ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বৈশ্বিক বাস্তবতার ব্যঙ্গচিত্র

বৈশ্বিক বাস্তবতার ব্যঙ্গচিত্র
×

রাসেল আজাদ বিদ্যুৎ

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৪৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

‘আমি এতক্ষণে নিশ্চিতভাবেই বুঝতে পেরেছি আমাকে ভুল করে কবর দেওয়া হয়েছে।’ উপন্যাসের এই প্রথম লাইন পড়েই চমকে যেতে হয়! এরপর ধীরে ধীরে যখন কাহিনির গভীরে প্রবেশ করার পর দেখা যায়, এর পরতে পরতে মিশে আছে আরও কিছু বিস্ময়কর ঘটনা। যদিও শুরুতে অনুমান করা কঠিন, কাহিনি বিন্যাসে কতগুলো উপকরণ যোগ করা হয়েছে। আমরা জানি, কবি হিসেবে আবিদ আনোয়ারের পরিচিতিকে বড় করে দেখা হলেও সাহিত্যের নানা শাখায় তাঁর বিচরণ। কবিতা, ছড়া, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, গান রচনার পাশাপাশি সাহিত্য সমালোচনায় তিনি সমান পারদর্শী– সে কথাও পাঠকের অজানা নয়। এরপরও বিস্মিত হতে হয়েছে তাঁর ‘দেবদূতের দেবতাগিরি’ উপন্যাস পাঠে। কেননা, কাহিনি বুননে কবিতা ও ছোটগল্পের আশ্রয় নিয়ে তিনি যেভাবে সেগুলো প্রাসঙ্গিক করে তুলেছেন– তা এক কথায় চমকপ্রদ। আরও অবাক করা বিষয় হলো, অশরীরীকে কেন্দ্রীয় চরিত্রে রেখে দেশীয় সমাজ ব্যবস্থা এবং বিশ্বের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে তুলে এনেছেন হাস্যরসের মাধ্যমে। একইভাবে ইতিহাসের দৃশ্যরচনার মধ্য দিয়ে বিশ্বশাসকদের কটাক্ষ করতে এতটুকু ছাড় দেননি। কাহিনির শুরুর দিকে আমরা দেখি, একক অশরীরী কবরস্থান ছেড়ে বেরিয়ে আসার পর মুখোমুখি হয় এক তরুণের। যে আত্মহত্যা করতে চাইছে তার প্রেমিকার বিয়ে হতে যাওয়া নিয়ে। অতঃপর সেই তরুণ ও তার প্রেমিকার ভালোবাসা খাঁটি কিনা, তা পরখ করার পর অশরীরী প্রতিশ্রুতি দেন, সেই প্রেমিক-প্রেমিকাকে নিজ উদ্যোগে বিয়ে দেবেন। তা করতে গিয়ে যে ভৌতিক কাণ্ডকারখানা ঘটিয়ে চলেন, তা রম্যরচনার স্বাদ এনে দেয়। এরপর অশরীরী নিজ বাড়িতে গিয়ে দেখতে পান, তার মৃত্যুকে ঘিরে পবিরার সদস্য ও আত্মীয়-স্বজনদের প্রতিক্রিয়া কী। সেখানে তিনি এক ধরনের পরীক্ষার মধ্যমে নিশ্চিত হন, অদৃশ্য হলেও তিনি অসীম ক্ষমতার অধিকারী হয়ে উঠেছেন। তাই মানবকল্যাণের স্বার্থে নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার মহাপরিকল্পনা করেন। সেই লক্ষ্যে ছুটে যান মার্কিন মুল্লুকে। সেখানে গিয়ে দেখেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফোনে পেন্টাগনে ফোন দিয়ে বলছেন, ‘হ্যালো পেন্টাগন। ইসরায়েলের প্রাইম মিনিস্টার জানিয়েছেন, তাদের জন্য আমাদের সামরিক সহায়তা বাড়াতে হবে। পশ্চিম তীরে ওরা কিছু এরিয়া দখল করতে চায়। ইসরায়েল-প্যালেস্টাইন ইস্যুতে আমাদের কিন্তু ট্যাক্টফুল হতে হবে। সাপও মরে, লাঠিও না ভাঙে।’ এ কথা শোনার পর অশরীরী গায়েবি আওয়াজ দিয়ে ভয় দেখানোর বদলে প্রেসিডেন্টকে ‘উর্ধ্বাসন’ দিয়ে নাস্তানাবুদ করতে থাকেন। তাদের কথোপকথন চলে বিশ্ব রাজনীতি নিয়ে, যেখানে স্পষ্ট হয়ে উঠে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষমতা কীভাবে তারা মুঠোবন্দি করে রেখেছেন। তা জেনে অশরীরী সিদ্ধান্ত নেন, তার পরবর্তী কর্মপরিকল্পনা কী হবে। 
উপন্যাসে ইতিহাসের অংশ যোগ করার বিষয়টিও এসেছে মজার এক গল্পের মধ্য দিয়ে। যার শিরোনাম ‘একটি গাঁজাখুরি গল্প’। এই গল্পে আমরা পাই, পৃথিবীর লাভা স্তর বিপর্যয়ের ফলে সৃষ্ট এক ভূমিকম্পে সবকিছু তছনছ হয়ে যাওয়ার দৃশ্য। মহাপ্লাবনে পেন্টাগনের একটি খোলা বোট আমেরিকার প্রেসিডেন্ট, তাঁর কৃষ্ণাঙ্গ দেহরক্ষী রিচার্ড প্ল্যাঙ্কটন, ফার্স্ট লেডি, ইন্ডিয়ান বিউটিশিয়ান শ্যামা প্যাটেল এবং কোরিয়ান ডাক্তার লি প্যাংকে তুলে নিতে পেরেছে। একই সঙ্গে এই বোটে আশ্রয় পেয়ে যান রেড ইন্ডিয়ান লেখক শ্যারন চেরোকি। মূলত এই শ্যারনের সূত্র ধরে আমেরিকার ইতিহাসের কালো অধ্যায়গুলো প্রকাশ পেতে থাকে। ক্ষুধার কাতর ফার্স্ট লেডিকে মহাপ্লাবনে ভেসে ওঠা মাছ ভেজে খাওয়ানোর জন্য পরিকল্পনা করেন শ্যারন। কিন্তু অভাব জ্বালানির। তাই তিনি একটি বইয়ের পৃষ্ঠা ছিঁড়ে, তাতে আগুন জ্বেলে মাছ ভাজার পরিকল্পনা করেন। সেই বইটি মূলত রেড ইন্ডিয়ানদের বঞ্চনা, নিপীড়িত ইতিহাসের। যেখানে লেখা কীভাবে ইউরোপীয়রা আমেরিকা দখল করে রেড ইন্ডিয়ানদের একরকম দাসে পরিণত করে। ইতিহাসের একটি অংশে আমরা পাই ইংরেজদের সেই ধূর্ততার কথা। ইংল্যান্ড ছেড়ে আমেরিকায় আসা ইংরেজরা ছিল মূলত নিজ দেশের ভূমিহীন, বাস্তুহারা। তারা জানত না কৃষিকাজ। অথচ আমেরিকার এই মাটিতে চাষবাস করলে যে সোনা ফলবে তা বুঝতে একটুকু অসুবিধা হয়নি। তাই হত্যাকাণ্ড থামিয়ে কৃষিকাজে দক্ষ রেড ইন্ডিয়ানদের কাজে লাগানোর ফন্দি আঁটে। জারি করে এক ফরমান। যেখানে তারা উল্লেখ করে, ন্যায়নীতির ভিত্তিতে সবার অধিকার প্রতিষ্ঠা করবে তারা। কৃষিকে অর্থনীতির মূল ভিত্তি হিসেবে গড়ে তোলার মাধ্যমে আমেরিকাকে আরও উন্নত করে তুলবে। সেই প্রতিশ্রুতিতে রেড ইন্ডিয়ানদের বশীভূত করে ইংরেজরা কৃষিকাজ শিখে নেয়। সেই ইংরেজদের বংশধররা যখন আমেরিকার শাসনভার নিজ হাতে নিয়ে আজ বিশ্ব শাসন করছে, তখন বৈশ্বিক চিত্র কী দাঁড়াতে পারে, তার এক কল্পচিত্র কাহিনিতে তুলে আনা হয়েছে। পুরো বইটি এক কথায় সুখপাঠ। তাই স্বীকার করতেই হয়, বিষয়-বৈচিত্র্যের মিশেলে লেখক আবিদ আনোয়ারের ‘দেবদূতের দেবতাগিরি’ হয়ে উঠেছে বৈশ্বিক বাস্তবতার এক ব্যঙ্গচিত্র। 

আরও পড়ুন

×