ঢাকা সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬

বিস্মৃতির আড়ালে মাস্টারদার স্মৃতি

বিস্মৃতির আড়ালে মাস্টারদার স্মৃতি
×

মাস্টারদা সূর্যসেন

রফিকুর রহমান প্রিয়াম

প্রকাশ: ১২ জানুয়ারি ২০২৬ | ২০:১০

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া এক অসমসাহসী বিপ্লবীর নাম মাস্টারদা সূর্য সেন। একাধারে স্কুলশিক্ষক এবং রণকৌশলী এই নেতার আত্মত্যাগ ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে এক স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়। ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল চট্টগ্রামের অস্ত্রাগার লুণ্ঠন ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে এক চরম আঘাত। মাস্টারদার নেতৃত্বে একদল তরুণ চট্টগ্রামকে চার দিনের জন্য ব্রিটিশমুক্ত করেছিল। তবে দীর্ঘ লড়াই আর আত্মগোপনের পর, ১৯৩৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি এক নিকটজনের (নেত্রসেন) বিশ্বাসঘাতকতায় তিনি গ্রেপ্তার হন।

১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি চট্টগ্রাম কারাগারে তাঁর ওপর চালানো হয় অমানবিক ও নারকীয় নির্যাতন। ব্রিটিশরা এতটাই ভীত ছিল যে, ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলানোর আগে তাঁর হাড়গোড় ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। এমনকি তাঁর মরদেহ পর্যন্ত স্বজনদের দেওয়া হয়নি; পাছে তাঁর সমাধি বিপ্লবীদের তীর্থক্ষেত্রে পরিণত হয়, সেই ভয়ে লোহার খাঁচায় ভরে তাঁর দেহ বঙ্গোপসাগরের অতল গহ্বরে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। এভাবে এক নিভৃত প্রয়াণের মাধ্যমে তিনি হয়ে ওঠেন অমর।

মাস্টারদা সূর্য সেনকে স্মরণ করা কেবল অতীত রোমন্থন নয়; বরং বর্তমান বাংলাদেশের সংকটে পথ খুঁজে পাওয়া। তাঁর লড়াই ছিল অসাম্প্রদায়িক ও বৈষম্যহীন। যখন ব্রিটিশরা ‘ভাগ করো এবং শাসন করো’ নীতি দিয়ে সমাজকে বিষিয়ে দিচ্ছিল, তখন মাস্টারদার বাহিনীতে হিন্দু-মুসলিম বিপ্লবীরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছেন। আজকের বাংলাদেশে যখন সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা মাথাচাড়া দিতে দেখা যাচ্ছে, তখন মাস্টারদার সেই লড়াইয়ের আদর্শ হতে পারে আমাদের পাথেয়।

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আমরা তরুণ প্রজন্মের যে রুদ্ররূপ দেখেছি, তার পেছনেও রয়েছে মাস্টারদার দেখানো তারুণ্যের শক্তি। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, সংগঠিত ছাত্রশক্তি যে কোনো স্বৈরাচারী বা শক্তিশালী রাষ্ট্রযন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।

আক্ষেপের বিষয় হলো, চট্টগ্রামে মাস্টারদার স্মৃতি রক্ষায় কিছু স্থানীয় উদ্যোগ থাকলেও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তা অত্যন্ত নগণ্য। ঢাকা বা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর নামে আবাসিক হল কিংবা ডাকটিকিট প্রকাশ করা হলেও, তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে কোনো জাতীয় জাদুঘর আজও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এমনকি পাঠ্যপুস্তকেও তাঁর সংগ্রামী জীবন সেভাবে গুরুত্ব পায়নি। 

চট্টগ্রামের বিশিষ্টজনেরা এই অবহেলা নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে ক্ষোভ প্রকাশ করে আসছেন। প্রবীণ সাংবাদিক ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সদস্য জাহিদুল করিম কচি এই বিষয়ে বলেন, ‘এমন মহান এক বিপ্লবী, চট্টগ্রামের সূর্যসন্তানের জন্য দৃশ্যমান উদ্যোগ চট্টগ্রামবাসীর বহু দিনের দাবি। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে আমরা সরকারের কাছ থেকে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ দেখতে চাই।’

একই সুর শোনা যায় বিশিষ্ট লেখক সৈকত দে-র কণ্ঠে। তিনি বলেন, ‘মাস্টারদা সূর্য সেনের আত্মত্যাগ আমাদের সামগ্রিক ইতিহাসের জন্য অপরিহার্য। তাঁর জীবনকথা পাঠ আমাদের ইতিহাসনিষ্ঠ ও মূল্যবোধসম্পন্ন করে তুলবে। অত্যন্ত বেদনাদায়ক যে, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এখনও তাঁকে স্মরণের টেকসই আয়োজন গড়ে ওঠেনি।’

মাস্টারদা সূর্য সেন কোনো বিশেষ অঞ্চলের বা বিশেষ সময়ের বীর নন। তিনি যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে চিরন্তন প্রতিবাদের প্রতীক। চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী গ্রাফিতিতেও উঠে এসেছেন সূর্যসেন। তাঁর সংগ্রাম আমাদের শিখিয়েছে, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা কখনও মরে যায় না। মাস্টারদাসহ জাতীয় পর্যায়ে যারা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন সেই নেতাদের ইতিবাচকতা ঊর্ধ্বে তুলে ধরা এবং তাঁর স্মৃতিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে যথাযথ মর্যাদা দিয়ে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এখনই সময়।

আরও পড়ুন

×