ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

শতাব্দীপ্রাচীন অগ্নি-বীণার সুলুক সন্ধান

শতাব্দীপ্রাচীন অগ্নি-বীণার সুলুক সন্ধান
×

কাজী নজরুল ইসলাম, অগ্নি-বীণা রচনাকালে [১৯২২]

শিশির কুমার নাথ

প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:৩৯ | আপডেট: ০৩ নভেম্বর ২০২৫ | ১৩:০০

| প্রিন্ট সংস্করণ

১৩২৯ বঙ্গাব্দের কার্তিকে [১৯২২ সালে] প্রকাশিত হয় কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অগ্নি-বীণা’। তার কিছুদিন পরই নজরুল রাজদ্রোহে বন্দি হন। গ্রন্থটির শতাব্দী অতিক্রম করা সংস্করণটি এই কার্তিকে এসে হাতে পড়ে সংগ্রাহক ইউসুফ আলী সরকারের। দুর্লভ এ গ্রন্থটির সুলুক সন্ধান করে লিখেছেন শিশির কুমার নাথ
---------------------------------------------------------------------------

‘গ্রন্থখানির সব কবিতাগুলিই অগ্নিগর্ভ, উদ্দীপনাময়। যে যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়াইয়া ভারতবর্ষ আজ আপনার ভাগ্য গড়িয়া তুলিতে চাহিতেছে সেই যুগ-নির্মাতা রুদ্র দেবতার আগমনধ্বনি গ্রন্থখানিতে শুনিতে পাওয়া যায়।’ তৎকালীন অভিজাত মাসিক পত্রিকা ‘প্রবাসী’তে এভাবেই বর্ণিত হয়েছিল অগ্নি-বীণার কথা। সত্যিকার অর্থেই বাংলা সাহিত্যে আবির্ভাব ঘটেছিল এক মহাকাল ধূমকেতুর। নজরুল তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ময়দান থেকে ফেরা এক বিদ্রোহী বীর। কাব্যিক উচ্চারণে মহাপ্রলয়ের নটরাজ।

কাজী নজরুল ইসলামের ‘অগ্নি-বীণা’ গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে, বাংলা ১৩২৯ সালের কার্তিক মাসে। যখন নজরুলের বয়স ২৩ বছর। কবি নিজেই গ্রন্থটি প্রকাশ করেন। বাংলা সাহিত্যের অমূল্য এ গ্রন্থটি শতবর্ষ পাড়ি দিয়েছে। ১৯২২ সালে প্রকাশিত হওয়া দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থটির প্রথম সংস্করণের সন্ধান মেলে সিরাজগঞ্জ জেলার রায়গঞ্জ উপজেলার আবুদিয়া গ্রামের ইউসুফ আলী সরকারের কাছে। কালের ধুলোয় মলিন গ্রন্থটি সযত্নেই রেখেছেন তিনি। ভাবছেন, হয়তো তাতে লেগে আছে কবি নজরুলের হাতের পরশ। ক্ষুদ্র কলেবরের বইটির দৈর্ঘ্য আট ইঞ্চি ও প্রস্থ সাড়ে পাঁচ ইঞ্চি। নামপত্রে উল্লিখিত–বইটি ৭নং প্রতাপ চাটুর্য্যে লেন, কলিকাতা থেকে প্রকাশিত। প্রাপ্তিস্থান–আর্য্য পাবলিশিং হাউস, কলেজ স্ট্রিট মার্কেট (দোতলা), কলিকাতা। ছাপা হয় মেটকাফ প্রেস, ৭৯নং বলরাম দে স্ট্রিট, কলিকাতা থেকে। ছেষট্টি পৃষ্ঠার বইটির মূল্য ছিল এক টাকা।

‘অগ্নি-বীণা’ প্রচ্ছদপটের পরিকল্পনায় ছিলেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং এঁকেছিলেন তরুণ চিত্রশিল্পী বীরেশ্বর সেন। এই কাব্যগ্রন্থে মোট বারোটি কবিতা স্থান পায়। কবিতাগুলো হচ্ছে–‘প্রলয়োল্লাস’, ‘বিদ্রোহী’, ‘রক্তাম্বর-ধারিণী মা’, ‘আগমনী’, ‘ধূমকেতু’, ‘কামাল পাশা’, ‘আনোয়ার’, ‘রণভেরী’, ‘শাত-ইল-আরব’, ‘খেয়াপারের তরণী’, ‘কোরবানী’ ও ‘মোহররম’। নজরুল গ্রন্থটি অগ্নিযুগের বিপ্লবী বারীন্দ্রকুমার ঘোষকে উৎসর্গ করেছেন। বারীন্দ্রকুমার ঘোষ বাংলা তথা ভারতের বিপ্লববাদী আন্দোলনের অন্যতম মহানায়ক ছিলেন। বিদ্রোহী নজরুল তাই নিজেকে বারীন্দ্রকুমারের ‘স্নেহ-মহিমান্বিত শিষ্য’ বলে উল্লেখ করে তাঁকেই তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ উৎসর্গ করেছিলেন–‘বাঙলার অগ্নিযুগের আদি পুরোহিত সাগ্নিক বীর শ্রীবারীন্দ্রকুমার ঘোষ শ্রীশ্রীচরণারবিন্দেষু’। নিচে লেখা আছে ‘তোমার অগ্নি-পূজারী-স্নেহ-মহিমান্বি শিষ্য–কাজী নজরুল ইসলাম’। উৎসর্গপত্রের গানটি ‘অগ্নিঋষি’ নামে ১৩২৮ সালের শ্রাবণ মাসের ‘উপাসনা’য় আত্মপ্রকাশ করে। গ্রন্থটির উৎসর্গপত্রের ঠিক আগের পাতায় একটি চমৎকার বিজ্ঞাপন ছাপা হয়। সেখানে উল্লেখ করা হয়, ‘যুগবাণী ছাপা হইল, শীঘ্রই প্রকাশিত হইবে–অগ্নি-বীণা ২য় খণ্ড (কবির অপরাপর বিখ্যাত কবিতা ইহাতে থাকিবে)।’

পাঠক চাহিদার কারণে প্রকাশের কয়েক মাসের মধ্যেই প্রথম সংস্করণে দুই হাজার কপি বিক্রি হয়ে যায়। দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৩৩০ বঙ্গাব্দের আশ্বিনে। তখন নজরুল রাজদ্রোহে কারাবন্দি। দ্বিতীয় সংস্করণের নিবেদনে প্রকাশক শ্রীশরচ্চন্দ্র গুহ বিষয়টি উল্লেখ করে লিখেন, ‘কবি নজরুল আজ রাজদ্রোহ অপরাধে বন্দী। তাঁর অবর্ত্তমানেই বর্ত্তমান সংস্করণটি আমাদের বা’র করতে হ’ল।’

বিজ্ঞাপনে উল্লেখ থাকলেও অগ্নি-বীণা দ্বিতীয় খণ্ড আর অগ্নি-বীণা নামে প্রকাশিত হয়নি। অগ্নি-বীণা রূপ নেয় ‘বিষের বাঁশি’তে। কৈফিয়ত শিরোনামে ‘বিষের বাঁশিতে’ নজরুল লিখেছেন–‘‘‘অগ্নি-বীণা’ দ্বিতীয় খণ্ড নাম দিয়ে তাতে যেসব কবিতা ও গান দেব বলে এতকাল ধরে বিজ্ঞাপন দিচ্ছিলাম, সেইসব কবিতা ও গান দিয়ে এই ‘বিষের বাঁশি’ প্রকাশ করলাম। নানা কারণে ‘অগ্নি-বীণা’ দ্বিতীয় খণ্ড নাম বদলে ‘বিষের বাঁশি’ নামকরণ করলাম।’’ তবুও আইন রূপ আয়ান ঘোষের হাত থেকে রক্ষা মেলেনি। নিষিদ্ধ হয় বিষের বাঁশি নামের কাব্যগ্রন্থটি।

অগ্নি-বীণা বাংলা সাহিত্যের এক মহামূল্য গ্রন্থ। এর শুরুর দিকের সংস্করণ খুব একটা দেখা যায় না। দুয়েকটি হয়তো কোথাও সংরক্ষিত আছে। সংগ্রাহক ইউসুফ আলী সরকারের কাছ থেকে শোনা যায় গ্রন্থটির সংগ্রহকথন। ইউসুফ তখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কেবল বর্ণজ্ঞান জানা ছাত্র। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক দাদার মুখেই নজরুলের নাম শোনা। দাদা প্রায়ই নজরুলের ছড়া-কবিতা শোনাতেন, বলতেন কবি-জীবনের গল্পও। ধীরে ধীরে নজরুল সম্পর্কে কৌতূহলী হয়ে ওঠেন ইউসুফ। বড় হয়ে নজরুলের লেখা গ্রন্থ সংগ্রহ ও পড়া শুরু করেন। একে একে নজরুলের অনেক গ্রন্থেরই প্রথম সংস্করণ সংগ্রহ করেন।

এর মধ্যে সংগ্রহ করে ফেলেন অগ্নি-বীণার দ্বিতীয় সংস্করণটি। সেখানেই উল্লেখ ছিল তখন নজরুলের রাজবন্দি থাকার কথা। এতে আগ্রহ জন্মে প্রথম সংস্করণের প্রতি। এই আগ্রহের কথা জানান বই-পুস্তক বিক্রেতাদের কাছে। কিন্তু কেউই তাঁকে আশ্বস্ত করতে পারেননি। অনেকেই বলেন, অগ্নি-বীণার প্রথম সংস্করণ কখনও দেখেননি। তবে ইউসুফ হাল ছেড়ে দেননি। দীর্ঘ পনেরো বছর খোঁজার পর বইটির সন্ধান পান কলকাতার এক পুরোনো বই বিক্রেতার কাছে। কোনো কারণে পুরোনো বইয়ের ভিড়ে এসে পড়ে মহামূল্য এ রত্নখানি। ৮০০ রুপির বিনিময়ে কলকাতার আদিত্য ব্যানার্জীর কাছ থেকে কিনে নেন বইটি। ইউসুফ আলী সরকার বলেন, ‘আমি নজরুলের কবিতা ও গান দ্বারা এতই প্রভাবিত হই যে, নজরুলের বিভিন্ন কবিতার নামে আমিও কবিতা লিখি।’ 
ইউসুফ আলী সরকারের মতো অনেকেই হয়তো নজরুলের কবিতায় নতুন জীবন চেতনার এক অবলম্বন খুঁজে পেয়েছেন।

লেখক ও নজরুল গবেষক পীযূষ কুমার ভট্টাচার্য্যের মতে, ‘‘কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক বিস্ময়কর ও মহিমান্বিত প্রতিভা। বহুমাত্রিক নজরুল বাংলা সাহিত্যে যুক্ত করেছেন আপন মাত্রা। অবিস্মরণীয় মানব নজরুলের কাব্যসৃজনে পরাধীন অখণ্ড ভারতের নিপীড়ত মানুষের আর্তনাদ খুঁজে পাওয়া যায়। নজরুলের কবিতায় রয়েছে দেশাত্মবোধ, উদ্দীপনা, মানবতা, যৌবনকে জাগিয়ে তোলা, প্রেম ও প্রকৃতি, শিশু-কিশোর প্রভৃতি প্রসঙ্গ। তাঁর দ্রোহ, প্রেম, বিশ্বাস, মাটি-মানুষ-মাতৃভূমির প্রতি অনুধাবন সকলের শিক্ষণীয়। ‘অগ্নি-বীণা’ কাব্যগ্রন্থের কাব্যশৈলীতে বিষয়বস্তু, গঠনকৌশল, লক্ষ্য, সমাজ-বাস্তবতা, সমাজ-সচেতনতা এবং নজরুলমানস যেমন রয়েছে, তেমনি কাব্যগ্রন্থের কবিতাসমূহের প্রতিফলনের মাধ্যমে সামাজিক জাগরণের চিত্র প্রস্ফুটিত হওয়ায় আপামর জনগণ নতুন জীবন চেতনায় এক অবলম্বন খুঁজে পায়। নজরুলের কবিকল্পনায় মানবতাবোধ ও সমকালীন সমস্যা একে অপরের পরিপূরক।’’

শত বছর পেরিয়ে এসে এখনও নজরুলের কবিতা খুবই প্রাসঙ্গিক। অগ্নি-বীণায় আজও বাজে শৃঙ্খলমুক্তির ঝঙ্কার। কবিভাষ্যে–‘আমি যুগে যুগে আসি, আসিয়াছি পুনঃ মহাবিপ্লব হেতু/এই স্রষ্টার শনি মহাকাল ধূমকেতু!’ 

লেখক: ঐতিহ্য সংগ্রাহক

আরও পড়ুন

×