প্রিয় ছবির পেছনের গল্প
ঢাকার বোটানিক্যাল গার্ডেনে কচ্ছপের সঙ্গে ফড়িংয়ের গপ্পো
প্রতাপ শেখর মোহন্ত
প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৫ | ০০:৫৭ | আপডেট: ১৭ নভেম্বর ২০২৫ | ১৫:০০
কোনো আলোকচিত্রীর ছবি যখন পরিচিতি পায়, সবাই ছবির নান্দনিকতায় কিংবা অর্থবহতায় মুগ্ধ হন। খুব কম দর্শকই ভাবেন, এর পেছনে কতটা পরিশ্রম, সময়, অর্থ ও ভাবনা ব্যয় হয়েছে সেই আলোকচিত্রীর। কোনো কোনো ছবির জন্য সারাদিন অপেক্ষায় থাকতে হয়। ছবির পেছনের এ গল্পগুলো নতুন আলোকচিত্রীদের জন্যও প্রেরণাদায়ক।
এক.
ঢাকার বোটানিক্যাল গার্ডেনে একদিনের ঘটনা। গার্ডেনে ঢুকে একটু সামনে এগোলেই ডান পাশে যে লেক, অক্টোবর-নভেম্বর মাসে সেখানে ছোট জাতের ভারতীয় কচ্ছপ লেকে পড়ে থাকা ডালে উঠে বসে থাকে রোদের উষ্ণতা পাওয়ার জন্য। রোদ্দুরপিয়াসী সেসব কচ্ছপকে ফ্রেমে বাঁধব বলেই সেদিন গিয়েছিলাম গার্ডেনে। আমরা ক্যামেরা রেডি করে বসার ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই কচ্ছপের মুখের ওপর ফড়িং বসার এ মহার্ঘ্য মুহূর্ত পেয়ে যান আমার সঙ্গী দু’জন ফটোগ্রাফার। পাঁচ সেকেন্ড বড়জোর। সেই মোক্ষম মুহূর্তে বউয়ের ফোনকল রিসিভ করতে গিয়ে মিস করে ফেলি মুহূর্তটি! ঘণ্টাখানেক পর আমার সঙ্গের দুজন বিদায় নিলেন। তাদের কাজ শেষ! আমি গোঁ ধরে বসলাম। আজ সারাদিন বসে থাকব লেকের পাড়ে–আর একবারও কি সাধ হবে না ফড়িংবাবুর কচ্ছপের সঙ্গে ফিসফিস করার। ঘণ্টা তিনেক অপেক্ষার পর পুনরাবৃত্তি ঘটে ঘটনার। কষ্ট করলে কেষ্ট মিলেই যায়। ছবিটি থেকে ভারতে ও সিঙ্গাপুরের দুটি আন্তর্জাতিক ছবি প্রতিযোগিতায় অ্যাওয়ার্ড পাই। এ ছাড়া ছবিটি ইউএসএ’র টাইম ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়।

দুই.
২০২৪ সালের ৫ অক্টোবর কয়েক ঘণ্টার বিরতিহীন বৃষ্টিতে ঢাকার অনেক নিচু জায়গা পানিতে ডুবে যায়। অনেকদিনের ইচ্ছা ছিল এমন একটি দিনে ক্যামেরা হাতে বের হওয়ার। শনিবার অফিসও নেই। ফলে বাসার কাছে হওয়ায় আরামবাগ-ফকিরাপুল এই দিকটি নির্বাচন করি ছবি তোলার জন্য। কারণ আগেই জানতাম নটর ডেম কলেজের সামনে কোমর ছাড়িয়ে পানি জমে এমন বৃষ্টিতে। কলেজের দেয়ালে আঁকা গ্রাফিতিসহ ফ্রেম ঠিক করে ক্যামেরা চোখে লাগিয়ে কোমরসমান পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকলাম অর্থবহ সাবজেক্টের জন্য। অনেকে এলো-গেল, মন লাগে না। ঘণ্টা তিনেক পর যখন চলে যাব ভাবছি, দেখি দূর থেকে অশীতিপর এক ব্যক্তি ফুটপাত দিয়ে দেয়ালঘেঁষে আস্তে আস্তে এগোচ্ছেন কলেজের গেটের দিকে। সবুরের ফল মিঠে হয় প্রমাণ করতেই যেন তিনি এই গ্রাফিতির কাছে এসে তাঁর শীর্ণ হাতটি গ্রাফিতির শক্তপোক্ত হাতগুলোর পরিপূরক হিসেবে দেয়ালে রাখলেন। আমিও পেয়ে গেলাম চাওয়ার চেয়ে বেশি কিছু। এ ছবিটিই এ বছর জাপানের সবচেয়ে সম্মানজনক ছবি প্রতিযোগিতায় আশাহি শিম্বুনে অ্যাওয়ার্ড পায়।

তিন.
ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফি করেন কিন্তু বাংলাদেশের জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে ছবি তোলার উদ্দেশ্যে যাননি, এমনটা হতেই পারে না। আমিও সেদিন সকালে নির্দিষ্ট কিছু না ভেবেই ক্যামেরা কাঁধে গিয়েছিলাম বোটানিক্যাল গার্ডেনে। প্রায় ঘণ্টা তিনেক উদ্যানের ভেতরে ঘুরেফিরে কিছুই না পেয়ে বের হওয়ার রাস্তা ধরেছিলাম। ফেরার পথেই পড়বে ভেবে সঙ্গী দুই ফটোগ্রাফারকে বললাম, চলেন পেঁচার আস্তানায় ঢুঁ মেরে যাই। কাছে গিয়ে দেখি খুড়ুলে পেঁচাটা ডাগর চোখ তুলে আড়াল থেকে উঁকি দিচ্ছে। পেঁচার সঙ্গে চোখাচোখি না হলে তো আবেদন নেই এ ছবির। এই ভেবে শিস দিলাম, যদি দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায় তার। যেমন ভাবা, তেমন কাজ! কৌতূহলী চোখে তাকানো মাত্রই শাটারে আঙুল চালিয়ে দিলাম। মূলত আলো ও রঙের কন্ট্রাস্ট, সেই সঙ্গে পেঁচার সম্মোহনী চাহনিই ছবিটিকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা, যা বিচারকদের চোখও এড়ায়নি। ফলে ছবিটির মাধ্যমে আমার কপালে জুটেছে ফটোগ্রাফিতে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি– সনি ওয়ার্ল্ড ফটোগ্রাফি অ্যাওয়ার্ড-২০২৩।

চার.
কক্সবাজার গিয়েছিলাম ফ্যামিলি নিয়ে ঘুরতে, সঙ্গে মা-বাবা-বউ-ছেলেমেয়ে। সেদিন খুব সকালে আমাদের হোটেলের ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াতেই দূরে সৈকতে চোখ আটকে যায় জালসহ জেলেদের ওপর। ক্যামেরা হাতে নিয়েই ভোঁ দৌড়! দৌড়াচ্ছি আর এক্সপোজার (আলো) অনুমান করে ক্যামেরা সেটিংস ঠিক করছি। পৌঁছে কম্পোজিশন ঠিক করেই ক্লিক। ছবি তোলার পর দেখলাম, অনুমাননির্ভর এক্সপোজার একদম ঠিকঠাক। সেই সঙ্গে কম্পোজিশন দেখে মনে হলো, আসলেই দারুণ কিছু হয়েছে। এর প্রমাণ পরে পেয়েছি ভারতের দুটি ভিন্ন প্রতিযোগিতায় গোল্ড, সিলভার মেডেল এবং সার্বিয়ার একটি প্রতিযোগিতায় সিলভার মেডেলসহ আরও বেশ কয়েকটি পুরস্কারের মাধ্যমে।

পাঁচ.
সাতছড়ির ওয়াচ টাওয়ারের পাশের মান্দার গাছ ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে ও মার্চ মাসের শুরুতে পাখি ফটোগ্রাফারদের জন্য স্বর্গ। এ সময় এই গাছে শতপাখির আনাগোনা মান্দার ফুলের মধু খেতে। ২০২৪ সালের কথা। সারারাত জার্নি করে ভোরে গিয়ে নামি হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জে। ফ্রেশ হয়ে রেস্তোরাঁয় হালকা নাশতা সেরে সকালের আলো ফোটার আগেই অটোরিকশা সহযোগে হাজির হই আমরা সাতছড়ি ন্যাশনাল পার্কের দোরগোড়ায়। টাওয়ারে ওঠার সিঁড়ির শতধাপ পেরিয়ে যাই আমরা অবলীলায়। কাঠশালিক একেবারে নিয়মিত অতিথি এই গাছে। খুব কাছ থেকে মনোযোগ দিয়ে এখানে পাখির গতিবিধি লক্ষ্য করলে বোঝা যায়, কী অদ্ভুতভাবে আবেগ-অনুভূতির প্রকাশ ঘটায় এরা মানুষের মতোই। ছেলে কাঠশালিক মেয়ে পাখিকে ঠোঁটে করে মধু সংগ্রহ করে খাওয়ায়। খুনসুটি করে। সেবার কাঠশালিকের পেছনে অনেক শাটার খরচ করার পর এই যুগলের আবেগঘন মুহূর্তটি পেয়েছিলাম। ছবিটি প্যাসিফিক-আটলান্টিক ফটো সার্কিটে গ্রিস থেকে গোল্ড মেডেল, ভারতের অলকা আন্তর্জাতিক ফটো স্যালনে ফ্লাইং বার্ড স্পেশাল মেডেল, রোমানিয়ায় ২০তম বুকোভিনা আন্তর্জাতিক ছবি প্রতিযোগিতায় ব্রোঞ্জ মেডেল ও বেলজিয়ামের একটি প্রতিযোগিতায় ফিয়াপ রিবন পায়।
লেখক: পেশায় ব্যাংকার, নেশায় ফটোগ্রাফার
