ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

৫৪ বছর ধরে মফস্বলের পথে পথে ‘কবিতা বেচা রশিদ’

হাতে আদর্শলিপি, কণ্ঠে লোকগান

হাতে আদর্শলিপি, কণ্ঠে লোকগান
×

আদর্শলিপির বই নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘোরেন, গান গেয়ে বই বেচেন আবদুর রশিদ

ইমতিয়াজ আহমেদ

প্রকাশ: ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:২১ | আপডেট: ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ | ২০:৩৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার লক্ষিন্দর ইউনিয়নে যখন প্রথম পা পড়ে, তখন সময়টা ছিল আষাঢ় মাস। বর্ষার সজল ধারায় কৃষকের ব্যস্ততা ছিল আমনের চারা রোয়ায়। ঋতুচক্রের পালাবদলে প্রকৃতি এখন ধানের গন্ধে মাতোয়ারা। প্রকৃতির এ পট পরিবর্তনের মধ্যেই এবারের যাত্রা এক অন্য মানুষের খোঁজে। নাম তাঁর আবদুর রশিদ। লক্ষিন্দর ইউনিয়নের মধুপুর চালা গ্রামের সানেবান্দা এলাকায় এসে আবদুর রশিদের খোঁজ করলে অনেকেই প্রশ্ন করেন–‘কোন রশিদরে খুঁজতাছেন?’ ‘ওই যে হাতে আদর্শলিপির বই নিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘোরেন, গান গেয়ে বই বেচেন’–এ কথা বলতেই সবার চোখেমুখে চেনার ঝিলিক। একজন বলে উঠলেন, ‘ও... কবিতা বেচা রশিদ? ওই রাস্তা ধইরা যান, জিগাইলেই কইয়া দিব।’

বাড়িতে তাঁকে পাওয়া গেল না। গ্রামবাসী জানালেন, তিনি এখন সাগরদিঘি বাজারে।  সেখানেই দেখা মিলল তাঁর। হাতে একগুচ্ছ বই, চোখেমুখে বয়সের ভার আর অভিজ্ঞতার ছাপ। আবদুর রশিদ মিয়া, যিনি ৫৪ বছর ধরে টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, গাজীপুরের পথে-প্রান্তরে শিক্ষার আলো ফেরি করে বেড়াচ্ছেন। তাঁর হাত থেকে কেনা আদর্শলিপি পড়ে আজ কত শিশু চিকিৎসক, প্রকৌশলী বা জজ-ব্যারিস্টার হয়েছে এর ইয়ত্তা নেই। ৮০ বছর বয়সী রশিদ মিয়ার ঝুলিতে জমা আছে অজস্র গল্প, সুখ-দুঃখ আর জীবনবোধের এক বিরল আখ্যান।

‘দম ফুরালে সব শেষ’
কেমন আছেন–প্রশ্ন করতেই গালভরা হাসি দিয়ে রশিদ মিয়ার উত্তর, ‘মালিক রাখছে মেভাই, বাঁইচা আছি, দমের গাড়ি চলতাছে অহনো আপনেগর দোয়ায়... ভালাই আছি।’ এই ‘ভালো থাকা’র আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে এক দীর্ঘশ্বাসের গল্প। তিন ছেলে আর এক মেয়ের বাবা আবদুর রশিদ। মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন, ছেলেরাও যার যার মতো আলাদা সংসার পেতেছেন। অভাবের সংসারে ছেলেদের কাছ থেকে খুব একটা সহযোগিতা পান না। তাই জীবনের এই গোধূলি বেলায় নিজের অন্নসংস্থান নিজেকেই করতে হয়।

স্ত্রীর কথা তুলতেই এতক্ষণের উজ্জ্বল হাসিটা যেন নিমেষেই মিলিয়ে গেল। চোখের কোণে জমা হলো জল। ভারী গলায় বললেন, ‘গেল দুই বছর হইল সে ক্যান্সারে মারা গেছে। জীবনের সব সঞ্চয় দিয়া চিকিৎসা করাইছি, তাও বাঁচাইতে পারি নাই। আরও টেকা লাগত, কিন্তু সামর্থ্য ছিল না। চোখের সামনে বিনা চিকিৎসায় মানুষটা মইরা গেল–এই দুঃখটা মন থেইকা যায় না ভাই।’

গানের ছলে বই বিক্রি
আবদুর রশিদ শুধু একজন বই বিক্রেতা নন, তিনি গ্রামবাংলার এক হারানো ঐতিহ্যেরও ধারক। বই বিক্রির কৌশল হিসেবে তিনি বেছে নিয়েছেন গানকে। তবে তিনি কোনো পেশাদার শিল্পী নন। ছোটবেলায় গ্রামের পালাগান, পুঁথিপাঠ আর যাত্রাপালা শুনে শুনেই কণ্ঠে তুলে নিয়েছেন কাসেম-মালা, গুনাইবিবি, বেহুলা-লখিন্দরের সুর। তিনি বলেন, ‘গানে টান দিলেই স্কুলের পোলাপান আর হাটের মানুষ জড়ো হয়। অনেকে বই না কিনলেও গান শুইনা খুশি হইয়া টেকা দেয়। যাদের ঘরে ছোট শিশু আছে, তারাই এখন আমার কাছ থেইকা আদর্শলিপি কিনে।’ 

একসময় তিনি প্রেমের কবিতা, পুঁথি, আরব্য রজনীর গল্প আর নানা কিসসার বই বিক্রি করতেন। কিন্তু স্মার্টফোনের রঙিন দুনিয়ায় ওসবের কদর কমেছে। এখন শুধু শিশুদের আদর্শলিপি বিক্রি করেই টিকে আছেন। টাঙ্গাইলের ঘাটাইল, মধুপুর, সখিপুর থেকে শুরু করে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া, মুক্তাগাছা, ভালুকা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল তাঁর পদচারণা। এখন পায়ে ব্যথা, বার্ধক্যজনিত নানা অসুখ তাঁকে কাবু করে ফেলেছে। তবুও পেটের তাগিদে প্রতিদিন বের হতে হয়। ‘জমিজমা নাই, এইটাই চলার পথ। সারাদিন হাইটা ৮০০ থেকে এক হাজার টাকার বই বেচি, তাতে ৩০০-৪০০ টাকা লাভ থাকে। যেদিন অসুখে পড়ি, সেদিন রোজগার বন্ধ। খুব টানাটানি কইরা সংসার চলে’– বলছিলেন রশিদ মিয়া।

গভীর জীবনবোধ
জীবনে আবদুর রশিদের কোনো বড় চাওয়া নেই; তবে আছে গভীর এক জীবনদর্শন। তাঁর হাত থেকে বই কিনে যারা আজ বড় হয়েছে, তারা কি তাঁর খোঁজ রাখে? ম্লান হেসে তিনি উত্তর দেন, ‘‘কার খবর কেডা রাখে, ভাই? তারা যার যার কামে ব্যস্ত। তবে আমি খুব শান্তি পাই যখন দেহি একসময় যাদের মাটির ঘর আছাল, তারা এখন দালান করছে, গাড়িতে চড়ে। জজ-ব্যারিস্টার হইছে। তখন কলিজাটা জুড়ায়। মানুষ এখনও রাস্তায় দেখলে কয়–ওই যে ‘কবিতা বেচা রশিদ’ যায়। মানুষের এ ভালোবাসাই আমার বড় পাওয়া।’’ তবে রশিদ মিয়ার আক্ষেপ–‘কষ্ট একটাই, মানুষ শিক্ষিত হইল ঠিকই, তয় মানুষ হইল না। মানুষ হওয়া বড় কঠিন।’

তাঁর মতে, ‘শুধু ডিগ্রি অর্জনই শিক্ষা নয়। শুধু যুবকদের নয়, সব মানুষের আবারও আদর্শলিপি পড়া দরকার। আদর্শলিপি পড়লে আদব-কায়দা শেখা যায়, মন সুন্দর থাকে। আজকালকার পোলাপান বাপ-মায়ের লগে ভালো ব্যবহার করে না। দেশের যুবকরা যদি ভালোভাবে শিক্ষিত হয়, তবেই দেশ উন্নত হইব।’

চায়ের আমন্ত্রণ জানিয়ে আবদুর রশিদ আবার তাঁর বইয়ের ঝুলি কাঁধে তুলে নিলেন। ডিজিটাল যুগের চাকচিক্যে গ্রামবাংলার অনেক ঐতিহ্যই আজ ম্লান। আবদুর রশিদের মতো মানুষ আছেন বলেই হয়তো এখনও কোথাও বেঁচে আছে সরলতা আর মাটির ঘ্রাণ। তিনি শুধু বই বিক্রি করেন না–করে বেড়ান মনুষ্যত্বের পাঠ, যা আজকের সমাজে বড়ই বিরল।

আরও পড়ুন

×