ঢাকা সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬

জ্বালানির খোঁজে থমকে থাকা নগরী

জ্বালানির খোঁজে থমকে থাকা নগরী
×

পাম্পের সামনে জ্বালানি পাওয়ার দীর্ঘ লাইন, যানজট ও গরমের অস্বস্তি। সব মিলিয়ে রাজধানীর প্রতিটি সড়ক যেন থমকে থাকা জীবনের প্রতিচ্ছবি। ছবি:: মামুনুর রশিদ

আশরাফুল ইসলাম আকাশ

প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:০২ | আপডেট: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ | ২০:১২

| প্রিন্ট সংস্করণ

সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা। কাঁটাবন মোড় থেকে শুরু হওয়া মোটরসাইকেল আর কার-মাইক্রোবাসের দীর্ঘ সারি যেন এক স্থিরচিত্রে পরিণত হয়েছে। ২০-২৫ মিনিট পেরিয়ে গেলেও চাকার কোনো নড়াচড়া নেই। ক্লান্তিকর এই অপেক্ষার একঘেয়েমি কাটাতে চালকদের অনেকেই বাধ্য হয়ে বাইকের ইঞ্জিন বন্ধ করে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে খোশগল্পে মজেছেন। এই দৃশ্য কেবল একটি নির্দিষ্ট সড়কের নয়, বরং গত কয়েকদিন ধরে রাজধানী ঢাকার সন্ধ্যার নিয়মিত চালচিত্র।

কার বা মাইক্রোবাসের যাত্রীদের অবস্থাও তথৈবচ। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়ির ভেতরে বসেও অপেক্ষার প্রহর যেন ফুরোতে চায় না। দীর্ঘ দেড় ঘণ্টা ধরে একই জায়গায় আটকে থাকা একটি দলের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল তাদের বহুমুখী বিরক্তির কথা। একদিকে যানজট ও গরমের অস্বস্তি, অন্যদিকে পাম্প থেকে কাঙ্ক্ষিত জ্বালানি পাওয়ার অনিশ্চয়তা। এই পরিস্থিতির জন্য কেউ দুষছেন মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে, আবার কেউবা সরাসরি আঙুল তুলছেন সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অব্যবস্থাপনার দিকে।

বুধবার সন্ধ্যায় রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডের ‘রহমান অ্যান্ড কোং’ ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায় এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। তেলের জন্য অপেক্ষমাণ যানবাহনের কারণে মূল সড়কের অর্ধেকের বেশি বেদখল হয়ে গেছে। পাম্পের এক সহকারীর ভাষ্যমতে, দিনভর নিরবচ্ছিন্ন সেবা দেওয়ার পরও অফিস ছুটির পর যে বিপুল চাপ তৈরি হয়, তা সামলানো রীতিমতো অসাধ্য হয়ে পড়েছে। মূলত সন্ধ্যার পর সেই অতিরিক্ত চাপই দীর্ঘ লাইনে রূপান্তরিত হচ্ছে।

প্রতিষ্ঠানটির সহকারী ব্যবস্থাপক আলামিন অবশ্য ভিন্ন এক সংকটের কথা তুলে ধরলেন। তাঁর মতে, দেশে জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি নেই। চাহিদার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি তেল এনে সরবরাহ করা হচ্ছে। কিন্তু একসঙ্গে এত যানবাহনকে সেবা প্রদান করাটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এই ‘চ্যালেঞ্জ’-এর নেপথ্যের কারণ নিয়ে এর বেশি কোনো মন্তব্য করতে তিনি রাজি হননি।

একই বিভীষিকাময় চিত্র মহাখালীর আমতলীর দুটি ফিলিং স্টেশনেও। বৃহস্পতিবার ভোরে সরকারি তিতুমীর কলেজের বিপরীত পাশের গলি থেকে শুরু হওয়া লাইন গিয়ে ঠেকেছে আমতলী মোড় পর্যন্ত। সুশৃঙ্খলভাবে দুটি লাইন তৈরি হয়েছে–একটিতে কার, মাইক্রোবাস ও কাভার্ড ভ্যান, অন্যটিতে কেবলই মোটরসাইকেল। মহাখালী-গুলশানের মতো রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কে তেলের পাম্পের এই লাইনের কারণে দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থেকে অবর্ণনীয় ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ যাত্রীরা।

সড়কে বাইক রেখে বটতলার একটি চায়ের দোকানে বসে অপেক্ষা করছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী হাফিজুর রহমান। হতাশামাখা কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করছি। কিছুক্ষণ আগে টোকেন পেয়েছি ঠিকই। এখনও তেল দেওয়া শুরু হয়নি। কখন পাব, তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই বাইক লাইনে রেখেই এখানে বসে একটু জিরিয়ে নিচ্ছি।’

পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মহাখালীতে কর্মরত অনেক পেশাজীবী এখন পাম্পে অস্থায়ীভাবে সিরিয়াল দিয়ে দিনের অন্যান্য কাজ সারছেন। অফিস শেষে নির্ধারিত সময়ে এসে লাইন থেকে তেল সংগ্রহ করছেন তারা। এটি যেন নাগরিক জীবনের নতুন এক রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জ্বালানি তেলের এই হাহাকার নিয়ে সরকার ও সাধারণ মানুষের বোঝাপড়ায় বিস্তর ফারাক দেখা যাচ্ছে। জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, দেশে জ্বালানি সরবরাহ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে এবং মজুতের কোনো ঘাটতি নেই। তাঁর মতে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় একটি সাময়িক চাপ তৈরি হয়েছে।

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির জানান, বিশ্ববাজারে তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থায় কিছুটা ধীরগতি দেখা দিয়েছে, যার প্রভাব পড়ছে শহরের পাম্পগুলোতে। তবে এটি কোনো দীর্ঘমেয়াদি সংকট নয় বলে তিনি দাবি করেন। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মতে, বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তেলের মজুত নয়, বরং জনমনে তৈরি হওয়া ‘মনস্তাত্ত্বিক সংকট’ বা আতঙ্ক।

তবে সরকারি আশ্বাসের আড়ালে একটি বড় কাঠামোগত সংকটের কথাও সামনে এসেছে। ক্রুড অয়েল বা অপরিশোধিত তেলের সংকটে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগার ‘ইস্টার্ন রিফাইনারি’-তে উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। যদিও জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিকল্প উৎস থেকে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি জোরদার করার মাধ্যমে এই শূন্যতা পূরণ করা হচ্ছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার সীমিত পরিসরে ‘ফুয়েল পাস’ বা নির্ধারিত কোটাভিত্তিক জ্বালানি বিতরণ ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেয়। নীতিনির্ধারকদের ধারণা ছিল, এই ডিজিটাল পাসের মাধ্যমে পাম্পে অতিরিক্ত চাপ কমবে এবং যানজট নিয়ন্ত্রণে আসবে। বাস্তবে সার্ভার জটিলতা ও কারিগরি ত্রুটির কারণে এই উদ্যোগ উল্টো ভোগান্তি বাড়িয়েছে। অনেকেই দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েও সার্ভার ডাউন থাকার কারণে তেল না নিয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।

আতঙ্ক আর অব্যবস্থাপনার সবচেয়ে কুৎসিত রূপটি দেখা যাচ্ছে কালোবাজারে। অনেকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত জ্বালানি সংগ্রহ করে খোলা বাজারে চড়া দামে বিক্রি করছেন। সুযোগ বুঝে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী প্রতি লিটার তেল ১৮০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি করে মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগ নিচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও বিতরণ ব্যবস্থার চরম দুর্বলতাই বর্তমান পরিস্থিতির জন্য দায়ী। অপরিকল্পিতভাবে তেল বিতরণের কারণেই শহরের সড়ক ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়ছে।

আরও পড়ুন

×