ম্যানগ্রোভ মানুষের হয়ে লড়ে
জিলফুল মুরাদ
প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:৩৭ | আপডেট: ০৩ নভেম্বর ২০২৫ | ১২:৫৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
জোয়ারের সময় উপকূলের বাতাসে এক অদ্ভুত গন্ধ মিশে থাকে–লবণ, কাদা আর জীবনের। বাঁধের গায়ে ধাক্কা খেয়ে ঢেউ যখন ফিরে যায়, তখন দূরে দেখা যায় সবুজের এক সারি; যেন নীরব প্রহরীরা হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তারা ম্যানগ্রোভ–সুন্দরবনের সন্তান; ঢেউয়ের আক্রোশ শুষে নেয়, মাটি আঁকড়ে ধরে, আর মানুষের ঘুমকে করে আরেকটু নিরাপদ। এই রক্ষাকবচ আজ নিজেই হুমকির মুখে। জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব, লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ, নদীভাঙন–সবকিছু মিলিয়ে ক্ষয়ে যাচ্ছে এই সবুজ ঢাল। ম্যানগ্রোভের শিকড় জালের মতো মাটিকে ধরে রাখে, যা ঢেউয়ের শক্তিকে কমিয়ে দেয়, কাদার ওপর নতুন পলি বসায়, নোনাজলের তীব্রতা কমায়। বিজ্ঞান এর নাম দিয়েছে ‘ব্লু-কার্বন ইকোসিস্টেম’; স্থানীয়রা যাকে ‘ভরসা’ মনে করে।
বাংলাদেশে এই ভরসাকে নতুনভাবে সাজিয়েছে সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা ‘ফ্রেন্ডশিপ’। নদী, বাঁধ আর উপকূলের কাদার মধ্যে হাতে-কলমে গড়ে উঠেছে একটি প্রকৃতিভিত্তিক শৈল্পিক স্থাপত্য, যেখানে স্থানীয় মানুষই ম্যানগ্রোভের প্রধান স্থপতি। গ্রামের নারীরা নার্সারিতে চারা বড় করেন; যুবকেরা মৌসুমে রোপণে নামেন; বয়োজ্যেষ্ঠরা নজরদারি করেন বেআইনি কাটাকাটি বা গবাদি পশুর অনুপ্রবেশে। কয়েক বছরের ধৈর্য, কয়েকটি জোয়ার-ভাটার পরীক্ষার পর যখন কচি গাছগুলো দাঁড়িয়ে যায়, তখন দেখা মিলে বাঁধের বাইরে এক সবুজ ‘সেফগার্ড’।
এই কাজটি নিছক প্রতীকী নয়, পরিমাপে ধরা যায়। সুন্দরবনের কাছে সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলা এবং খুলনার কয়রা ও পাইকগাছায় ২০০ হেক্টরেরও বেশি এলাকায় ৬ লাখ ৫০ হাজারের বেশি ম্যানগ্রোভ গাছ দাঁড়িয়ে আছে। এতে প্রায় ৬২ কিলোমিটারের বেশি উপকূলরেখা পেয়েছে প্রাকৃতিক সুরক্ষা। ঘূর্ণিঝড়ের মৌসুমে অন্তত এক লাখ পঁচিশ হাজার মানুষ টের পান, ঢেউয়ের প্রথম ধাক্কা তাদের ওপর লাগছে না; বরং ম্যানগ্রোভ নিজের গায়ে সেই আঘাত নিয়ে আগলে রাখছে ঘরবাড়ি, টিউবওয়েলের পানিও খানিকটা সহনীয় থাকে।
স্থানীয় এক নারী বলেন, ‘পাঁচ বছর আগে আম্ফানে পানি এতটা উঠে এসেছিল যে উঠানের আমড়া গাছে পর্যন্ত নোনাজলের দাগ পড়েছিল। এখনও ঝড় আসে, পানিও ওঠে কিন্তু এই গাছগুলোর জন্য তীব্রতা কম থাকে। মনে হয় যেন ওরা আমাদের হয়ে লড়ে।’ এই নারীর স্বামী মৌচাষ করেন। তাদের ছোট ছেলেটাও এখন ম্যানগ্রোভের চারা লাগাতে পারে।
ফ্রেন্ডশিপের মডেলে ম্যানগ্রোভ শুধু দুর্যোগের ঢাল নয়, জীবিকার সিঁড়িও। গাছ বড় হলে শিকড়ের ফাঁকে মাছ-কাঁকড়া আসে; মৌমাছি ফুলে বসে, হাতে আসে মধু। ধাপে ধাপে বাড়ে আয়ের পথ। কমে স্বাস্থ্যঝুঁকি। অতিরিক্ত নোনাজলের কারণে যে চর্মরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, গর্ভকালীন জটিলতা বাড়ে, সেই চাপ খানিকটা হলেও কমে আসে। সব মিলিয়ে প্রকৃতি, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য যেন এক সুতোয় বাঁধা।
এই সুতোই পৌঁছে গেছে বৈশ্বিক মঞ্চে। ২০২৫ সালে বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশ সম্মাননা ‘দ্য আর্থশট প্রাইজ’ ক্যাটেগরিতে ফ্রেন্ডশিপ ফাইনালিস্ট হওয়া কেবল সম্মান নয়; এটি একটি আলোকিত উদ্যোগ। বার্তা স্পষ্ট–সমস্যা বড়; কিন্তু সমাধানও আমাদের হাতেই। ডেলটা প্ল্যান, এনএপি, এনডিসি–এসব শব্দ যাদের কাছে কাগজের ভাষা, তাদের জন্য মাঠের মানুষই সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য অনুবাদক।
ফ্রেন্ডশিপ-এর প্রতিষ্ঠাতা রুনা খান বলেন, ‘আর্থশট প্রাইজ ফাইনালিস্ট হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া আমাদের জন্য এক বিশাল সম্মান। বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দৃঢ়তা ও উদ্ভাবনকে এটি তুলে ধরে। প্রথম ভাসমান হাসপাতাল থেকে শুরু করে ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধার ও বন্যা সহনশীল গ্রাম নির্মাণ–আমরা প্রমাণ করেছি যে কমিউনিটি-নেতৃত্বাধীন, প্রকৃতিভিত্তিক সমাধান জীবন বদলে দিতে পারে।
এখানে লড়াইটা কেবল উপকূলের নয়, দেশেরও। ২০১৪ থেকে ২০২৩–এই সময়টায় জলবায়ুর ধাক্কায় ঘরছাড়া হয়েছেন ১ কোটি ৪৭ লাখেরও বেশি মানুষ। নদীমাতৃক ভূপ্রকৃতি, কৃষির মৌসুমি পালাবদল, গ্রাম-নগরের টানাপোড়েন–সবই নড়বড়ে হয়ে ওঠে যখন পানির চরিত্র বদলায়। তাই ম্যানগ্রোভ বাঁচানো মানে শুধু একটি বন বাঁচানো নয়; এর মানে খাদ্যনিরাপত্তা, সুপেয় পানি, স্বাস্থ্য, শিক্ষার পথ বাঁচানো। একটু দূরে তাকালে, এটি দেশের ব্লু কার্বন সম্পদের ভিতও; যা আগামী দিনে আন্তর্জাতিক কার্বন অর্থনীতিতে বাংলাদেশের শক্ত জায়গা তৈরি করতে পারে।’
তবু সবুজ দেয়াল গড়তে গেলে স্বচ্ছতায় ‘ভরসা’ লাগে। কোন জমিতে কোথায় রোপণ হবে, কে পাহারা দেবে, আয়-লাভের ভাগ কেমন হবে, সবই যেন স্থানীয় জনগোষ্ঠীর চোখের সামনে থাকে। ফ্রেন্ডশিপের মাঠকর্মীরা যখন এই প্রশ্নগুলোকে কাজের শুরুতেই টেবিলে তোলে, তখন দেখা যায়, বনবিবির লোককথা আর আধুনিক মানচিত্র–দুটো একই গল্প বলে। স্যাটেলাইট তথ্যের সঙ্গে মিলে যায় গ্রামের মানুষের স্মৃতি; হিসাবের দাগে দাগে উঠে আসে নতুন চারার বেঁচে ওঠা।
রক্ষাকবচকে রক্ষা করার এই যাত্রা আসলে আমাদের নিজেদের দিকে ফিরে দেখার যাত্রা। আমরা একদিকে জলবায়ু সংকটে কম দায়ী, অন্যদিকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। এই সত্যকে স্বীকার করেই সামনে এগোতে হবে; এজন্য প্রয়োজন বুদ্ধিদীপ্ত কাজ, সংগঠিত সহানুভূতি, আর দীর্ঘশ্বাসের ফাঁকে ফাঁকে লাগানো চারা। ফ্রেন্ডশিপ দেখিয়েছে, এই তিনটিই একসঙ্গে সম্ভব। হাতে হাত রেখে, তথ্য-উপাত্ত আর জীবনের গল্পে উঠিয়ে আনা যায় এক টুকরো সবুজ।
সন্ধ্যায় যখন আলো নামতে শুরু করে, নদীর বুকের ওপর নৌকার সারি, আর দূরে বাঁধের ওপারে পাতায়-পাতায় হাওয়া–তখন বোঝা যায়, এখানে টিকে থাকার সংগ্রাম শেষ হয়নি। কিন্তু প্রহরীরা দাঁড়িয়ে আছে। শিকড়গুলো মাটিতে লেগে আছে। মানুষও আছে। যতক্ষণ মানুষ আছে, ততক্ষণ আশার আলো জ্বলছে–ম্যানগ্রোভের পাতায়, নদীর ধারে, শিশুদের হাসিতে, আর সম্মিলিত সাহস ও স্বপ্নে।
- বিষয় :
- উপকূল
- বনায়ন
- ম্যানগ্রোভ
