ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মৌলভীবাজারের মণিপুরি জাদুঘর

নৃতাত্ত্বিক মেধাসম্পদ সংরক্ষণের অনন্য উদ্যোগ

মৌলভীবাজারের মণিপুরি জাদুঘর
×

 শিশির কুমার নাথ

প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:২৩ | আপডেট: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১৮:১৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এক জাতি মণিপুরি। নিজস্ব ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতির জন্য তাদের রয়েছে অনন্য খ্যাতি। বাংলাদেশের মণিপুরি জাতিগোষ্ঠীর বৃহৎ অংশ বাস করে সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলায়। এই জাতিসত্তার মেধাসম্পদ সংরক্ষণের এক অনন্য উদ্যোগের নাম ‘চাউবা মেমোরিয়াল মণিপুরি ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি মিউজিয়াম’। এমন ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নেওয়া মানুষটির নাম হামোম তনুবাবু। মণিপুরি সম্প্রদায়ের ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত বিচিত্র সব নিদর্শন ও শিল্পকর্ম নিয়ে নিজ বাড়িতে গড়ে তুলেছেন এই সমৃদ্ধ জাদুঘর; যেটির অবস্থান মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নের ছনগাঁও নামক গ্রামে। 

মৌলভীবাজার জেলা শহর থেকে সিএনজিচালিত অটোতে করে প্রায় ৩০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে পৌঁছলাম আদমপুর বাজারে। সেখান থেকে নিভৃত পল্লি ছনগাঁও। স্থানীয় স্কুলশিক্ষিকা মৌমিতা দেবীর পথনির্দেশে এগোতে লাগলাম আমরা। লালমাটির ধুলোমাখা পথ, পথের দুই পাশে অল্প ব্যবধানেই চোখে পড়ছে উঁচু-নিচু টিলা। টিলার ওপর ঘরবাড়ি। কোনোটি বাঁশের তরজার, কোনোটি মাটির। পাকা ঘরবাড়ির সংখ্যাটাও একেবারে কম নয়। চিরচেনা গ্রামের দৃশ্যপট পাল্টালেও ছনগাঁও তার নামের সার্থকতা বজায় রেখেছে অনেকটাই। কিছুদূর এগিয়ে যেতেই চোখে পড়ল ছনগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নামফলক। তনুবাবুর বাড়ির সন্ধান চাইতেই পথচারী নির্দেশ করলেন, সামনের উঠনি (রাস্তার উঁচু জায়গা) পার হয়ে ডান দিকের টিলা বাড়ির দিকে। উঠানের কোণে বসে থাকা বৃদ্ধের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে বাড়িতে ঢুকলাম। সদ্য নিকানো ঝলমলে উঠান বেয়ে দাঁড়ালাম একটি আধাপাকা তালাবদ্ধ কক্ষের সামনে। পাশেই মাটির একটি উন্মুক্ত মঞ্চ। তাতে টানানো রয়েছে একটি ব্যানারও। বাইরের দৃশ্যে মনে হলো এখানেই তনুবাবুর সংগ্রহশালা। খবর পেয়ে মুহূর্তেই চাবির গোছা নিয়ে ছুটে এলেন জাদুঘরের তত্ত্বাবধায়ক বৃন্দা রানী। জানালেন তিনি তনুবাবুর ভাইয়ের স্ত্রী।

মূল ফটক খুলে দিতেই চোখে পড়ল স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত নানা সামগ্রী। স্তরে স্তরে সাজানো রয়েছে মণিপুরিদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক, লাইহারাওবা উৎসবে ব্যবহৃত বিশাল আকারের ছাতা, ধর্মযাজক মাইবা-মাইবির প্রতিকৃতি ও তাদের ব্যবহার্য সামগ্রীসহ কিছু বাদ্যযন্ত্র। একটি অনার বোর্ডে কিছু দাতা সদস্যের নামও চোখে পড়ল। ভেতরের কক্ষের একটি আলমারিতে কাঁসা-পিতলের কিছু সামগ্রী ছাড়াও আছে মণিপুরি সাতটি গোষ্ঠীর পরিচয় নির্ধারক অস্ত্রবিশেষ, যা থাঙ নামে পরিচিত। আলমারিটির পাশেই শোভা পাচ্ছে হিজ মাস্টারস ভয়েস কোম্পানির একটি পুরোনো কলের গান। নিজস্ব ভাষার নামপত্রে এটির পরিচয় দেওয়া হয়েছে ‘কল ইশৈ’ নামে। অন্য একটি শোকেসে দেখা গেল ঐতিহ্যবাহী পোশাকে মণিপুরি মহাকাব্যের চরিত্র খাম্বা ও থোইবিকে। এ ছাড়াও এখানে রয়েছে বিভিন্ন যুদ্ধাস্ত্র, ফটোগ্রাফ, পোশাক-আশাক প্রভৃতি। পাশের ছোট একটি কক্ষে স্থাপন করে রাখা হয়েছে রাধা-কৃষ্ণ ও ললিতার মূর্তি। সামনে সাজানো রয়েছে মৃদঙ্গ, করতাল, শঙ্খ, ঘণ্টা, চামর, প্রদীপসহ মাঙ্গলিক নানা উপকরণ।

পাশের একটি গ্যালারিতে দুটি পালঙ্কের ওপর সাজানো পিতলের প্রাচীন বাসনকোসন, অলংকার, হুক্কা, ঢাল-তলোয়ার, তীর-ধনুক, মাটির মটকা, মণিপুরি ভাষার বইপত্র ও বর্ণমালার চার্ট প্রভৃতি। এক পাশের দেয়ালে কাঠের তাকে সাজানো বাঁশ-বেতের নান্দনিক সামগ্রী। রয়েছে স্বতন্ত্র বুনন শৈলীর হাতপাখা, ডালা, বিশেষ ধরনের ছাতা ও নানা রকম ঝুড়ি; যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো মণিপুরি বিয়েতে ব্যবহৃত ঝুড়ি ‘ফিঙ্গারুক’।

এখান থেকে বেরিয়ে বাড়ির সামনের দিকের কক্ষটিতে প্রবেশ করে মনে হলো, একটি জাতির সমৃদ্ধ অতীত যেন উজ্জ্বল হয়ে ফুটে উঠেছে চার দেয়ালের ভেতর। বাঁশের তরজার বেড়ায় তৈরি ঐতিহ্যবাহী ঘরটিতে রয়েছে বিলুপ্তপ্রায় কৃষি-সরঞ্জাম, তাঁতযন্ত্র, মাছ ধরার নানা উপকরণ। লাঙল-জোয়াল, মই-কাঠিয়া, মাকু-চরকা, ঘাইল-ঘানি কী নেই এখানে? সবই যেন একজন সংগ্রাহকের দীর্ঘদিনের শ্রম, সাধনা, নিষ্ঠা আর ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের এক অভূতপূর্ব নিদর্শন। এসবের পাশাপাশি এখানে সংরক্ষিত রয়েছে মণিপুরি প্রাচীন লিপি ‘মইতেই ময়েক’। এ ছাড়া রয়েছে নানা রকম কেরোসিন বাতি, মহিষের গলার ঘণ্টা, কুলা, ডালা, ঢেঁকিসহ লোকজীবনধারার বিচিত্র স্মারক; যার কোনো কোনোটির বয়স ১০০ বছর বা তারও বেশি।

তত্ত্বাবধানে থাকা বৃন্দা রানী জানালেন, তনুবাবু স্ত্রী ও এক ছেলেকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত। আরেক ছেলে চাকরিসূত্রে ঢাকায় থাকেন। বাড়িতে কেউ থাকেন না বিধায় জাদুঘরটি তাঁকেই দেখভাল করতে হয়। শিক্ষার্থী ও গবেষকরা প্রায়ই আসেন এখানে। তবে প্রচার-প্রচারণা কম থাকায় অনেকেই জাদুঘরটির বিষয়ে জানেন না। শুক্রবার ছাড়া সপ্তাহের বাকি দিনগুলোয় খোলা থাকে জাদুঘর। পরিদর্শন ফি দিতে হয় ২০ টাকা। 

সংস্কৃতিসাধক হামোম তনুবাবু ২০০৬ সালে নিজ পৈতৃক ভিটায় তাঁর বাবার নামেই প্রতিষ্ঠা করেন জাদুঘরটি। টেলিফোনে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। এমন ব্যতিক্রমী উদ্যোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, ‘‘২০০৬ সালে লোকবাংলার উদ্যোগে লেখক ও গবেষকদের নিয়ে ‘বাংলাদেশ লোকসংস্কৃতি শনাক্তকরণ ও মূল্যমান নির্ধারণ এবং মেধাস্বত্ব সংরক্ষণ’ শীর্ষক জাতীয় সেমিনারের আয়োজন করা হয়। সেই সেমিনারে মণিপুরি সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তির ওপর আমাকে একটি প্রবন্ধ লেখার দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই প্রবন্ধ লিখতে গিয়েই উপলব্ধি করি–আমাদের মণিপুরি লোকসংস্কৃতির অনেক নিদর্শনই ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে। এগুলো সংগ্রহ ও সংরক্ষণের জন্য প্রচণ্ড তাগিদ অনুভব করি। গ্রামে গ্রামে, পথে-প্রান্তরে ঘুরে ঘুরে একটি একটি করে সংগ্রহ করি এসব সামগ্রী। শুরুতে কেউ পাশে দাঁড়াতে চায়নি। আমি হাল ছাড়িনি। এখন দেশের বাইরে থাকলেও জাদুঘরটি খুব টানে আমাকে। শিগগিরই দেশে ফিরব। জাদুঘর উন্নয়নের বাকি কাজটাও সম্পন্ন করার ভাবনা রয়েছে আমার।’

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সঞ্জয় কৃষ্ণ বিশ্বাস বলেন, ‘একটি জাতিসত্তার পরিচিতির কিছু নির্দেশক থাকে; যার মাধ্যমে তাদের কৃষ্টি, সংস্কৃতিকে বুঝতে পারা যায়। মণিপুরি জনগোষ্ঠীকে নিয়ে গড়ে ওঠা জাদুঘর দেশ-বিদেশে তাদের পরিচিতিকে তুলে ধরতে সহায়তা করবে। একইসঙ্গে তাদের ঐতিহ্যও সুরক্ষা পাবে।’

লেখক: ঐতিহ্য সংগ্রাহক

আরও পড়ুন

×