চা শ্রমিকের ধূসর জীবনে রং
দুঃখ-কষ্ট, অভাব-অনটন ভুলে বর্ণ ও গোত্রের দেয়াল ভেঙে বৈচিত্র্যময় আয়োজনে চা শ্রমিকরা এক অনাবিল আনন্দে মিলিত হন ফাগুয়া উৎসবে
শিশির কুমার নাথ
প্রকাশ: ০৭ মার্চ ২০২৬ | ০৭:১৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
বসন্ত মানেই প্রকৃতির বর্ণিল সাজ। প্রকৃতির সেই রঙের ছোঁয়া অবধারিতভাবেই এসে লাগে মানুষের মনে। ফাল্গুনের দোলপূর্ণিমায় নানা রঙের ছটায় হঠাৎ করেই যেন রঙিন হয়ে ওঠে চা-শ্রমিক জনগোষ্ঠীর প্রাত্যহিক বিবর্ণ জীবন। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সেই কালজয়ী গানের সুর, ‘পরানে লেগেছে ফাগুয়া...’ যেন এই সময়ে জীবন্ত হয়ে বাজে চা-বাগানের প্রতিটি পাড়ায় পাড়ায়। দৈনন্দিন অভাব-অভিযোগ আর হাড়ভাঙা খাটুনির ক্লান্তি ভুলে প্রায় প্রতিটি বাগানেই হয় রঙের উৎসব–ফাগুয়া।
ফাগুয়া পর্বের এই প্রাণবন্ত আয়োজনে শামিল হতে সকাল বেলাতেই হাজির হয়েছিলাম শ্রীমঙ্গলের রাজঘাট বাগানে। শ্রীমঙ্গল শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে এই বাগান। সঙ্গী হিসেবে ছিলেন সহকর্মী ঝুটন দেব। বাগানের পাড়ায় পাড়ায় ঢুকতেই চোখে পড়ল উৎসবের আসল চিত্র। যাদের সঙ্গেই দেখা হচ্ছে, প্রায় সবার শরীরেই নানা রঙের আবিরের প্রলেপ। কে কাকে কীভাবে রাঙিয়ে দেবে, চলছে তারই মিষ্টি প্রতিযোগিতা। কেউ কেউ আবার প্লাস্টিকের বোতলে যত্ন করে গুলছেন রঙিন জল। আট থেকে আশি বয়সের সব ভেদাভেদ ভুলে, ধনী-গরিবের ব্যবধান ঘুচিয়ে সবাই মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে রঙের এই মহোৎসবে।
বাগানের ভেতরের একটি সরু গলি ধরে এগোতেই কানে ভেসে এলো মাদলের গুরুগম্ভীর ধ্বনি আর গানের মাতাল করা সুর। সেই সুর আর বাদ্যের সূত্র ধরে কয়েক কদম এগোতেই দেখা মিলল আট-দশজনের একটি গানের দলের। তাদের পরিবেশনার কেন্দ্রবিন্দুতে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা। দলেরই দুজন সেজেছেন রাধা ও কৃষ্ণ। সঙ্গে আছেন ললিতা-বিশাখার রূপ ধারণ করা সখিরাও। বাদ্যের তালে তালে চলছে ঐতিহ্যবাহী ‘কাঠিনৃত্য’।
দলের নেতা হঠাৎ ‘জোড় ধর, জোড় ধর’ বলে গানে সুর তুললেন। তাঁর নির্দেশ পাওয়া মাত্রই জোড়ায় জোড়ায় বিভক্ত হয়ে হাতের কাঠি দিয়ে তাল বাজাতে শুরু করলেন নৃত্যশিল্পীরা। প্রত্যেকের হাতে ১৫-২০ ইঞ্চি লম্বা আবির-রাঙানো একটি করে কাঠি। একে অপরের কাঠিতে আঘাত করে অপূর্ব ছন্দে নেচে চলেছেন তারা। গানের তালের সঙ্গে কাঠির ঠকঠক শব্দে এগিয়ে চলছে এই নৃত্যগীত। মাদল, করতাল, বাঁশি আর কাঠির সম্মিলিত ধ্বনিতে যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে চা-জনগোষ্ঠীর আদি আঙিনা।
এই গানগুলোর মূল উপজীব্য শ্রীকৃষ্ণ ও রাধা। ঝুমুর গানের তালেই মূলত পরিবেশিত হয় এগুলো। ছোট ছোট ছন্দে রচিত এই গানগুলো ধীর লয়ে শুরু হয়ে ক্রমশ দ্রুত লয়ে শেষ হয়। প্রেম, বিরহ আর মিলনের চিরন্তন কাহিনির পাশাপাশি এসব গানে খুব সাবলীলভাবেই উঠে আসে শ্রমিক জীবনের রূঢ় বাস্তবতা।
এ বাড়ি থেকে ও বাড়ি, ঝুমুর ঝুমুর শব্দে মেতে ওঠে পুরো পাড়া। উৎসবের এই সুর কোথাও বাজে তিন দিন, কোথাও পাঁচ দিন, আবার কোথাও তারও বেশি সময় ধরে। অর্থাৎ, অন্তত দিন পনেরো ধরে ফাগুয়ার এই উৎসবমুখর আমেজ লেগে থাকে চা-বাগানগুলোতে।
উৎসবের প্রধান আকর্ষণ হিসেবে কাঠিনৃত্যের যে বিপুল জনপ্রিয়তা রয়েছে, তা বাগানে পা রাখলেই বোঝা যায়। প্রায় প্রতিটি দলই এই নৃত্য পরিবেশন করে। কাঠিনাচের এই সংস্কৃতি অত্যন্ত প্রাচীন। গবেষকদের মতে, প্রাচীন রাজা বা জমিদারদের লাঠিয়াল বাহিনীর শারীরিক কসরত থেকেই এই কাঠিনাচের সূত্রপাত। পরবর্তীকালে নানা সম্প্রদায়ের মানুষ এটিকে বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করে এবং নিজেদের সংস্কৃতির নিজস্ব রূপ দান করে। ব্রতচারী আন্দোলনের স্রষ্টা গুরুসদয় দত্তও এই কাঠিনাচকে গভীরভাবে গ্রহণ করেছিলেন। দলবদ্ধভাবে পরিবেশিত এই নাচটি মূলত বীররসাত্মক এবং যথেষ্ট শারীরিক কসরতপূর্ণ।
উৎসবের ফাঁকেই কথা হয় কাঠিনৃত্য দলের মাস্টার ফলিন এবং গায়ক সবিন শুভর সঙ্গে। সবিন শুভ জানান, প্রতিবছরই তাঁরা দল নিয়ে বের হন। বাড়ি বাড়ি ঘুরে গান গেয়ে ‘মাঙন’ (ভিক্ষা বা চাঁদা) তোলেন। সবাই খুশি হয়ে চাল, ডাল বা নগদ অর্থ–যে যা পারে দেয়। দোলপূর্ণিমার দিন থেকে শুরু করে তিন দিন চলবে তাদের এই আয়োজন। তৃতীয় দিনে মন্দিরে রাধা-কৃষ্ণের প্রতীকী মিলন দেওয়া হবে। তখন পাড়ার দশজন বয়োজ্যেষ্ঠ মুরব্বিকে নিমন্ত্রণ করে এনে আশীর্বাদ নেওয়া হবে। মাঙন করে যে অর্থ ও চাল-ডাল উঠবে, তা দিয়ে নিরামিষ ভোজের আয়োজন করা হবে। এর মাধ্যমেই সমাপ্তি ঘটবে এবারের উৎসবের।
বাগানের বাসিন্দা সেলিম বোনার্জী জানালেন ভিন্ন এক স্বস্তির কথা। তিনি বলেন, ‘ফাগুয়া উৎসবের সময় বাগানে ছুটি থাকে। আমাদের এই বাগানেও দুই দিনের ছুটি দেওয়া হয়েছে, সাথে উৎসব ভাতাও (বোনাস) মিলেছে। শারদীয় দুর্গাপূজার পর এটিই চা-বাগানের সবচেয়ে বড় উৎসব। নাচ-গানের পাশাপাশি এখন কয়েক দিন চলবে রংখেলা। সব দুঃখ-কষ্ট, অভাব-অনটন ভুলে, বর্ণ ও গোত্রের দেয়াল ভেঙে সবাই এই অনাবিল আনন্দে শামিল হয়।’
রাজঘাট থেকে ফেরার পথে শ্রীমঙ্গলের সাতগাঁও ইউনিয়নের লছনা এলাকায় দেখা মিলল আরও একটি নাচের দলের। এটি মূলত কিশোরদের একটি দল, সবাই প্রায় সমবয়সী। এই দলের মাস্টার মিঠুন ভক্তা আর গায়ক তপন কর্মকার। সাত বছর ধরে ফাগুয়া উৎসবে নিয়মিত নৃত্যগীত পরিবেশন করে আসছে তারা। নাম ভিন্ন হলেও এর মূলসুর একটাই–রঙের উৎসব। ‘ফাগ’ শব্দের অর্থ আবির। প্রচুর আবিরের ব্যবহার হয় বলেই এর নাম ফাগুয়া। চা-শ্রমিকরা পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভক্তি ও ভালোবাসা বজায় রেখে একে অপরকে আবিরে রাঙিয়ে এই ফাল্গুনী পূর্ণিমার উৎসব উদযাপন করেন। তবে আধুনিকতার ছোঁয়ায় এই প্রাচীন ঐতিহ্যেও এখন কিছুটা ভাটার টান। এ প্রসঙ্গে স্থানীয় স্কুলশিক্ষক শিপুল বোনার্জী আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘একসময় ঝুমুর নৃত্য, হাঁড়িনৃত্য, পালানৃত্য, হোলিগীত প্রভৃতি এই উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, এর অনেক কিছুই এখন কালের গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে, নিজস্বতা হারাচ্ছে। চা-শ্রমিক জনগোষ্ঠীর নিজস্ব কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও শিকড়কে বাঁচিয়ে রাখাটা এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।’
তাঁর কথার সূত্র ধরেই বলতে হয়–আধুনিকতার আগ্রাসন থেকে রক্ষা পাক বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির বহমান ধারা। হাজার বছরের শিকড় আঁকড়ে বেঁচে থাকুক লোকজ ঐতিহ্য। বেঁচে থাকুক ফাগুয়ার মতো সরল ও নিষ্পাপ আনন্দগুলো।
লেখক: ঐতিহ্য সংগ্রাহক
- বিষয় :
- উৎসব মণ্ডল
