মন ভালো রাখার ব্যায়াম
নিয়মিত মেডিটেশন মনকে স্থির এবং প্রশান্ত করে
সুরুয খান
প্রকাশ: ০৭ মার্চ ২০২৬ | ০৭:১১
| প্রিন্ট সংস্করণ
মানুষের মনের সর্বজনীন ব্যায়াম হচ্ছে ধ্যান বা মেডিটেশন। যে কোনো বয়সের মানুষ প্রতিদিনই এটি চর্চা করতে পারেন। মেডিটেশনের ইতিহাস বা চর্চা বহু প্রাচীন। সহজ কথায় এটি হলো মনের ব্যায়াম। মনকে স্থির করার এক ধ্রুপদি পদ্ধতি এবং মন ভালো রাখার অব্যর্থ হাতিয়ার। মনের সুপ্ত শক্তিকে জাগ্রত করে নানা কাজে লাগানোর এটি এক পরীক্ষিত প্রক্রিয়া।
সারাবিশ্বেই এখন মেডিটেশনকে দেখা হয় মনকে প্রশান্ত করে শরীর সুস্থ রাখার এক কার্যকর অনুশীলন হিসেবে, যা বৈজ্ঞানিকভাবেও প্রমাণিত। নিউরো সায়েন্টিস্টদের মতে, নিয়মিত মেডিটেশন মনকে স্থির করে এবং প্রশান্তি আনে। এটি মানুষকে সার্বিকভাবে সচেতন করে তোলে এবং মনোদৈহিক অস্তিত্বের একেবারে গভীর থেকে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সাহায্য করে। মেডিটেশন দেহকোষ ও শারীরবৃত্তীয় কর্মকাণ্ডকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ফলে রোগ নিরাময়ে এটি বিশেষ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশ সরকার ২০২২ সালে মেডিটেশনকে ‘পরিপূরক স্বাস্থ্যসেবা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কারণ রোগ নিরাময়, প্রতিরোধ ও প্রশমনে মেডিটেশনের ভূমিকা এখন চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রমাণিত।
নিয়মিত মেডিটেশন অনুশীলনে মন হয় প্রশান্ত ও অচঞ্চল, স্নায়ুপেশি হয় শিথিল। মন চাপমুক্ত হওয়া এবং দেহের শিথিলায়নের ভেতর দিয়ে কমে যায় মনোদৈহিক রোগের ঝুঁকি। পাশাপাশি বেড়ে যায় রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা। ফলে শারীরিক সুস্থতার পরিমাণও বেড়ে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল স্কুল অব মেডিসিনের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ‘স্মিলো ক্যান্সার হসপিটাল’-এর গবেষক ডা. গ্যারি সোফার এ বিষয়ে চমৎকার একটি কথা বলেছেন। তাঁর মতে, ‘মেডিটেশন যদি কোনো ট্যাবলেট বা ক্যাপসুল হতো, তাহলে প্রত্যেক চিকিৎসক রোগীর প্রেসক্রিপশনে এর কথা লিখে দিতেন।’
শিল্পোন্নত বিশ্বে অনেক আগেই মেডিটেশনকে ‘অল্টারনেটিভ মেডিসিন’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসকদের একটি বড় অংশ এখন প্রেসক্রিপশনে বিভিন্ন রোগের ক্ষেত্রে ওষুধের পাশাপাশি মেডিটেশন চর্চার পরামর্শ দিচ্ছেন। বাংলাদেশেও ২০১৩ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ সম্মিলিতভাবে এক গাইডলাইনে রোগীদের মেডিটেশনে উদ্বুদ্ধ করতে চিকিৎসকদের পরামর্শ দেয়।
শিক্ষার্থীদের জন্য মেডিটেশন এক জাদুকরী সমাধান হতে পারে। মেডিটেশন চর্চায় শিক্ষার্থীদের মনোযোগ, আত্মবিশ্বাস ও আগ্রহ বাড়ে। কমে যায় পরীক্ষাভীতি এবং জীবনের লক্ষ্য হয় সুস্পষ্ট, যা বর্তমান সময়ের ‘জেন-জি’ প্রজন্মের জন্য খুবই জরুরি।
যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপানসহ পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশুদের এখন মেডিটেশন শেখানো হচ্ছে। এ ছাড়া ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ড, হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি, স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়া, ইউনিভার্সিটি অব টরন্টো এবং ইউনিভার্সিটি অব মেলবোর্নের মতো বিশ্বের খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন মেডিটেশন চর্চার মাধ্যমে সুখী হওয়ার পাঠ দিচ্ছে। দেহ-মনের ভালো থাকার মাত্রা বৃদ্ধি পেলে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে পেশা ও পারিবারিক জীবনে। কাজের প্রতি আন্তরিকতা এবং নিজের কাজ সবচেয়ে ভালোভাবে করার প্রত্যয় বাড়ে। ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে যে কোনো পরিস্থিতিতে শান্ত থেকে সবকিছু মোকাবিলা করার সক্ষমতা তৈরি হয়। পারিবারিক জীবনে গৃহিণীদের ধৈর্য ও মমতা বাড়ে; যা সঠিক প্যারেন্টিংয়ের মৌলিক শর্ত। মেডিটেশন পরিবারকে করে সুখী ও সফল। পরিবারকে সুখী করার জন্য মেডিটেশন এখন বহু কাউন্সিলরের আবশ্যকীয় পরামর্শ। কারণ মন সহমর্মী হলে, তখন যে কোনো সম্পর্কই হয়ে ওঠে আরও স্বাভাবিক ও সুন্দর।
এর বাইরে আত্মিক উন্নতির জন্য মেডিটেশনের ভূমিকা বলাই বাহুল্য। নিয়মিত চর্চাকারীরা হয়ে ওঠেন আগের চেয়ে আরও বেশি মানবিক এবং একত্র হন সেবামূলক নানা কাজে।
যে কোনো কাজের জন্য যেমন প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয়, মেডিটেশনের জন্যও নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া আছে। শান্ত কোনো জায়গা বেছে নিতে হবে, যেখানে কোলাহল নেই বা তুলনামূলক কম। মেঝেতে মাদুর বা কার্পেটে কিংবা চেয়ারে বসা যেতে পারে। অন্তত আধাঘণ্টা একইভাবে থাকা যাবে–এমন আরামদায়ক ও স্বাচ্ছন্দ্য ভঙ্গিতে বসতে হবে। চেয়ারে বসলে দুই পায়ের পাতা যেন মেঝেতে সমানভাবে লেগে থাকে। মেরুদণ্ড সোজা রাখতে হবে। দুই হাত হাঁটুর ওপরে রাখতে হবে। সহজ হয়ে বসতে হবে; যেন দেহে কোনো আঁটোসাঁটো ভাব না থাকে। পোশাক ঢিলেঢালা ও আরামদায়ক হলে সবচেয়ে ভালো। তবে যে কোনো সময়, যে কোনো জায়গায় মেডিটেশন করা সম্ভব। এমনকি যানজটে বসেও একজন মানুষ নিজের ভেতরে ডুব দিতে পারেন। এতে অস্থির-চঞ্চল মনটার ওপর এক ধরনের নিয়ন্ত্রণ চলে আসে।
দৈনন্দিন জীবনে নিয়মিত মেডিটেশন চর্চা করেন অনুজীববিজ্ঞানী, লেখক, অনুবাদক, আলোকচিত্রী ও বৌদ্ধভিক্ষু ড. ম্যাথু রিকার্ড। তাঁর আরেকটি পরিচয় তিনি বিশ্বের ‘সবচেয়ে সুখী মানুষ’ হিসেবে পরিচিত। তাঁর ভাষায়, ‘মেডিটেশন স্থায়ী ও অনন্ত সুখের মূল উপাদান।’ মনের যত্ন নিতে প্রতিদিন আধা ঘণ্টা মেডিটেশন চর্চার পরামর্শ দেন তিনি।
- বিষয় :
- মেডিটেশন চর্চা
