জ্বালানি সংকট কোন দেশ কীভাবে সামাল দিচ্ছে
রফিকুর রহমান প্রিয়াম
প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ | ২০:৪৬
২০২৬ সালের ‘হরমুজ সংকট’ বিশ্ব অর্থনীতিকে এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ হওয়ার ফলে বৈশ্বিক তেল ও এলএনজি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ বন্ধ হয়ে গেছে। এ পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দেশ বিভিন্নভাবে সংকট মোকাবিলা করছে।
এ সংকট মোকাবিলায় তাদের বিশাল কৌশলগত তেলের মজুত ব্যবহারের মাধ্যমে নেতৃত্ব দিচ্ছে। মার্চ মাসে ৪৫ দিনের তেল ছাড়ার পর প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ২০২৬ সালের মে মাস থেকে আরও ২০ দিনের (প্রায় ৩৬ মিলিয়ন ব্যারেল) রিজার্ভ ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এ ছাড়া জাপান তাদের আমদানির অর্ধেক হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে বিকল্প রুটে আনার চেষ্টা করছে।
তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে ভারতে বিদ্যুতের চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়েছে, যখন বিশ্বজুড়ে জ্বালানির তীব্র সংকট চলছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার পেট্রোল-ডিজেলের কর কমিয়েছে, খুচরা মুনাফা সীমিত করেছে এবং এলপিজি রেশনিং করছে। এ ছাড়া জ্বালানি রপ্তানিতে নতুন কর আরোপ করে তারা পশ্চিম আফ্রিকা থেকে বিকল্প তেল সংগ্রহ করছে।
অন্যদিকে, পাকিস্তান চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশটি তাদের জ্বালানির ৮৫ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে আমদানি করে। এপ্রিলে পাকিস্তানে পেট্রোলের দাম লিটারপ্রতি ৪৫৮.৪১ রুপি এবং ডিজেলের দাম ৫২০.৩৫ রুপিতে পৌঁছেছে। আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে সরকার পাম্পে তেল রেশনিং করার কথা ভাবছে।
মালয়েশিয়া তাদের বিশাল ভর্তুকি বিল নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। এপ্রিল মাসে দেশটির জ্বালানি ভর্তুকি বিল ১০ গুণ বেড়ে সাত বিলিয়ন রিঙ্গিতে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তারা লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি ব্যবস্থা এবং উচ্চতর বায়োডিজেল ব্যবহার শুরু করেছে। হিমালয় অঞ্চলের দেশ নেপাল ও ভুটান ‘পারিবারিক সংকটের’ মুখে পড়েছে। নেপালের অর্থনীতি রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল, যা মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ভুটানে তেলের দাম ৬০ শতাংশ বেড়েছে এবং সরকার নাগরিকদের পায়ে হেঁটে অফিসে যাওয়ার বা ঘরে বসে কাজ করার পরামর্শ দিয়েছে।
তুরস্ক এই সংকটে মুদ্রাস্ফীতির একটি নতুন চক্রে প্রবেশ করেছে। এপ্রিল মাসে দেশটি গৃহস্থালি পর্যায়ে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে। ওইসিডি পূর্বাভাস দিয়েছে যে ২০২৬ সালে তুরস্কের মুদ্রাস্ফীতি ২৬.৭ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
আফ্রিকায় মরক্কো তাদের ৯০ শতাংশ জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতার কারণে অত্যন্ত ঝুঁকিতে রয়েছে। তাদের কৌশলগত মজুত বর্তমানে ৫১ দিনের ডিজেল এবং ৫৫ দিনের পেট্রোলের জন্য পর্যাপ্ত। তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলার ছাড়িয়ে গেলে মরক্কো আইএমএফ থেকে ৪.৫ বিলিয়ন ডলারের জরুরি ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে।
যুক্তরাষ্ট্র বিশাল উৎপাদনকারী হওয়া সত্ত্বেও পাম্পে তেলের দাম প্রতি গ্যালন ৫ ডলারে পৌঁছেছে। দেশটির কৌশলগত মজুত বর্তমানে ৩৪৫ মিলিয়ন ব্যারেলে নেমে এসেছে, যা আগের বছরগুলোর তুলনায় বেশ কম।
ব্রাজিল একটি ভিন্ন কৌশল গ্রহণ করেছে। দেশটি আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ দামের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। সরকার অপরিশোধিত তেল রপ্তানির ওপর ১২ শতাংশ ট্যাক্স আরোপ করেছে, যাতে সেই অর্থ দিয়ে অভ্যন্তরীণ বাজারের ভর্তুকি নিশ্চিত করা যায়। ওশেনিয়া অঞ্চলে অস্ট্রেলিয়া তাদের মজুত থেকে ৭৬২ মিলিয়ন লিটার ডিজেল বাজারে ছেড়েছে এবং তেলের ওপর আবগারি শুল্ক অর্ধেক করে দিয়েছে।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এই বৈশ্বিক সংকট থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু শিক্ষা রয়েছে–
১. কৌশলগত মজুত গড়ে তোলা: জাপানের মতো বাংলাদেশকে অন্তত ৯০ দিনের জ্বালানি মজুত নিশ্চিত করতে হবে, যা আপৎকালীন সময়ে সরবরাহ সচল রাখতে সাহায্য করবে।
২. লক্ষ্যভিত্তিক ডিজিটাল ভর্তুকি: মালয়েশিয়ার মতো ঢালাও ভর্তুকি না দিয়ে ডিজিটাল আইডির মাধ্যমে কেবল নিম্ন আয়ের মানুষকে সরাসরি আর্থিক সহায়তা বা ভর্তুকি প্রদান করা উচিত।
৩. আর্থিক হেজিং: পাকিস্তান ও মরক্কোর প্রস্তাবিত কৌশলের মতো বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের অস্থিরতা মোকাবিলায় আগেভাগে দাম নির্ধারণ বা ‘হেজিং’ চুক্তি করার কথা ভাবতে হবে।
৪. কৃষিকে জ্বালানি নির্ভরতা থেকে মুক্ত করা: বৈশ্বিক সারের ৩০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসে। তাই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সার আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময় করা এবং সৌরবিদ্যুৎ চালিত সেচ ব্যবস্থার প্রসারে জোর দিতে হবে।
২০২৬ সালের এই তেল সংকট প্রমাণ করে যে জ্বালানি নিরাপত্তা এখন কেবল অর্থনৈতিক বিষয় নয়, বরং এটি জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও অস্তিত্বের লড়াই।
- বিষয় :
- রফিকুর রহমান প্রিয়াম
- জ্বালানি সংকট