পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তার নতুন সমীকরণ
রফিকুর রহমান প্রিয়াম
প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৬ | ০৬:৫৯ | আপডেট: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ | ১১:৫২
| প্রিন্ট সংস্করণ
কয়েক দশক ধরে ‘পারমাণবিক বিপর্যয়’ শব্দবন্ধটি শুনলেই বিশ্ববাসীর চোখের সামনে ভেসে উঠত ১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিল সংঘটিত চেরনোবিলের সেই ভয়াবহ চিত্র। দীর্ঘস্থায়ী সুরক্ষার জন্য ধ্বংসপ্রাপ্ত সেই চুল্লিটির ওপর ফরাসি প্রতিষ্ঠান ভিন্সি এবং বুইগেসের সহায়তায় নির্মাণ করা হয় ‘নিউ সেফ কনফাইনমেন্ট’ (এনএসএফ) নামের একটি সুবিশাল ইস্পাত ও কংক্রিটের আচ্ছাদন। বিগত দশকগুলোয় মানুষের পদচারণা না থাকায় চেরনোবিলের বিশাল ‘এক্সক্লুশন জোন’ ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছিল। স্পেনের ওভিয়েদো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, সেখানকার ব্যাঙগুলোর ওপর বর্তমান বিকিরণ মাত্রা খুব একটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে না। প্রকৃতি যেন নিজের ক্ষত নিজেই সারিয়ে তুলছিল।
কিন্তু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ডামাডোলে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে একটি ড্রোন হামলায় চেরনোবিলের সেই ২.১ বিলিয়ন ইউরোর আচ্ছাদনটি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং আগুন ধরে যায়। যদিও এতে বড় ধরনের তেজস্ক্রিয়তা ছড়ায়নি, তবে কাঠামোটির দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা বড় হুমকির মুখে পড়ে। ইউক্রেন সরকার ২০২৬ সালের বাজেটে এর মেরামতের জন্য প্রায় ৩৭ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করেছে।
ইউক্রেনের চেয়েও ভয়াবহ ও নজিরবিহীন এক পারমাণবিক উত্তেজনার সূচনা হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে। আন্তর্জাতিক যুদ্ধনীতিতে ‘পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা না করার’ যে একটি অলিখিত বৈশ্বিক রীতি ছিল, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের আগ্রাসনে তা পুরোপুরি ধূলিসাৎ হয়ে গেছে।
২০২৫ সালের ২২ জুন ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’ নামে এক সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি থেকে উড়ে আসা ৭টি বি-২ স্টিলথ বোমারু বিমান ইরানের ফোরদো এবং নাতাঞ্জ পারমাণবিক কেন্দ্রে আঘাত হানে।
এর রেশ কাটতে না কাটতেই ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের নতুন আগ্রাসন ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’। তবে বর্তমানে সবচেয়ে বড় আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে ইরানের বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। পারস্য উপসাগরের একেবারে তীরঘেঁষে অবস্থিত এই কেন্দ্রটিতে রাশিয়ার নকশা করা ভিভিইআর-১০০০ রিয়্যাক্টর রয়েছে। চলমান যুদ্ধে এই কেন্দ্রটি আক্ষরিক অর্থেই যুদ্ধক্ষেত্রের মাঝখানে পড়ে গেছে। ২০২৬ সালের ৪ এপ্রিল একটি ক্ষেপণাস্ত্র বুশেহর রিয়্যাক্টরের মাত্র ৩৫০ মিটার দূরে আঘাত হানে, যাতে একজন নিরাপত্তাকর্মী নিহত হন এবং একটি ভবনের ব্যাপক ক্ষতি হয়।
পারমাণবিক বিশেষজ্ঞদের সবচেয়ে বড় ভয়ের জায়গা মূল রিয়্যাক্টর নয়, বরং এই কেন্দ্রের ‘স্পেন্ট ফুয়েল পুল’ বা ব্যবহৃত জ্বালানি সংরক্ষণের জলাধারগুলো। রিয়্যাক্টরের ওপর সুরক্ষামূলক কংক্রিটের গম্বুজ থাকলেও পুলগুলোর ছাদ সাধারণত অতটা মজবুত হয় না। এই পুলগুলোয় প্রচুর পরিমাণে তেজস্ক্রিয় সিজিয়াম-১৩৭ জমা রয়েছে; যার মোট পরিমাণ ১৯৮৬ সালে চেরনোবিল থেকে নির্গত তেজস্ক্রিয়তার চেয়েও কয়েকগুণ বেশি।
বুশেহরে কোনো পারমাণবিক দুর্ঘটনা ঘটলে তার সবচেয়ে ভয়াবহ ও সরাসরি শিকার হবে উপসাগরীয় আরব দেশগুলো–সৌদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার এবং বাহরাইন। এই দেশগুলো তাদের পানীয় জলের জন্য প্রায় ৪০০টি ‘ডিস্যালিনেশন প্লান্ট’ বা সমুদ্রের জল লবণমুক্তকরণ কেন্দ্রের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রায় ১০ কোটি মানুষ প্রতিদিন এই প্লান্টগুলো থেকে আসা পানি পান করে বেঁচে আছে। কুয়েতের পানীয় জলের ৯০ শতাংশ, ওমানের ৮৬ শতাংশ এবং সৌদি আরবের উপকূলীয় এলাকার প্রায় পুরোটাই আসে এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। আধুনিক মেরিন মডেলিং অনুযায়ী, বুশেহর থেকে সিজিয়াম-১৩৭ লিক হলে পারস্য উপসাগরের স্বাভাবিক স্রোত সেই তেজস্ক্রিয় পদার্থকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে সরাসরি আরব দেশগুলোর উপকূলে। কয়েক মাসের মধ্যে এই তেজস্ক্রিয়তা সৌদি আরবের জুবাইল এবং রাস আল-খাইরের মতো বিশ্বের বৃহত্তম ডিস্যালিনেশন প্লান্টগুলোর ইনটেক পাইপে পৌঁছে যাবে। ডিস্যালিনেশন পদ্ধতি সমুদ্রের লবণ দূর করতে পারলেও, পারমাণবিক আইসোটোপ ফিল্টার করতে সক্ষম নয়। উল্টো পানি শোধন করার পর যে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য তৈরি হয়, তা ব্যাপক তেজস্ক্রিয় রূপ ধারণ করবে। এর ফলে দেখা দিতে পারে এক অকল্পনীয় মানবিক বিপর্যয়।
