গল্প
কয়েকটি গল্পের চলাচল
×
শামীম হোসেন
প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ১২:০০
সাড়ে সতেরো দিন একটা ঘোরের মধ্যে কাটিয়ে দিয়েও কোনো গল্প ধরা দিল না। অনেক গল্প আমার মনের ভেতর, শরীরের শিরা-উপশিরায় চলাচল করলেও ওরা পৃথিবীতে আসতে নারাজ। অসহ্য অস্বস্তি ও যন্ত্রণাবোধ মগজ খুবলে খাচ্ছে। ওদের প্রতি এত কাকুতি-মিনতি করার পরও কোনো সাড়াশব্দ নেই। কেউ কেউ একটু-আধটু শব্দ করে আসার চেষ্টা করেও ফিরে যাচ্ছে। ভাষা ও চরিত্রগুলো গলা অবধি এসে আর বেরোতে পারছে না। ফের নিচে নেমে যাচ্ছে। তাদের ফেরার শব্দ আমি টের পাচ্ছি। কোনোভাবেই ওদের শাদাপাতায় একটা আবাসনের ব্যবস্থা করা যাচ্ছে না। এক নিষ্ফম্ফলা মাঠের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই সাড়ে সতেরো দিন পেরিয়ে গেল। গণটিকার ভিড় গলে গল্পেরা যে কোথায় ঘাপটি মেরেছে তা বলতে পারব না। লাইনে দাঁড়ানো একজনের পকেট থেকে পাঁচ টাকার একটি কয়েন পড়ে গিয়ে আরেকজনের পায়ের কাছে দাঁড়িয়েছে। সেটি তুলতে গিয়েই বাধল বিপত্তি। একজনের মৃদু ধাক্কায় নিজেকে সামলাতে না পেরে হুড়মুড় করে কয়েকজন মাটিতে পড়ল। এক কথা দু-কথার বালাই পেরিয়ে হাতাহাতি। অবস্থা বেগতিক দেখে কার্যক্রম স্থগিত রাখতে হলো আয়োজকদের। হয়তো এ ঘটনাকে কেন্দ্র করেই একটি গল্প এগিয়ে যেতে পারত। কিন্তু সে এগোতে চায় না। বরং আমাকে গুঁতো মেরে দেশের প্রথম টিকা গ্রহণকারীর নাম জানতে চায়। আমি তাকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স রুনু ভেরোনিকা কস্তার নাম জানাই। সে মাথাটা ঝাঁকিয়ে আবার শরীরের ভেতর চলাচল শুরু করে। আমি বারবার বাইরে আসার অনুরোধ জানালেও কিছুতেই এ গল্পের অংশ সে হতে চায় না। আমার সকল নৈবেদ্য বারনইয়ের জলে ভাসিয়ে দেওয়া ছাড়া কোনো গতি থাকে না।
ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে পদ্মাতীরে জাল হাতে দাঁড়িয়ে থাকে পরেশ জেলে। একমনে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকে অনেকক্ষণ। তারপর ধীরে ধীরে জলে নামে। হাঁটুপানিতে নেমে বোঝার চেষ্টা করে মাছের গতিবিধি। জালটা হাতের সঙ্গে পেঁচিয়ে ছুড়ে মারে জলের ওপর। জাল ডুবতে থাকে। পরেশের চোখ জল ছাপিয়ে সুদূরে চলে যায়। বউ-বাচ্চা ও বৃদ্ধ মাকে নিয়ে টানাটানির সংসার। টালমাটাল টানাটানির দিনযাপনে শক্ত হাতে পরিবারের বৈঠা ধরে থাকে পরেশ। ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে মাছ ধরার কৌশল শিখেছে। পদ্মায় খুব বেশি মাছ পাওয়া না যাওয়ায় আর ওমুখো হয়নি। ছোটখাটো একটা জুতার কারখানায় কাজ জুটেছিল তার। কোনোরকম টেনেটুনে সংসার চলত। অতিমারির ছোবলে সেখান থেকেও ছিটকে পড়ার পর এসে দাঁড়িয়েছে ফের জলের কাছে। তাই মাছ ধরার আগে নদীপাড়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে মনে মনে প্রার্থনা করে। জাল টানে পরেশ। জালের জট সরাতেই একটা কাঁকড়া ছাড়া আর কিছুই মেলে না। সামান্য কিছুদূর সরে গিয়ে ফের জাল ফেলে সে। বৃদ্ধ মায়ের মুখ ভেসে ওঠে পরেশের চোখের সামনে। আজ মাছ ধরলে মায়ের জন্য ওষুধ নিয়ে যাবে। ছোট্ট ছেলেটার কোনো বায়না পূরণে সামর্থ্য কুলায় না। তার জন্যও কিছু খাবার কিনে তবেই ঘরে ফিরবে। জাল টানে পরেশ। এবারও হতাশ হতে হয় তাকে। কোনো মাছ বা পোনাও ওঠেনি জালে।
নদীপাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে সামনে এগোয় পরেশ। কাঁধে জাল নিয়ে ভাবনার আরেক জাল ছিন্ন করার চেষ্টা করে। বাবার সঙ্গে মাছ বিক্রি করতে গিয়ে দেখা হয়েছিল শিউলির সঙ্গে। তারপর ভাববিনিময় করতে করতে জমে ওঠে কুসুম হৃদয়ের আদান-প্রদান। রোজ সন্ধ্যায় নৌকায় বসে বসে হাজারো গল্প করত তারা। সময় ফুরিয়ে গেলেও গল্প ফুরাত না। শিউলি নৌকায় বসে পা দুলিয়ে যখন হেসে উঠত, পরেশের তখন মাছ হতে ইচ্ছে করত। পোনা মাছ হয়ে শিউলির পায়ের তলায় টোকা দেবার কথা জানাত পরেশ। একদিন সেই শিউলিও ঘরে এলো। স্বপ্নের রঙিন দিন তখন পরেশের। তবে সেই রঙিন দিন বছর না ঘুরতেই ফিকে হয়ে গেল। বাবা পাড়ি জমালেন অনন্ত জলের গভীরে। উথালপাথাল ঢেউয়ের মধ্যে সংসারের নৌকা সামলাতে হলো পরেশকে। শ্রীরামপুরের বটগাছটা শুধু এসব ঘটনার সাক্ষী হয়ে রইল। পরেশের চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। চোখে-মুখে পানি দিয়ে জাল টানতে লাগল। কিন্তু এবার জাল টানতে বাড়তি শক্তি লাগছে পরেশের। বড় কোনো মাছ আটকে গেলে জাল ভারী হয়ে ওঠে। চোখ ছলছল করে উঠছে। মনে আনন্দের পায়রা বাকুম বাকুম করছে। ধীরে ধীরে পেশির সব বল দিয়ে জাল টানছে পরেশ। বড় মাছ উঠলে তার অনেক সমস্যা সমাধান পাবে। একটা চাপা উত্তেজনা শরীর কাঁপিয়ে দিচ্ছে তার। জাল কাছে আসছে। পরেশের আনন্দ আরও দ্বিগুণ হয়ে কপালের রেখায় ফুটে উঠছে। একটা হেঁচকা টানে জাল উপরে তুলল পরেশ। জট ছাড়িয়ে মাছ খুঁজতে লাগল। কিন্তু মাছের বদলে একটা মুখবাঁধা বস্তা পেল সে। মুহূর্তে মুখের আনন্দের ঝলক মিলিয়ে যেতে লাগল। বস্তার বাঁধন খুলে চক্ষুচড়ক। আট-দশ বছরের শিশুর দেহের সঙ্গে ইট বেঁধে বস্তায় পোরা। কী বীভৎস সেই রূপ! শরীর কাঁপছে পরেশের। এমন দৃশ্য কখনও কল্পনাতেও আসেনি তার। মাথায় কোনোকিছুই আসছে না। শিরায় রক্তপ্রবাহ যেন কমে আসছে তার। জালটাকে এক ঝটকায় ঘাড়ে উঠিয়ে দৌড়াতে থাকে পরেশ। দৌড়াতে দৌড়াতে মায়ের মুখ ভেসে ওঠে, শিউলি ও সন্তানের চেহারা পরেশের সঙ্গে দৌড়াতে থাকে। বটগাছটার তলে এসে পরেশ থামে। হাঁপাতে হাঁপাতে একবার পেছন ফিরে দেখে। বাড়িমুখো হয়ে ফের দৌড়াতে শুরু করে। অনন্ত দৌড়ের ঘোরের মধ্যে মিলিয়ে যেতে থাকে পরেশ।
আমার কিছুতেই মাথায় ঢুকছে না, কেন এক অনন্ত দৌড়ের ঘোরের মধ্যে এসে পরেশের গল্পটা হারিয়ে গেল! তার জীবনের খুঁটিনাটি ডানা মেলে গল্পটি হাঁটতে পারত। শিশুটির মরদেহ কি নদীপাড়েই পড়ে রইল? না, আমি আর ভাবতে পারছি না। সাড়ে সতেরো দিন চরম ভোগান্তির ভেতর আছি। কোনোকিছুর কূলকিনারা উন্মোচিত হচ্ছে না। দু'দিন থেকে মেয়েটার জ্বর। মাঝেমধ্যে জ্বর ছেড়ে গেলেও ফের আসছে। অতিমারির এই দম বন্ধ সময়ে সবকিছুই ওলটপালট লাগছে। একটা ভয়ের কুণ্ডলী যেন ঘিরে আছে চারপাশ। সামান্য বেতন, তাও অফিসের কথার দড়িতে ঝুলে আছে। এই ঝোলাঝুলির মধ্যেই সম্পাদকের মেইল এসে চুপ করে বসেছে। তাতে লেখা, 'প্রিয় অনিম তেওয়ারী, আপনার চাওয়ামতো অগ্রিম সম্মানী পাঠিয়েছি। আপনার গল্পটি পাঠিয়ে দিন। সময় মাত্র একদিন। আমরা অপেক্ষায় আছি।' পত্রটি পড়ে মন বিগড়ে গেল। আমি সম্পাদককে কীভাবে বোঝাই, আমিও অপেক্ষা করছি কোনো গল্পের। আমার এই সাড়ে সতেরো দিনের যন্ত্রণা তাকে কে বোঝাবে! আমার কাছে তো কোনো গল্পের গাছ নেই যে ঝাঁকিয়ে-নাড়িয়ে তৈরি হবে অসামান্য সব গল্প। একটা নতুন গল্পের প্লট মাথায় আসছে বোধহয়। হাফ দিস্তা কাগজের জন্য বাইরে বেরোতে হবে আমাকে, এক্ষুনি।
সনেকার চিৎকার চেঁচামেচিতে রেলবস্তির সবার ঘুম ভেঙে যায়। 'বাঁচাও, বাঁচাও' বলে একনাগাড়ে চিৎকার করেই চলেছে সনেকা। প্রতিবেশীরা এসে সনেকাকে নিয়ে ঘরের বাইরে আসে। তার স্বামী গলা টিপে তাকে হত্যা করতে চেয়েছে বলে জানায় সে। সনেকার স্বামী দু'পা হারিয়ে এখন বাড়িতেই পড়ে থাকে। আয়-রোজগার নেই বললেই চলে। সনেকার বাসাবাড়িতে কাজের সুবাদে যেটুকু আয় হয় তা দিয়ে টেনেটুনে সংসার চালায়। সনেকার স্বামী গফুর রিকশা চালাত। তখন যা আয় হতো তা দিয়ে কোনোমতে চলে যেত তাদের। বছর দুয়েক আগে রাতে রিকশা নিয়ে ফেরার সময় রেলগেটে রিকশার টায়ার আটকে গেলে ট্রেন দুর্ঘটনায় পা দুটো হারিয়ে ফেলে গফুর।
গভীর রাতে চেঁচামেচির শব্দে চোখ কচলাতে কচলাতে সনেকার মেয়ে বাইরে এসে ফ্যালফ্যাল করে সবার দিকে তাকিয়ে থাকে। বস্তির মোড়ল আলাউদ্দিন গফুরকে ধমক দিয়ে বলে, 'কী মিয়া, নিজের বউরে মাইরা আমাগো থাকার জায়গাটাও খোয়াইতে চাও।' গফুর কোনো উত্তর দেয় না। মাথা নিচু করে কেবল ফুঁপিয়ে কাঁদে। একটু নরম সুরে আলাউদ্দিন বলে, 'আরে, কান্দো ক্যান, সমস্যাটা কী খুইলা বলো।' তারপরও গফুরের কণ্ঠ থেকে কোনো শব্দ বের হয় না। বস্তির অনেকেই কানাঘুষা শুরু করার সময় গফুর বলে ওঠে, 'আমি পঙ্গু মানুষ, কোনোকিছু করবার মুরোদ নাই আমার।' আবারও ফুঁপিয়ে কাঁদে গফুর। সনেকার দিকে তাকিয়ে মোড়লকে বলে, 'ওরে জিগান, রাত ২টার পর রোজ কই যায় সনেকা।' সনেকার দিকে এগিয়ে আসে আলাউদ্দিন এবং হঠাৎ এক চড় বসিয়ে দেয় গালে। সনেকা কোনো প্রতিবাদ করে না। শুধু মাথাটা মাটির দিকে করে বলে, 'ভাইজান, লকডাউনের কারণে বাসাবাড়ির কাজটাও নাইকা। মেয়ে-স্বামীরে কি না খাওয়াইয়া মারুম, কন। শুধু কি কথায় আমাদের পেট চলে, ভাইজান?' জড়ো হওয়া লোকজনকে নিজের ঘরে চলে যেতে বলে আলাউদ্দিন। তারপর সনেকার ঘরে ঢুকে গফুরকে বলে, 'সব হুনলাম। তুই দুঃখ করিস না। আমি নেতারে বইলা তোর একটা দোকানের ব্যবস্থা করে দেবোনে। সব ঠিক হয়া যাবে। সনেকা আর তুই মিইলা দোকান চালাবি। না খাইয়া মরবি না।' 'ঘরে যা সনেকা' বলে আলাউদ্দিন বেরিয়ে গেল। ভয়ে ভয়ে সনেকা ঘরে এসে দাঁড়িয়ে রইল। মুখে কোনো কথা নেই।
'তোর যে কাজ নাই, তা তো আমারে বলিস নাই' বলে সনেকার হাত ধরে টান মারল গফুর। 'আমার পা থাকলি তোকে ও পথে যেতে হতো নারে' বলে সনেকাকে বুকের কাছে টেনে নিল গফুর। সনেকা-গফুরের মেয়ে চোখ ঢেকে পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ল।
হাফ দিস্তা কাগজ নষ্ট হয়ে গেলেও কোনো গল্প পা তুলে দাঁড়াল না। সবাই কেবল গলা অবধি এসে ঢেঁকুর তুলছে। এই বিদঘুটে সময় কিছুতেই হজম হচ্ছে না। আকাশের দিকে একমনে তাকিয়ে থেকেও কোনো কাজ হচ্ছে না। গাছপালা, চন্দ্র, ঘাস, পাখি, মুরগি কোনোকিছুর দিকে তাকিয়ে ধ্যান করলেও একটি শব্দও উঁকি দেবার সম্ভাবনা নেই। এমন করুণ পরিস্থিতিতে বিগত সময়ে কখনও পড়তে হয়নি আমাকে। দাবানল-বন্যায় বড় বড় দেশ নড়ে উঠলেও আমার মনে দাগ কাটছে না। অথচ যুদ্ধে শত শত শিশু মারা যাচ্ছে। কান্নার আওয়াজে ভারি হয়ে উঠছে আকাশ। বোমা ও গুলিবর্ষণে এক লহমায় হাজার হাজার প্রাণ লুটিয়ে পড়ছে। দেশেও তো ঘটনার কমতি নেই। একের পর এক ঘটনার পিঠে ঘটনা ঝুলে যাচ্ছে। সাড়ে সতেরো দিনের অপেক্ষা আমাকে দিয়ে একটা গল্প লিখিয়ে নিচ্ছে না। ভাবা যায়! গল্পের ভাষা ও চরিত্রগুলো আমার সঙ্গে চোর-পুলিশ খেলছে। বসে থেকে থেকে শরীরের হাড়গুলো জমাট বাঁধার প্রক্রিয়া করছে। ভাবছি, নতুন কোনো প্লট নিয়ে লিখতে বসব কাল।
আজ মাথায় যখন গল্পটি এলো বাইরে তখন তুমুল বৃষ্টি। রাস্তায় হাঁটুপানি ডিঙিয়ে চলাচল করছে লোকজন। বৃষ্টি থামার পর বাড়ি থেকে বের হলেন আবুল কাশেম। নেটসার্ভিসের এ দোকান ও দোকান ঘুরে কিছুতেই করোনা ভ্যাকসিনের নিবন্ধন করতে পারছেন না। একজনের পরামর্শে সরাসরি টিকাকেন্দ্রে হাজির হয়েছেন ভোটার আইডি কার্ড নিয়ে। টেবিল থেকে টেবিলে ঘুরে হাঁপিয়ে উঠেছেন। ভ্যাপসা গরমে সত্তর ছুঁইছুঁই আবুল কাশেমের ছাইরঙা পাঞ্জাবিটা ভিজে জবজবা। কপাল থেকেও দরদর করে ঘাম ঝরছে। এত ছোটাছুটি আর শরীরে কুলাচ্ছে না। ভিড় কাটিয়ে একপাশে বসে একটু জিরিয়ে নিচ্ছেন। একজন স্বেচ্ছাসেবক এগিয়ে এসে আবুল কাশেমকে জিজ্ঞেস করলেন সমস্যার কথা। জানালেন, টিকা নেবার জন্য কেন্দ্রে এসেছেন। নিজের নিবন্ধন হলেও স্ত্রী মরিয়ম বেগমের নিবন্ধন কিছুতেই করাতে পারেননি। স্বেচ্ছাসেবক নিজের ফোন বের করে নিবন্ধনের চেষ্টা করলেন। কিছুক্ষণ পরে তিনিও হতাশ হয়ে জানালেন, এই নামে কোনো তথ্য সার্ভারে দেখাচ্ছে না। আবুল কাশেমকে নির্বাচন কমিশন অফিসে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে ভিড় সামলাতে চলে গেলেন। আবুল কাশেম ধূসর চোখে শুধু এনআইডি কার্ডের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
সকাল নটা থেকে নির্বাচন কমিশনের গেটে বসে আছেন আবুল কাশেম। সঙ্গে নিয়ে এসেছেন স্ত্রী মরিয়মকেও। অফিস খোলার সঙ্গে সঙ্গে অফিসে প্রবেশ করে একজনকে সমস্যার কথা জানালে তিনি একটি কক্ষ দেখিয়ে সেখানে যেতে বললেন। স্ত্রীকে বাইরে বসিয়ে সেই কক্ষে গেলেন আবুল কাশেম। ভেতরে কেউ না থাকায় আরেক কক্ষে গেলেন তিনি। সেখানেও কাউকে না পাওয়া গেলে দোতলায় উঠলেন। যাক, এখানে একজনকে পাওয়া গেল তাহলে। সেই কর্মকর্তাকে আবুল কাশেম জানালেন তার স্ত্রীর টিকা নেবার জন্য নিবন্ধন করতে পারছেন না। কর্তাব্যক্তিটি তাকে আরেক কক্ষে পাঠিয়ে দিয়ে টেলিফোনে বলে দিলেন। ডাটা এন্ট্রি অপারেটরের কক্ষে এসে বিশদ জানালেন আবুল কাশেম এবং আইডি কার্ডটি তার হাতে দিলেন। কিছুক্ষণ পর অপারেটর জানতে চাইলেন, 'আপনার স্ত্রী কবে মারা গেছেন?' এ কথা শুনে আবুল কাশেম চেয়ারের হাতল ধরে বসে পড়লেন এবং অপারেটরের দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। নিজেকে সামলে অপারেটরকে বললেন, 'আমার স্ত্রী এখনও জীবিত।' অপারেটর জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনার স্ত্রীর নাম মরিয়ম বেগম, বয়স ৫৪ বছর?' আবুল কাশেম 'হ্যাঁ' বলে মাথা নাড়লেন। অপারেটর জানালেন, 'মরিয়ম বেগমের মারা যাওয়ার দু'বছর পেরিয়ে গেছে।' আবুল কাশেম চোখ ছলছল করে বাইরে এলেন। স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে ফের গিয়ে দাঁড়ালেন অপারেটরের সামনে।
স্ত্রীকে দেখিয়ে অপারেটরের কাছে জানতে চাইলেন আবুল কাশেম, 'কোন প্রমাণের ভিত্তিতে জীবিত ব্যক্তিকে মৃত বলা হলো?' উত্তেজিত কাশেমের কণ্ঠ শুনে আরও দুই কর্মী কক্ষে এগিয়ে এলেন এবং তাকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন। অপারেটর আমতা আমতা করে জানালেন, ভোটার তালিকা হালনাগাদ করার সময় হয়তো ভুল হয়ে থাকতে পারে কিংবা নাম বিভ্রাটও হতে পারে। একজন কর্মী আবুল কাশেমের হাতে একটা নমুনা ফরম ধরিয়ে পূরণ করে জমা দিতে বললেন। জমা দেবার সময় সঙ্গে আনতে বললেন ভোটার কার্ডের প্রতিলিপি, নাগরিকত্ব সনদ ও ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কাছ থেকে জীবিত থাকার সনদপত্র। আবুল কাশেম রেগে জানতে চাইলেন, 'ভুল তথ্যে যদি জীবিত মরিয়মকে মৃত বানাতে পারেন, তাহলে মৃত মরিয়মকে জীবিত করতে এত কাগজ লাগবে কেন?' অপারেটর কোনো উত্তর না দিয়ে মাথা নিচু করে বসে রইলেন।
স্ত্রী মরিয়মকে নিয়ে অফিস থেকে বেরিয়ে এলেন আবুল কাশেম। হাঁটতে হাঁটতে স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'তাহলে কি আমি এই দুই বছর মৃত কারও সঙ্গে সংসার করছি?'
ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে পদ্মাতীরে জাল হাতে দাঁড়িয়ে থাকে পরেশ জেলে। একমনে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকে অনেকক্ষণ। তারপর ধীরে ধীরে জলে নামে। হাঁটুপানিতে নেমে বোঝার চেষ্টা করে মাছের গতিবিধি। জালটা হাতের সঙ্গে পেঁচিয়ে ছুড়ে মারে জলের ওপর। জাল ডুবতে থাকে। পরেশের চোখ জল ছাপিয়ে সুদূরে চলে যায়। বউ-বাচ্চা ও বৃদ্ধ মাকে নিয়ে টানাটানির সংসার। টালমাটাল টানাটানির দিনযাপনে শক্ত হাতে পরিবারের বৈঠা ধরে থাকে পরেশ। ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে মাছ ধরার কৌশল শিখেছে। পদ্মায় খুব বেশি মাছ পাওয়া না যাওয়ায় আর ওমুখো হয়নি। ছোটখাটো একটা জুতার কারখানায় কাজ জুটেছিল তার। কোনোরকম টেনেটুনে সংসার চলত। অতিমারির ছোবলে সেখান থেকেও ছিটকে পড়ার পর এসে দাঁড়িয়েছে ফের জলের কাছে। তাই মাছ ধরার আগে নদীপাড়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে মনে মনে প্রার্থনা করে। জাল টানে পরেশ। জালের জট সরাতেই একটা কাঁকড়া ছাড়া আর কিছুই মেলে না। সামান্য কিছুদূর সরে গিয়ে ফের জাল ফেলে সে। বৃদ্ধ মায়ের মুখ ভেসে ওঠে পরেশের চোখের সামনে। আজ মাছ ধরলে মায়ের জন্য ওষুধ নিয়ে যাবে। ছোট্ট ছেলেটার কোনো বায়না পূরণে সামর্থ্য কুলায় না। তার জন্যও কিছু খাবার কিনে তবেই ঘরে ফিরবে। জাল টানে পরেশ। এবারও হতাশ হতে হয় তাকে। কোনো মাছ বা পোনাও ওঠেনি জালে।
নদীপাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে সামনে এগোয় পরেশ। কাঁধে জাল নিয়ে ভাবনার আরেক জাল ছিন্ন করার চেষ্টা করে। বাবার সঙ্গে মাছ বিক্রি করতে গিয়ে দেখা হয়েছিল শিউলির সঙ্গে। তারপর ভাববিনিময় করতে করতে জমে ওঠে কুসুম হৃদয়ের আদান-প্রদান। রোজ সন্ধ্যায় নৌকায় বসে বসে হাজারো গল্প করত তারা। সময় ফুরিয়ে গেলেও গল্প ফুরাত না। শিউলি নৌকায় বসে পা দুলিয়ে যখন হেসে উঠত, পরেশের তখন মাছ হতে ইচ্ছে করত। পোনা মাছ হয়ে শিউলির পায়ের তলায় টোকা দেবার কথা জানাত পরেশ। একদিন সেই শিউলিও ঘরে এলো। স্বপ্নের রঙিন দিন তখন পরেশের। তবে সেই রঙিন দিন বছর না ঘুরতেই ফিকে হয়ে গেল। বাবা পাড়ি জমালেন অনন্ত জলের গভীরে। উথালপাথাল ঢেউয়ের মধ্যে সংসারের নৌকা সামলাতে হলো পরেশকে। শ্রীরামপুরের বটগাছটা শুধু এসব ঘটনার সাক্ষী হয়ে রইল। পরেশের চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। চোখে-মুখে পানি দিয়ে জাল টানতে লাগল। কিন্তু এবার জাল টানতে বাড়তি শক্তি লাগছে পরেশের। বড় কোনো মাছ আটকে গেলে জাল ভারী হয়ে ওঠে। চোখ ছলছল করে উঠছে। মনে আনন্দের পায়রা বাকুম বাকুম করছে। ধীরে ধীরে পেশির সব বল দিয়ে জাল টানছে পরেশ। বড় মাছ উঠলে তার অনেক সমস্যা সমাধান পাবে। একটা চাপা উত্তেজনা শরীর কাঁপিয়ে দিচ্ছে তার। জাল কাছে আসছে। পরেশের আনন্দ আরও দ্বিগুণ হয়ে কপালের রেখায় ফুটে উঠছে। একটা হেঁচকা টানে জাল উপরে তুলল পরেশ। জট ছাড়িয়ে মাছ খুঁজতে লাগল। কিন্তু মাছের বদলে একটা মুখবাঁধা বস্তা পেল সে। মুহূর্তে মুখের আনন্দের ঝলক মিলিয়ে যেতে লাগল। বস্তার বাঁধন খুলে চক্ষুচড়ক। আট-দশ বছরের শিশুর দেহের সঙ্গে ইট বেঁধে বস্তায় পোরা। কী বীভৎস সেই রূপ! শরীর কাঁপছে পরেশের। এমন দৃশ্য কখনও কল্পনাতেও আসেনি তার। মাথায় কোনোকিছুই আসছে না। শিরায় রক্তপ্রবাহ যেন কমে আসছে তার। জালটাকে এক ঝটকায় ঘাড়ে উঠিয়ে দৌড়াতে থাকে পরেশ। দৌড়াতে দৌড়াতে মায়ের মুখ ভেসে ওঠে, শিউলি ও সন্তানের চেহারা পরেশের সঙ্গে দৌড়াতে থাকে। বটগাছটার তলে এসে পরেশ থামে। হাঁপাতে হাঁপাতে একবার পেছন ফিরে দেখে। বাড়িমুখো হয়ে ফের দৌড়াতে শুরু করে। অনন্ত দৌড়ের ঘোরের মধ্যে মিলিয়ে যেতে থাকে পরেশ।
আমার কিছুতেই মাথায় ঢুকছে না, কেন এক অনন্ত দৌড়ের ঘোরের মধ্যে এসে পরেশের গল্পটা হারিয়ে গেল! তার জীবনের খুঁটিনাটি ডানা মেলে গল্পটি হাঁটতে পারত। শিশুটির মরদেহ কি নদীপাড়েই পড়ে রইল? না, আমি আর ভাবতে পারছি না। সাড়ে সতেরো দিন চরম ভোগান্তির ভেতর আছি। কোনোকিছুর কূলকিনারা উন্মোচিত হচ্ছে না। দু'দিন থেকে মেয়েটার জ্বর। মাঝেমধ্যে জ্বর ছেড়ে গেলেও ফের আসছে। অতিমারির এই দম বন্ধ সময়ে সবকিছুই ওলটপালট লাগছে। একটা ভয়ের কুণ্ডলী যেন ঘিরে আছে চারপাশ। সামান্য বেতন, তাও অফিসের কথার দড়িতে ঝুলে আছে। এই ঝোলাঝুলির মধ্যেই সম্পাদকের মেইল এসে চুপ করে বসেছে। তাতে লেখা, 'প্রিয় অনিম তেওয়ারী, আপনার চাওয়ামতো অগ্রিম সম্মানী পাঠিয়েছি। আপনার গল্পটি পাঠিয়ে দিন। সময় মাত্র একদিন। আমরা অপেক্ষায় আছি।' পত্রটি পড়ে মন বিগড়ে গেল। আমি সম্পাদককে কীভাবে বোঝাই, আমিও অপেক্ষা করছি কোনো গল্পের। আমার এই সাড়ে সতেরো দিনের যন্ত্রণা তাকে কে বোঝাবে! আমার কাছে তো কোনো গল্পের গাছ নেই যে ঝাঁকিয়ে-নাড়িয়ে তৈরি হবে অসামান্য সব গল্প। একটা নতুন গল্পের প্লট মাথায় আসছে বোধহয়। হাফ দিস্তা কাগজের জন্য বাইরে বেরোতে হবে আমাকে, এক্ষুনি।
সনেকার চিৎকার চেঁচামেচিতে রেলবস্তির সবার ঘুম ভেঙে যায়। 'বাঁচাও, বাঁচাও' বলে একনাগাড়ে চিৎকার করেই চলেছে সনেকা। প্রতিবেশীরা এসে সনেকাকে নিয়ে ঘরের বাইরে আসে। তার স্বামী গলা টিপে তাকে হত্যা করতে চেয়েছে বলে জানায় সে। সনেকার স্বামী দু'পা হারিয়ে এখন বাড়িতেই পড়ে থাকে। আয়-রোজগার নেই বললেই চলে। সনেকার বাসাবাড়িতে কাজের সুবাদে যেটুকু আয় হয় তা দিয়ে টেনেটুনে সংসার চালায়। সনেকার স্বামী গফুর রিকশা চালাত। তখন যা আয় হতো তা দিয়ে কোনোমতে চলে যেত তাদের। বছর দুয়েক আগে রাতে রিকশা নিয়ে ফেরার সময় রেলগেটে রিকশার টায়ার আটকে গেলে ট্রেন দুর্ঘটনায় পা দুটো হারিয়ে ফেলে গফুর।
গভীর রাতে চেঁচামেচির শব্দে চোখ কচলাতে কচলাতে সনেকার মেয়ে বাইরে এসে ফ্যালফ্যাল করে সবার দিকে তাকিয়ে থাকে। বস্তির মোড়ল আলাউদ্দিন গফুরকে ধমক দিয়ে বলে, 'কী মিয়া, নিজের বউরে মাইরা আমাগো থাকার জায়গাটাও খোয়াইতে চাও।' গফুর কোনো উত্তর দেয় না। মাথা নিচু করে কেবল ফুঁপিয়ে কাঁদে। একটু নরম সুরে আলাউদ্দিন বলে, 'আরে, কান্দো ক্যান, সমস্যাটা কী খুইলা বলো।' তারপরও গফুরের কণ্ঠ থেকে কোনো শব্দ বের হয় না। বস্তির অনেকেই কানাঘুষা শুরু করার সময় গফুর বলে ওঠে, 'আমি পঙ্গু মানুষ, কোনোকিছু করবার মুরোদ নাই আমার।' আবারও ফুঁপিয়ে কাঁদে গফুর। সনেকার দিকে তাকিয়ে মোড়লকে বলে, 'ওরে জিগান, রাত ২টার পর রোজ কই যায় সনেকা।' সনেকার দিকে এগিয়ে আসে আলাউদ্দিন এবং হঠাৎ এক চড় বসিয়ে দেয় গালে। সনেকা কোনো প্রতিবাদ করে না। শুধু মাথাটা মাটির দিকে করে বলে, 'ভাইজান, লকডাউনের কারণে বাসাবাড়ির কাজটাও নাইকা। মেয়ে-স্বামীরে কি না খাওয়াইয়া মারুম, কন। শুধু কি কথায় আমাদের পেট চলে, ভাইজান?' জড়ো হওয়া লোকজনকে নিজের ঘরে চলে যেতে বলে আলাউদ্দিন। তারপর সনেকার ঘরে ঢুকে গফুরকে বলে, 'সব হুনলাম। তুই দুঃখ করিস না। আমি নেতারে বইলা তোর একটা দোকানের ব্যবস্থা করে দেবোনে। সব ঠিক হয়া যাবে। সনেকা আর তুই মিইলা দোকান চালাবি। না খাইয়া মরবি না।' 'ঘরে যা সনেকা' বলে আলাউদ্দিন বেরিয়ে গেল। ভয়ে ভয়ে সনেকা ঘরে এসে দাঁড়িয়ে রইল। মুখে কোনো কথা নেই।
'তোর যে কাজ নাই, তা তো আমারে বলিস নাই' বলে সনেকার হাত ধরে টান মারল গফুর। 'আমার পা থাকলি তোকে ও পথে যেতে হতো নারে' বলে সনেকাকে বুকের কাছে টেনে নিল গফুর। সনেকা-গফুরের মেয়ে চোখ ঢেকে পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ল।
হাফ দিস্তা কাগজ নষ্ট হয়ে গেলেও কোনো গল্প পা তুলে দাঁড়াল না। সবাই কেবল গলা অবধি এসে ঢেঁকুর তুলছে। এই বিদঘুটে সময় কিছুতেই হজম হচ্ছে না। আকাশের দিকে একমনে তাকিয়ে থেকেও কোনো কাজ হচ্ছে না। গাছপালা, চন্দ্র, ঘাস, পাখি, মুরগি কোনোকিছুর দিকে তাকিয়ে ধ্যান করলেও একটি শব্দও উঁকি দেবার সম্ভাবনা নেই। এমন করুণ পরিস্থিতিতে বিগত সময়ে কখনও পড়তে হয়নি আমাকে। দাবানল-বন্যায় বড় বড় দেশ নড়ে উঠলেও আমার মনে দাগ কাটছে না। অথচ যুদ্ধে শত শত শিশু মারা যাচ্ছে। কান্নার আওয়াজে ভারি হয়ে উঠছে আকাশ। বোমা ও গুলিবর্ষণে এক লহমায় হাজার হাজার প্রাণ লুটিয়ে পড়ছে। দেশেও তো ঘটনার কমতি নেই। একের পর এক ঘটনার পিঠে ঘটনা ঝুলে যাচ্ছে। সাড়ে সতেরো দিনের অপেক্ষা আমাকে দিয়ে একটা গল্প লিখিয়ে নিচ্ছে না। ভাবা যায়! গল্পের ভাষা ও চরিত্রগুলো আমার সঙ্গে চোর-পুলিশ খেলছে। বসে থেকে থেকে শরীরের হাড়গুলো জমাট বাঁধার প্রক্রিয়া করছে। ভাবছি, নতুন কোনো প্লট নিয়ে লিখতে বসব কাল।
আজ মাথায় যখন গল্পটি এলো বাইরে তখন তুমুল বৃষ্টি। রাস্তায় হাঁটুপানি ডিঙিয়ে চলাচল করছে লোকজন। বৃষ্টি থামার পর বাড়ি থেকে বের হলেন আবুল কাশেম। নেটসার্ভিসের এ দোকান ও দোকান ঘুরে কিছুতেই করোনা ভ্যাকসিনের নিবন্ধন করতে পারছেন না। একজনের পরামর্শে সরাসরি টিকাকেন্দ্রে হাজির হয়েছেন ভোটার আইডি কার্ড নিয়ে। টেবিল থেকে টেবিলে ঘুরে হাঁপিয়ে উঠেছেন। ভ্যাপসা গরমে সত্তর ছুঁইছুঁই আবুল কাশেমের ছাইরঙা পাঞ্জাবিটা ভিজে জবজবা। কপাল থেকেও দরদর করে ঘাম ঝরছে। এত ছোটাছুটি আর শরীরে কুলাচ্ছে না। ভিড় কাটিয়ে একপাশে বসে একটু জিরিয়ে নিচ্ছেন। একজন স্বেচ্ছাসেবক এগিয়ে এসে আবুল কাশেমকে জিজ্ঞেস করলেন সমস্যার কথা। জানালেন, টিকা নেবার জন্য কেন্দ্রে এসেছেন। নিজের নিবন্ধন হলেও স্ত্রী মরিয়ম বেগমের নিবন্ধন কিছুতেই করাতে পারেননি। স্বেচ্ছাসেবক নিজের ফোন বের করে নিবন্ধনের চেষ্টা করলেন। কিছুক্ষণ পরে তিনিও হতাশ হয়ে জানালেন, এই নামে কোনো তথ্য সার্ভারে দেখাচ্ছে না। আবুল কাশেমকে নির্বাচন কমিশন অফিসে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে ভিড় সামলাতে চলে গেলেন। আবুল কাশেম ধূসর চোখে শুধু এনআইডি কার্ডের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
সকাল নটা থেকে নির্বাচন কমিশনের গেটে বসে আছেন আবুল কাশেম। সঙ্গে নিয়ে এসেছেন স্ত্রী মরিয়মকেও। অফিস খোলার সঙ্গে সঙ্গে অফিসে প্রবেশ করে একজনকে সমস্যার কথা জানালে তিনি একটি কক্ষ দেখিয়ে সেখানে যেতে বললেন। স্ত্রীকে বাইরে বসিয়ে সেই কক্ষে গেলেন আবুল কাশেম। ভেতরে কেউ না থাকায় আরেক কক্ষে গেলেন তিনি। সেখানেও কাউকে না পাওয়া গেলে দোতলায় উঠলেন। যাক, এখানে একজনকে পাওয়া গেল তাহলে। সেই কর্মকর্তাকে আবুল কাশেম জানালেন তার স্ত্রীর টিকা নেবার জন্য নিবন্ধন করতে পারছেন না। কর্তাব্যক্তিটি তাকে আরেক কক্ষে পাঠিয়ে দিয়ে টেলিফোনে বলে দিলেন। ডাটা এন্ট্রি অপারেটরের কক্ষে এসে বিশদ জানালেন আবুল কাশেম এবং আইডি কার্ডটি তার হাতে দিলেন। কিছুক্ষণ পর অপারেটর জানতে চাইলেন, 'আপনার স্ত্রী কবে মারা গেছেন?' এ কথা শুনে আবুল কাশেম চেয়ারের হাতল ধরে বসে পড়লেন এবং অপারেটরের দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। নিজেকে সামলে অপারেটরকে বললেন, 'আমার স্ত্রী এখনও জীবিত।' অপারেটর জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনার স্ত্রীর নাম মরিয়ম বেগম, বয়স ৫৪ বছর?' আবুল কাশেম 'হ্যাঁ' বলে মাথা নাড়লেন। অপারেটর জানালেন, 'মরিয়ম বেগমের মারা যাওয়ার দু'বছর পেরিয়ে গেছে।' আবুল কাশেম চোখ ছলছল করে বাইরে এলেন। স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে ফের গিয়ে দাঁড়ালেন অপারেটরের সামনে।
স্ত্রীকে দেখিয়ে অপারেটরের কাছে জানতে চাইলেন আবুল কাশেম, 'কোন প্রমাণের ভিত্তিতে জীবিত ব্যক্তিকে মৃত বলা হলো?' উত্তেজিত কাশেমের কণ্ঠ শুনে আরও দুই কর্মী কক্ষে এগিয়ে এলেন এবং তাকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন। অপারেটর আমতা আমতা করে জানালেন, ভোটার তালিকা হালনাগাদ করার সময় হয়তো ভুল হয়ে থাকতে পারে কিংবা নাম বিভ্রাটও হতে পারে। একজন কর্মী আবুল কাশেমের হাতে একটা নমুনা ফরম ধরিয়ে পূরণ করে জমা দিতে বললেন। জমা দেবার সময় সঙ্গে আনতে বললেন ভোটার কার্ডের প্রতিলিপি, নাগরিকত্ব সনদ ও ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কাছ থেকে জীবিত থাকার সনদপত্র। আবুল কাশেম রেগে জানতে চাইলেন, 'ভুল তথ্যে যদি জীবিত মরিয়মকে মৃত বানাতে পারেন, তাহলে মৃত মরিয়মকে জীবিত করতে এত কাগজ লাগবে কেন?' অপারেটর কোনো উত্তর না দিয়ে মাথা নিচু করে বসে রইলেন।
স্ত্রী মরিয়মকে নিয়ে অফিস থেকে বেরিয়ে এলেন আবুল কাশেম। হাঁটতে হাঁটতে স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'তাহলে কি আমি এই দুই বছর মৃত কারও সঙ্গে সংসার করছি?'
- বিষয় :
- গল্প
- শামীম হোসেন
