প্রজাপতি: প্রকৃতির নীরব রক্ষাকবচ
বাংলাদেশের পাহাড়ি বনগুলোর সুস্থতা নির্ভর করে প্রজাপতির স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতির ওপর
আশিকুর রহমান সমী
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৫ | ০৭:০৪ | আপডেট: ১৪ অক্টোবর ২০২৫ | ২১:৩৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
২০১৬ সাল, কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান, রাঙামাটি। সময়টা ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি। কুয়াশার চাদর ভেদ করে উঁকি দিচ্ছে সোনা রোদ। ঝিরির স্বচ্ছ পানি আর সঙ্গে পাখি ও নানা বন্যপ্রাণীর পানি পান, জলকেলি, গোসলসহ চোখজুড়ানো দৃশ্য। হঠাৎ করে সামনে এসে বসল পাকড়া ধনেশ। কিছুটা এগোতেই সবুজ তাউড়া; আরেকটি আকর্ষণ লাল-মাথা কুচকচি। এই বনের মূল আকর্ষণ হলো প্রজাপতি। নানা রং, বর্ণের ছটায় সুশোভিত প্রজাপতিদের অনন্য এক ভূস্বর্গ কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানের ছড়াগুলো। বিভিন্ন গবেষণার তথ্য ও প্রাপ্ত উপাত্ত অনুযায়ী প্রায় দেড়শ প্রজাতির দেখা মেলে এ জাতীয় উদ্যানে। আজ ১০ বছর পর ২০২৫ সালে এসে কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানে প্রজাপতিদের ভূস্বর্গের সৌন্দর্য অনেকটা ম্লান। তার অন্যতম কারণ প্রাকৃতিক আবাসস্থলের পরিবর্তন এবং ছড়াগুলোর গুণগত মানের পরিবর্তন। প্রজাপতিদের এই অবস্থার পরিবর্তন কিন্তু পুরো জঙ্গলের পরিবেশ, বাস্তুতন্ত্র, খাদ্যশৃঙ্খলে প্রভাব ফেলেছে। তার মানে একটি বনের সব বন্যপ্রাণীর সঙ্গে প্রজাপতি সম্পর্কিত। অর্থাৎ পিঁপড়া থেকে হাতি পর্যন্ত সবার সুস্থতা প্রজাপতির উপস্থিতির ওপর নির্ভর করে।
প্রজাপতি এক ধরনের পতঙ্গ, যা লেপিডোপ্টেরা বর্গের অন্তর্ভুক্ত। এদের পাখা, দেহ ও পা বিভিন্ন ধরনের রঙিন আঁশ দিয়ে আবৃত। পৃথিবীতে ১৮ হাজার প্রজাতিরও বেশি প্রজাপতি আছে। এর মধ্যে ভারতীয় উপমহাদেশে আছে দেড় হাজার প্রজাতি। প্রাণীবিদ ও প্রজাপতি বিজ্ঞানী অধ্যাপক মনোয়ার হোসেন তুহিনের প্রকাশিত গবেষণাপত্র অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৪২০টির বেশি প্রজাতি রয়েছে। আইইউসিএন বাংলাদেশের তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রজাপতির প্রজাতি সংখ্যা ৩০৫।
প্রকৃতিতে এদের গুরুত্ব অপরিসীম। পরাগায়ন থেকে শুরু করে খাদ্যশৃঙ্খল–সবখানেই প্রজাপতির ভূমিকা অনস্বীকার্য। পরিবেশের বিভিন্ন নিয়ামকের (উপাদানের) তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, মাটির গুণাগুণ, আলোক তীব্রতা ও উদ্ভিদের উপস্থিতির সামান্য পরিবর্তনের প্রতিও এরা সংবেদনশীল। বাংলাদেশের পাহাড়ি বনগুলোর সুস্থতা নির্ভর করে প্রজাপতির স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতির ওপর।
পাহাড়ি ঝরনাধারা ও ছড়াগুলো জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ একটি সূক্ষ্ম প্রতিবেশ ব্যবস্থা। এখানে প্রজাপতি শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়; বরং গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত কার্যক্রম সম্পাদন করে। ঝরনা ও ছড়ার আশপাশে গড়ে ওঠা ভেষজ, ঝোপঝাড় ও বুনোফুলের গাছে প্রজাপতিরা মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে পরাগ স্থানান্তর ঘটায়। এতে উদ্ভিদের জিনগত বৈচিত্র্য বৃদ্ধি পায় এবং স্থানীয় উদ্ভিদ প্রজনন ও বিস্তৃতিতে সক্ষম হয়। বিশেষ করে পাহাড়ি অঞ্চলে যেসব উদ্ভিদ কেবল নির্দিষ্ট পরাগায়নকারীর ওপর নির্ভরশীল, তাদের বংশগতি টিকিয়ে রাখতে প্রজাপতির ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি। পাহাড়ি বনের এই ছড়াগুলোতে গাছগাছড়াকে কেন্দ্র করে বেঁচে থাকে অসংখ্য বিরল ও বিপন্নপ্রায় প্রাণী, যাদের অন্য কোথাও বা অন্য কোনো ধরনের আবাসস্থলে দেখা মেলে না। প্রজাপতি কমে যাওয়া ওই এলাকায় গাছগাছড়া, লতাগুল্মের ওপর প্রভাব পড়ে, ফলে হারিয়ে যায় এই গাছগাছড়া আর বিলুপ্ত হয় সংশ্লিষ্ট প্রাণীরা। এমনকি এই গাছগাছড়ার মধ্যে থাকে হাতিসহ বিভিন্ন বৃহৎ স্তন্যপায়ীর গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য, যা তাদের রক্ষা করে বিভিন্ন রোগ ও প্রতিকূল পরিবেশ থেকে।
প্রজাপতির শূককীট বা লার্ভা অনেক পাখি, উভচর (ব্যাঙ), সরীসৃপ (টিকটিকি, গিরগিটি), ছোট স্তন্যপায়ী এবং এমনকি কিছু জলজ পতঙ্গের খাদ্য। অন্যদিকে পূর্ণবয়স্ক প্রজাপতি মাকড়সা, মাছরাঙা বা ছোট শিকারি পাখির আহার হয়। ফলে তারা শক্তিপ্রবাহ বজায় রেখে স্থলজ ও জলজ খাদ্যজালকে সংযুক্ত করে।
পরিবেশে সামান্য পরিবর্তন যেমন–বন উজাড়, পানিদূষণ, জলবায়ুর তারতম্যও প্রজাপতির টিকে থাকায় সরাসরি প্রভাব ফেলে। তাদের উপস্থিতি ও বৈচিত্র্য দিয়ে বিজ্ঞানীরা ঝরনাধারার পরিবেশগত স্বাস্থ্য পরিমাপ করতে পারেন।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে প্রজাপতির অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণের জন্য আরও গবেষণা প্রয়োজন। তবে প্রজাপতি ও অন্যান্য পরাগায়নকারীর সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং পরিবেশগত স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য।
লেখক: বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ/ সহকারী একান্ত সচিব– পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন উপদেষ্টা