ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মেক্সিকোর অরণ্যে লাখো প্রজাপতির মেলা

মেক্সিকোর অরণ্যে লাখো প্রজাপতির মেলা
×

টি এইচ মাহির

প্রকাশ: ১০ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৩০ | আপডেট: ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ | ২১:০১

| প্রিন্ট সংস্করণ

কল্পনা করুন এমন এক অরণ্য, যেখানে গাছের ডালপালা পাতার বদলে ঢেকে আছে হাজার হাজার প্রজাপতিতে। বাতাসের দোলায় ঝরে পড়ছে রঙের ঝরনা। কোনো রূপকথা নয়, উত্তর আমেরিকার দেশ মেক্সিকোতে প্রতিবছর শীতে এমনই এক জাদুকরী দৃশ্যের অবতারণা হয়। পৃথিবীর অন্যতম বিস্ময়কর এই প্রাকৃতিক ঘটনার সাক্ষী হতে প্রতিবছর হাজারো পর্যটক ভিড় করেন মেক্সিকোর গহিনে।

প্রতিবছর শীতকালে মেক্সিকোর আকাশ এক অদ্ভুত কমলা ও কালো রঙে সেজে ওঠে। এর নেপথ্যের কারিগর হলো ‘মোনার্ক বাটারফ্লাই’ বা রাজা প্রজাপতি। উত্তর আমেরিকা ও কানাডায় যখন হাড়কাঁপানো শীত নামতে শুরু করে, তখন উষ্ণতার খোঁজে এই ক্ষুদ্র পতঙ্গগুলো পাড়ি দেয় হাজার মাইলের পথ। কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় তিন হাজার মাইল (৪৮০০ কিলোমিটার) পথ অতিক্রম করে তারা পৌঁছায় মেক্সিকোর সুউচ্চ পাম ও দেবদারু বনে। এই অভিবাসন প্রক্রিয়া প্রকৃতির এক অনন্য রহস্য। যাত্রাপথে সময় ও দূরত্ব বিবেচনায় প্রজাপতিদের প্রায় চারটি প্রজন্ম পার হয়ে যায়। যে প্রজন্ম মেক্সিকোতে পৌঁছায়, তারা অন্যদের চেয়ে দীর্ঘজীবী হয় এবং এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার অবিশ্বাস্য ক্ষমতা রাখে। উদ্দেশ্য একটাই– মেক্সিকোর সহনীয় উষ্ণতায় শীতকাল কাটানো, বিশ্রাম নেওয়া এবং বংশ বৃদ্ধি করা। বসন্তের শুরুতে তারা পুনরায় উত্তরের পথে যাত্রা করে।

মেক্সিকোর যে বনাঞ্চলগুলোতে এই প্রজাপতিরা আশ্রয় নেয়, তাকে বলা হয় ‘মোনার্ক বাটারফ্লাই বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ’। মূলত মেক্সিকোর মিচোয়াকান এবং মেক্সিকো স্টেটজুড়ে এই রিজার্ভ বিস্তৃত। এই বনাঞ্চল এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে ইউনেস্কো একে ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট’ বা বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে ঘোষণা করেছে।

অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত শীতকালজুড়ে এই অরণ্যগুলো রঙিন প্রজাপতিতে ভরে থাকে। গাছের ডালে ডালে তারা এমনভাবে ঝুলে থাকে যে দূর থেকে মনে হয় গাছগুলো শুকনো পাতায় ছেয়ে আছে। সূর্যের আলো পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই যখন তারা ডানা মেলে ওড়ে, তখন মনে হয় আকাশজুড়ে রঙের আগুন লেগেছে।

পর্যটকদের জন্য এই বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভের নির্দিষ্ট কিছু অংশ উন্মুক্ত রাখা হয়। এর মধ্যে এল রোজারিও, সিয়েরা চিনকুয়া, এল ক্যাপুলিন, লা মেসা এবং পিড্রা হেরাডা অভয়ারণ্য অন্যতম। এর মধ্যে এল রোজারিও এবং সিয়েরা চিনকুয়া পর্যটকদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয়, কারণ এগুলো মেক্সিকো সিটির অপেক্ষাকৃত কাছাকাছি অবস্থিত।

নির্দিষ্ট ফি দিয়ে দর্শনার্থীরা এই জাদুকরী জগতে প্রবেশ করতে পারেন। বনের গভীরে হাঁটার সময় চারপাশে লাখ লাখ প্রজাপতির ওড়াউড়ি, ডানার ঝাপটানি এবং বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ এক অপার্থিব পরিবেশ তৈরি করে। নভেম্বর থেকে মার্চ হলো এই দৃশ্য উপভোগ করার সেরা সময়।

স্থানীয় মেক্সিকান সংস্কৃতির সঙ্গে রাজা প্রজাপতির রয়েছে এক গভীর আত্মিক সম্পর্ক। মোনার্ক প্রজাপতিদের মেক্সিকোতে আগমন ঘটে ঠিক এমন সময়ে, যখন মেক্সিকানরা ‘ডে অব দ্য ডেড’ বা মৃতদের স্মরণে উৎসব পালন করে। মেসোআমেরিকান মিথ অনুযায়ী, স্থানীয়রা বিশ্বাস করেন যে এই প্রজাপতিরা আসলে তাদের মৃত প্রিয়জনদের আত্মা, যারা বছরে একবার পৃথিবীতে ফিরে আসে তাদের আপনজনদের কাছে। তাই স্থানীয়দের কাছে এই প্রজাপতিরা অত্যন্ত পবিত্র এবং শ্রদ্ধার পাত্র।

শুনতে অবাক লাগলেও ১৯৭৫ সালের আগে বিজ্ঞানীদের জানা ছিল না যে উত্তর আমেরিকার এই প্রজাপতিরা শীতকালে ঠিক কোথায় হারিয়ে যায়। দীর্ঘ গবেষণার পর ড. ফ্রেড উরকুহার্ট এবং তাঁর সহযোগীরা মেক্সিকোর এই গোপন আস্তানার সন্ধান পান।

বর্তমানে এই সুন্দর প্রজাপতি অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, অবৈধভাবে গাছ কেটে বন উজাড় এবং কৃষিকাজের জন্য জমি দখলের ফলে মোনার্ক প্রজাপতির সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে তাদের প্রধান খাদ্য ‘মিল্কউইড’ গাছের অভাব এদের বংশবিস্তারে বাধা সৃষ্টি করছে। জীববিজ্ঞানী এবং পরিবেশবাদীরা বর্তমানে এই অভিবাসন প্রক্রিয়া অটুট রাখতে এবং প্রজাপতিদের বাঁচাতে নানা ধরনের সচেতনতামূলক কাজ করে যাচ্ছেন।

মেক্সিকোর এই প্রজাপতি অভয়ারণ্য কেবল একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়, বরং প্রকৃতির এক সূক্ষ্ম ও সুন্দরতম নিদর্শনের নাম। লাখ লাখ প্রজাপতির এই সম্মিলিত ডানা ঝাপটানি আমাদের মনে করিয়ে দেয় প্রকৃতি কতটা সুন্দর, আর তাকে রক্ষা করা কতটা জরুরি।

আরও পড়ুন

×