মেঘনার কান্না
ফাইল ফটো
মোহাম্মদ মহসীন
প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৪৭ | আপডেট: ২৫ জুলাই ২০২৬ | ০৯:০০
| প্রিন্ট সংস্করণ
স্মৃতির দুয়ার খুললে আজও মুলি বাঁশের সেই পরিচিত গন্ধ নাকে আসে। শৈশবে দেখেছি মেঘনার বুকে মুলি বাঁশের বিশাল সব চালান। সেই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত মাল্লাদের হাতের ইলিশ রান্নার চমৎকার ঘ্রাণ আজও যেন বাতাসে ভাসে। আমরা সবাই মিলে একসঙ্গে বসে সেই অকৃত্রিম স্বাদ নিতাম। খাওয়া শেষে তৃপ্তির ঢেকুর তুলে মেঘনার টলটলে জলই অঞ্জলি ভরে পান করতাম। তখন বোতলজাত পানির ব্যবসা ছিল না, আর জল ফুটিয়ে খাওয়ার প্রয়োজনীয়তাও কেউ অনুভব করেনি।
১৯৪৯ সালের সরকারি মানচিত্রের সেই প্রমত্তা মেঘনা আজ ২০২৬-এর স্যাটেলাইট ইমেজে এক শীর্ণকায় রেখায় পরিণত হয়েছে। প্রভাবশালী মহলের লোলুপ থাবায় নদীর বুক চিরে গড়ে উঠেছে বিশালাকার শিল্পকারখানা। নথিপত্রে যা জলপথ, বাস্তবে তা আজ সীমানাপ্রাচীরে ঘেরা ব্যক্তিগত ভূখণ্ড। অথচ দেশের প্রচলিত আইনে নদীর সীমানা দখল বা প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করা দণ্ডনীয় অপরাধ। সরকারি আইনি নীতিতে নদীর জমি জবরদখলের জন্য কঠোর সাজা ও জরিমানার বিধান থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ যেন এক নিভৃত বিলাপ।
নদী মরে গেলে কেবল পানি হারায় না, একটি জনপদ তার পরিচয় হারায়। মেঘনাতীরের জেলে, কিষান আর সাধারণ মানুষ আজ অস্তিত্বের সংকটে দিশেহারা। তিতাস আজ আমাদের কাছে কেবল এক করুণ উপাখ্যান, আমরা কি মেঘনাকেও সেই ইতিহাসের ধূসর পাতায় ঠেলে দেব? ব্যক্তিত্ব বিসর্জন দিয়ে চুপ থাকা হয়তো নিরাপদ, কিন্তু এই নীরবতা অপরাধের নামান্তর। মেঘনা কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, এটি আগামীর সম্পদ। মানুষের কল্যাণ আর পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় মেঘনার সেই আদি রূপ ফিরিয়ে আনা এবং এই বিষাক্ত দূষণ ও অবৈধ দখলের অভিশাপ থেকে নদীকে রক্ষা করা আজ সময়ের দাবি। শৈশবের সেই টলটলে জলের মেঘনাকে যদি আমরা রক্ষা করতে না পারি, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের কোনোদিন ক্ষমা করবে না। নদী বাঁচলে জীবন বাঁচে– এই সত্যটুকু যেন আমাদের সমষ্টিগত বোধোদয় ঘটায়।
মোহাম্মদ মহসীন: সোনারগাঁ,
নারায়ণগঞ্জ
- বিষয় :
- মেঘনা