রতিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথাও জোর দিয়ে বলা হয়েছে। ফলে শুরুতেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, এই সাময়িকী কোনো একপাক্ষিক অবস্থান গ্রহণ করেনি, আলোচনার নানা দিক উন্মুক্ত রাখার চেষ্টা করেছে।
সাময়িকীর প্রথমেই রয়েছে সম্পাদকের অনুবাদ। ‘তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পের প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা’ শিরোনামের নিবন্ধটি তিস্তার গুরুত্বপূর্ণ নথির বাংলা ভাষান্তর। সাধারণ পাঠকের জন্য প্রকল্পের কারিগরি ও অর্থনৈতিক কাঠামো বোঝার ক্ষেত্রে এই অনুবাদ কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
এরপর ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন গবেষক ও লেখকের নিবন্ধ তিস্তা মহাপরিকল্পনার নানা দিক বিশ্লেষণ করেছে। আলতাফ পারভেজ প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, অতিরিক্ত বাঁধ, নদী সংকোচন কিংবা কৃত্রিম নিয়ন্ত্রণ নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও প্রতিবেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে। মাহাবুবা রহমান হাইড্রো-ডিপ্লোমেটিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তিস্তা অববাহিকাভিত্তিক শাসনব্যবস্থা এবং একটি ‘তিস্তা রিভার বেসিন কমিশন’ গঠনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে তাসনুভা শেলী আন্তর্জাতিক আইন ও তিস্তার পানি চুক্তির প্রশ্ন বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনায় আইনি কাঠামোর গুরুত্ব কতটা গভীর। অর্থনীতি ও কৃষির প্রশ্নও এই সংখ্যায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। আলতাফ রাসেল তিস্তা মহাপরিকল্পনার অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিশ্লেষণ করেছেন। পাশাপাশি এফএম আনোয়ার হোসেন কৃষি, পানির চাহিদা এবং ভারত-বাংলাদেশের আন্তঃসীমান্ত পানি রাজনীতির সম্পর্ক তুলে ধরেছেন তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে। 
তুহিন ওয়াদুদ প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতা, সমীক্ষাগত অস্পষ্টতা এবং বিজ্ঞানভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। নজরুল ইসলাম হক্কানী গণশুনানির অভিজ্ঞতার আলোকে পানি বণ্টন, বন্যা, ভাঙন ও মানুষের জীবিকার সংকট তুলে ধরেছেন। শমশের আলী নাগরিক সমাজের ভূমিকা, তাপস রঞ্জন চক্রবর্তী তিস্তার মৎস্যসম্পদ এবং সুবীর সরকার তিস্তার জীবন-সংস্কৃতি ও মানুষের অভিজ্ঞতাকে লেখায় ধারণ করেছেন। এর মধ্যে লেখক ও নদী গবেষক এবং রিভারাইন পিপলের মহাসচিব শেখ রোকনের নিবন্ধ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি তিস্তা মহাপরিকল্পনার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের দুটি পৃথক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে প্রকল্পের ব্যয়, নকশাগত পরিবর্তন, পরিবেশগত ঝুঁকি এবং বাস্তবায়ন কাঠামোর সীমাবদ্ধতাগুলো তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে প্রকল্পটির রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও বিশ্লেষণের আওতায় এনেছেন। অন্যদিকে মাহমুদুল ইসলাম নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়নের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছেন।
গবেষণাধর্মী নিবন্ধের পাশাপাশি সংখ্যাটিকে সমৃদ্ধ করেছে প্রত্নবিজ্ঞানী অধ্যাপক স্বাধীন সেনের সাক্ষাৎকার। তিনি প্রকৃতির নিজস্ব পুনর্জীবন ক্ষমতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে নদী পুনরুদ্ধারে প্রকৃতিনির্ভর দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন। এ ছাড়া পত্রিকা পর্যালোচনা বিভাগে ‘নদী’ বর্ষপত্র নিয়ে সাংবাদিক মাহফুজুর রহমান মানিকের মূল্যায়ন সাময়িকীটির ধারাবাহিকতা বোঝার সুযোগ করে দেয়। সব মিলিয়ে ‘নদীচিন্তা’র প্রথম সংখ্যা একটি সময়োপযোগী ও তথ্যসমৃদ্ধ প্রকাশনা। একই বিষয়ের ওপর ভিন্নমত, গবেষণা, নীতিগত বিশ্লেষণ, মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা ও সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গকে এক মলাটে একত্র করার এই প্রয়াস প্রশংসনীয়। নদী, পানি, পরিবেশ এবং উন্নয়ন-পরিকল্পনাবিষয়ক গবেষণায় আগ্রহীরা ‘নদীচিন্তা’র এই আয়োজন থেকে উপকৃত হতে পারেন। 

আরও পড়ুন

×