ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

শ্রমজীবী মানুষের কর্মসংগীত

শ্রমজীবী মানুষের কর্মসংগীত
×

অলংকরণ :: তন্ময় শেখ

  বাহাউদ্দিন গোলাপ

প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৬:৩৮

মানুষ যখন কাজ করে তখন তাঁর হাতে কেবল হাতুড়ি বা শাবলই থাকে না–থাকে এক ছায়ালিপি, থাকে হৃদয়ের ভেতর থেকে উঠে আসা ছন্দ, কণ্ঠের ঘষামাজা ধ্বনি, আর এক অদ্ভুত আত্মানুভূতির প্রকাশ। এই ধ্বনি, এই কথার সুর আর উচ্চারিত টানে গড়ে ওঠে এক বিচিত্র সংগীত ভুবন; যা শ্রমজীবী মানুষের কর্মসংগীত বা কাজের সংগীত। 
বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষি ও নির্মাণশ্রমে কর্মরত মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই প্রচলিত ছায়াগান বা কাজের গান এক ধরনের কথ্য সংগীত, যা মৌখিক ঐতিহ্যের অন্তর্গত। যেমন– গভীর নলকূপের শ্রমিকরা যখন লোহার পাইপ বসানোর সময় ‘ও-ইহ, এক্কা জোরে, হে-হো!’– এ রকম ছন্দময় ধ্বনি উচ্চারণ করে থাকেন।  একইভাবে ঠেলাগাড়ির চালকরা রাস্তায় চলতে চলতে বলেন, ‘চলো রে, ওরে ঠেল ঠেল ঠেল!’, কিংবা ‘এই যাই রে ভাই!’–এসব ধ্বনি এক ধরনের অভ্যন্তরীণ ঘড়ির মতো কাজ করে; শরীর-মন একসঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যায়।
বাংলাদেশের নদীমাতৃক অঞ্চলে মাঝিদের ‘টানা গান’ এক বিশেষ সংগীতধারা হিসেবে পরিচিত। যখন স্রোতের বিরুদ্ধে নৌকা টেনে নিয়ে যাওয়া হয় বা জাল ফেলা হয়, তখন মাঝিরা গলা মিলিয়ে গেয়ে ওঠেন–‘তোরা টান রে মাঝি, বাঁচাও মাঝির প্রাণ,/জাল ফেলেছি গভীর জলে, তুলবো সোনা ভোরবেলা।’
অন্যদিকে, নদীর ঘাটে দেখা যায় এক ভিন্ন দৃশ্য। মালবাহী বড় ট্রলার কিংবা লঞ্চ যখন ভেড়ানো হয়, তখন শক্ত রশি কাঁধে ফেলে টেনে আনে দলবদ্ধ শ্রমিকেরা। তাদের গলায় ওঠে তীব্র উচ্চারণ–‘হেই-হো! টান দে, ওরে ভাই!’, কিংবা ‘এক্কা-দুই, টান মার!’। কখনও বা তারা গান ধরেন– 
‘টানরে ভাই টান, পাড়ে তুলবো প্রাণ,
নদীর বুকে ভাসে মাল, ঘামে ভিজে জান।’
এইসব ধ্বনি নদীর বাতাসে মিশে যায়, আর জলের ওপর ভেসে ওঠা শব্দ যেন শ্রমিকের হৃদয়েরই প্রতিধ্বনি। একসঙ্গে রশিতে টান দেওয়ার তাল মেলাতে এই শব্দ ও গান অপরিহার্য, নইলে শতভাগ শক্তি দিয়েও মালবাহী যানকে ঘাটে তোলা যায় না। নদীর ঘাটে দাঁড়িয়ে এই টানার শব্দ শুনলে বোঝা যায়, শ্রমিকদের প্রতিটি হাঁকই আসলে সংগীত, প্রতিটি ধ্বনি একেকটি ছন্দ, যা কাজকে গতিশীল রাখে। এই গান শুধু কাজকে উৎসাহিত করে না, বরং ক্লান্তি ভুলিয়ে দিয়ে গড়ে তোলে এক আত্মিক সংহতি।
বহুতল ভবন নির্মাণের কর্মযজ্ঞে নিয়োজিত শ্রমিকরা যখন কোনো ভারী রড বা কংক্রিটের স্ল্যাব ওপরে তোলেন, তখন তাদের কণ্ঠ থেকে যে সম্মিলিত ধ্বনি বের হয়–‘হেই-হো! হেই-হো! ওপরে তোল রে ভাই!’ ছাদের ওপরে ঢালাইয়ের কাজ করার সময়ও শোনা যায় এমন গান–‘ঢালায়ে ঢালায়ে বেলা যে গেল,/এ দালান যত উঁচা হয়, ততই জীবন ভালো।’
এই গানগুলো একদিকে যেমন শ্রমের কষ্টের কথা বলে, অন্যদিকে তেমনি নতুন কিছু সৃষ্টির আনন্দ আর গর্ব প্রকাশ করে। ইট সাজানোর কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের মুখেও শোনা যায় ছন্দময় ধ্বনি; যা তাদের কাজের গতিকে এক সুতোয় বেঁধে রাখে–‘এক দুই তিন, এইবার ছাড়!’ এ ছোট ধ্বনিগুলো মুহূর্তেই কাজের গতিকে দ্বিগুণ করে দেয় এবং শত শত শ্রমিকের মধ্যে একতা স্থাপন করে।
​শ্রমজীবী নারীরাও এই কর্মসংগীতে পিছিয়ে নেই। বাঁশ কাঁধে নিয়ে ধান কাটতে কাটতে কিংবা মাঠে নুয়ে কাজ করতে করতে তারা গেয়ে ওঠেন–‘ধান কাটি, গাই গান,/এই জীবনের শেষ মান।/ঘাম মুছি আঁচলে,/আকাশ দেখে থাকি চলো।’ এই পদ্যভিত্তিক উচ্চারণ যেন নারীশ্রমের নীরব আত্মগাথা, একান্ত বেদনাঘন অথচ সাহসিকতানির্ভর কাব্যসুর।
শ্রমসংগীতের এই ধারা কোনো অঞ্চলভিত্তিক লোকাচার নয়। এটি একটি অমূল্য সাংস্কৃতিক রূপ। গবেষক ও নৃবিজ্ঞানীরা বলেন, এসব ছন্দময় কাজের ধ্বনি শুধুই ক্লান্তি লাঘব করে না, এই ধ্বনি সহকর্মীদের মধ্যেও গড়ে তোলে আত্মিক সম্পর্ক এবং কাজের প্রতি মনস্তাত্ত্বিক উৎসাহ। লোকসংগীত গবেষক আনিসুজ্জামান শামিম একবার বলেছিলেন, ‘বাংলার শ্রমজীবীরা প্রতিদিন যা বলেন, তাতে আছে জীবনবোধের পদ্য, যা কোনোদিন হয়তো একাধিক জাতির আত্মগান হয়ে উঠবে।’
শিল্প মানে কেবল চিত্র বা বাদ্যযন্ত্র নয়। মানুষের শ্রমে যে ধ্বনি ওঠে–তাও এক বিশুদ্ধ শিল্প। এই সংগীত কোনো নির্দিষ্ট সুর-তাল মানে না, কোনো মঞ্চে গাওয়া হয় না। তবু এ এক অমলিন লোকজ শিল্প, প্রাণবন্ত, সংবেদী, শ্রমে উদ্বেলিত। এই সংগীত আমাদের শেখায়–শ্রম শুধু জীবনেরই উপায় নয়; বরং এক গভীর জীবনদর্শন। তা সংরক্ষণ করা, মানুষের সামনে তুলে ধরা জরুরি। কারণ এই শ্রমজীবী মানুষের জীবন-সংগ্রামও আমাদের ইতিহাসের অংশ। 
লেখক: ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
 

আরও পড়ুন

×