ঢাকা রোববার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নির্বাচনের আজব দুনিয়া

নির্বাচনের আজব দুনিয়া
×

 রফিকুর রহমান প্রিয়াম

প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:২৭ | আপডেট: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১৮:২২

| প্রিন্ট সংস্করণ

গণতন্ত্র মানেই কি কেবল গম্ভীর বক্তৃতা আর দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দেওয়া? বিশ্ব ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, নির্বাচনের মঞ্চ অনেক সময় সার্কাস বা কমেডি শোর চেয়ে কম কিছু হয় না। মহাকাশ থেকে শুরু করে অ্যান্টার্কটিকার বরফে ঢাকা সমুদ্রসৈকত কিংবা প্রার্থীর তালিকায় বিড়াল ও গণ্ডারের নাম–বিশ্বজুড়ে নির্বাচনের এমন কিছু অদ্ভুত ও মজার ইতিহাস রয়েছে; যা রূপকথাকেও হার মানায়।

পশুপাখির রাজনীতি
মানুষের ওপর বিরক্ত হয়ে ভোটাররা অনেক সময় পশুপাখিকেই তাদের প্রতিনিধি হিসেবে বেছে নিয়েছেন। আলাস্কার টলকিটনা শহরের ভোটাররা ১৯৯৭ সালে কোনো মানুষকেই মেয়র পদের যোগ্য মনে করেননি। ফলে তারা ‘স্টাবস’ নামের একটি বিড়ালকে মেয়র হিসেবে নির্বাচিত করেন। স্টাবস টানা ২০ বছর ওই পদে বহাল ছিল। ক্যালিফোর্নিয়ার ইডিলওয়াইল্ড শহরে শুরু থেকেই গোল্ডেন রিট্রিভার কুকুরদের রাজত্ব। সেখানকার মেয়র ‘ম্যাক্স’ এতটাই জনপ্রিয়, তার মৃত্যুর পর  বংশধররাই সেই পদ সামলাচ্ছে।

তবে সবচেয়ে বড় চমক ছিল ১৯৫৯ সালে ব্রাজিলের সাও পাওলোর নির্বাচনে। শহরের দুর্নীতির ওপর বিরক্ত হয়ে ভোটাররা ‘কাকারেকো’ নামের এক গণ্ডারকে এক লাখ ভোট দিয়ে জয়ী করেন। ভোটারদের স্লোগান ছিল–‘গাধা নির্বাচিত করার চেয়ে গণ্ডার নির্বাচিত করা অনেক ভালো।’ একইরকম ঘটনা ঘটেছিল ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে ১৯৮৮ সালে, যেখানে ‘টিয়াও’ নামের এক শিম্পাঞ্জি মেয়র নির্বাচনে তৃতীয় স্থান দখল করেছিল। এমনকি ইকুয়েডরের একটি শহরে একসময় পায়ের দুর্গন্ধনাশক পাউডার মিউনিসিপাল কাউন্সিলর হিসেবে জয়ী হয়েছিল।

হাস্যরস যখন রাজনৈতিক হাতিয়ার
বিশ্বের অনেক দেশে মজার সব রাজনৈতিক দল রয়েছে, যাদের কাজই হলো প্রচলিত রাজনীতিকে ব্যঙ্গ করা। আইসল্যান্ডের ‘বেস্ট পার্টি’ ২০০৯ সালে ঘোষণা করেছিল– তারা তাদের কোনো নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে না। এই দলের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন কৌতুক অভিনেতা জন গ্নার। মজার বিষয় হলো, মানুষ তাঁকেই মেয়রের আসনে বসিয়ে দেয়। যুক্তরাজ্যের নির্বাচনে ‘লর্ড বাকেটহেড’ এবং ‘কাউন্ট বিনফেস’-এর মতো প্রার্থীদের দেখা যায়, যারা মাথায় বালতি পরে ভোট করতে আসেন। তারা প্রতিশ্রুতি দেন, তারা ক্ষমতায় গেলে মহাকাশ থেকে আসা এলিয়েনদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করবেন। কানাডার ‘রিনোসেরাস পার্টি’ আরও এক ধাপ এগিয়ে। তাদের প্রতিশ্রুতির মধ্যে ছিল–মাধ্যাকর্ষণ আইন বাতিল করা এবং রকি পর্বতমালা ভেঙে ফেলা; যাতে আলবার্টার মানুষ প্রশান্ত মহাসাগরের সূর্যাস্ত দেখতে পায়।

অদ্ভুত ভোট দেওয়ার পদ্ধতি
ভোট দেওয়ার পদ্ধতিও সব জায়গায় এক নয়। আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়ায় নিরক্ষর মানুষের কথা চিন্তা করে মার্বেল দিয়ে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। ভোটাররা তাদের পছন্দের প্রার্থীর ছবি লাগানো ড্রামের ভেতরে মার্বেল ফেলে ভোট দেন। মার্বেলটি ড্রামের ভেতরে একটি ঘণ্টা বা সাইকেলের বেলে আঘাত করে শব্দ তৈরি করে, যা শুনে কর্মকর্তারা নিশ্চিত হন ভোটটি সফলভাবে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে সুইজারল্যান্ডের কিছু অঞ্চলে এখনও হাত তুলে ভোট দেওয়ার প্রাচীন পদ্ধতি চালু আছে। সেখানে ভোটারদের পরিচয়পত্র হিসেবে অনেক সময় তাদের পারিবারিক তলোয়ার প্রদর্শন করতে হয়। প্রাচীন গ্রিসে আবার কাউকে শহর থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার জন্য ভোট হতো। ভোটাররা মাটির ভাঙা টুকরা বা ‘অস্ট্রাকা’তে সেই ব্যক্তির নাম লিখে দিতেন। যে ব্যক্তির নামে সবচেয়ে বেশি ভোট পড়ত, তাঁকে ১০ বছরের জন্য নির্বাসনে যেতে হতো।

আকাশ-পাতাল ও দুর্গম জয়
ভোটের জয়গান পৌঁছে গেছে মহাকাশেও। ১৯৯৭ সালে টেক্সাসে আইন পাস হওয়ার পর থেকে নাসার মহাকাশচারীরা মহাকাশ থেকেই ভোট দিতে পারেন। প্রথম মহাকাশচারী হিসেবে ডেভিড উলফ মির স্পেস স্টেশন থেকে ভোট দিয়েছিলেন। আবার অ্যান্টার্কটিকার গবেষকরাও পিছিয়ে নেই। ২০১৬ সালে তারা মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় বরফের ওপর দাঁড়িয়ে ভোট দিয়েছেন।

ভোটের প্রচারণায় জাপানি প্রার্থীদের সবসময় সাদা গ্লাভস বা দস্তানা পরে থাকতে দেখা যায়। এটি তাদের স্বচ্ছতা ও পরিষ্কার ভাবমূর্তির প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। আবার অস্ট্রেলিয়ায় ভোট দেওয়া বাধ্যতামূলক। সেখানে ভোটকেন্দ্রে ‘ডেমোক্রেসি সসেজ’ বা বারবিকিউ খাওয়ার একটি ঐতিহ্য রয়েছে, যা পুরো দিনটিকে একটি উৎসবের আমেজ দেয়।

সংখ্যা ও পরিসংখ্যানের গোলকধাঁধা
ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত নির্বাচনের রেকর্ডটি লাইবেরিয়ার দখলে। ১৯২৭ সালের নির্বাচনে ভোটার ছিল মাত্র ১৫ হাজার অথচ জয়ী প্রার্থী চার্লস কিং ভোট পেয়েছিলেন দুই লাখ ৩৪ হাজার! এটি গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে সবচেয়ে কলঙ্কিত নির্বাচন হিসেবে নাম লিখিয়েছে। অন্যদিকে, ২০০২ সালে ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন শতভাগ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছিলেন বলে দাবি করা হয়েছিল। রাশিয়ার একটি অঞ্চলে তো একবার ১০০ নয়, বরং ১৪৬ শতাংশ ভোট পড়ার অদ্ভুত খবর পাওয়া গিয়েছিল।

নির্বাচন অনেক সময় ভাগ্যের ওপরও নির্ভর করে। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক রাজ্যে ভোটে টাই হলে কয়েন টস বা লটারির মাধ্যমে জয়ী ঘোষণা করা হয়। এমনকি নিউ মেক্সিকোর একটি শহরে পোকার খেলে মেয়র নির্ধারণের নজিরও রয়েছে।

নির্বাচনের এই বিচিত্র খতিয়ান প্রমাণ করে, রাজনীতি কেবল শাসন করার লড়াই নয়, এটি মানুষের উদ্ভাবনী চিন্তা, বিদ্রোহ এবং অনেক ক্ষেত্রে নির্মল আনন্দের এক বিশাল মঞ্চ। মৃত ব্যক্তি নির্বাচিত হওয়া থেকে শুরু করে মহাকাশে ব্যালট বক্স পাঠানো গণতন্ত্রের এ নাটক চলতেই থাকে। নির্বাচন কেবল জয়-পরাজয় নয়; বরং বিচিত্র নাটকীয়তা ও উৎসবের এক অনন্য সংমিশ্রণ।

আরও পড়ুন

×