ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অতীত সংরক্ষণ ও ভবিষ্যতের পথপ্রদর্শক

অতীত সংরক্ষণ ও ভবিষ্যতের পথপ্রদর্শক
×

লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম

 রফিকুর রহমান প্রিয়াম

প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬ | ০৭:১৪ | আপডেট: ১৯ মে ২০২৬ | ১৭:৩৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

সাংস্কৃতিক ও বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে জাদুঘরের ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অব মিউজিয়ামস ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবসের ১৮ মে প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে ‘বিভক্ত বিশ্বকে একজোট করছে জাদুঘর’। ২০২৬ সালটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এই বছর ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অব মিউজিয়ামস তাদের ৮০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করবে। এ প্রতিপাদ্যটি সরাসরি জাতিসংঘের তিনটি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত–টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ১০ (বৈষম্য হ্রাস), ১৬ (শান্তি ও ন্যায়বিচার) এবং ১৭ (লক্ষ্য অর্জনে অংশীদারিত্ব)।

আধুনিক জাদুঘরগুলো রূপান্তরিত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন রোধ এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষার একেকটি সক্রিয় গবেষণাকেন্দ্রে। এর সবচেয়ে বৃহৎ এবং সফল উদাহরণ হলো লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম বা প্রাকৃতিক ইতিহাস জাদুঘর। ২০২৫ সালে প্রায় ৭১ লাখেরও বেশি দর্শনার্থী এই জাদুঘর পরিদর্শন করেছেন। ৪.৫৬ বিলিয়ন বছরের পুরোনো প্রায় আট কোটি বৈজ্ঞানিক নিদর্শনে সমৃদ্ধ এ প্রতিষ্ঠানটি কেবল অতীতকেই সংরক্ষণ করছে না, বরং ভবিষ্যৎ পৃথিবীকে বাঁচানোর পথও দেখাচ্ছে।

মানুষের অবিমৃষ্যকারিতায় হারিয়ে যাওয়া অনেক প্রাণীর শেষ আশ্রয়স্থল এ জাদুঘর। এখানে সংরক্ষিত আছে প্রায় দুই হাজার এমন প্রাণীর নমুনা, যারা আজ পৃথিবীতে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত অথবা সংকটাপন্ন। মরিশাস দ্বীপের ডোডো পাখি কিংবা উত্তর আটলান্টিকের গ্রেট অক–এ সবই মানুষের নির্বিচার শিকারের ফলে পৃথিবী থেকে চিরতরে হারিয়ে গেছে।

জাদুঘরে সংরক্ষিত একটি গ্রেট অকের পালক থেকে জিনগত উপাদান বা ডিএনএ নিয়ে বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন, ষোলো শতক  মানুষ যখন এদের নির্বিচারে শিকার শুরু করে, তার আগে এই পাখিদের বংশবৃদ্ধি ও স্বাস্থ্যগত অবস্থা একেবারেই স্বাভাবিক ছিল। অর্থাৎ এদের বিলুপ্তির একক দায় মানুষের। অন্যদিকে স্পিক্স ম্যাকাওয়ের মতো প্রাণী, যারা বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্ত থেকে ফিরে এসেছে, তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণামূলক গল্পও এই জাদুঘর সযত্নে তুলে ধরে। জাদুঘরের প্রধান হলে আগে যেখানে ডাইনোসরের কঙ্কাল ‘ডিপি’ স্থান পেত, সেখানে এখন শোভা পাচ্ছে একটি বিশাল নীল তিমির কঙ্কাল ‘হোপ’ বা ‘আশা’। এটি দর্শনার্থীদের স্মরণ করিয়ে দেয়, মানুষের পক্ষে যেমন প্রকৃতিকে ধ্বংস করা সম্ভব, তেমনি সদিচ্ছা, বিজ্ঞান ও সুনির্দিষ্ট প্রচেষ্টার মাধ্যমে তাকে বাঁচানোও সম্ভব।

বিলুপ্ত ডোডো পাখি

জাদুঘরের বৈজ্ঞানিক গবেষণার এক বিশাল অংশ সম্পন্ন হয় লোকচক্ষুর অন্তরালে। এখানকার অত্যাধুনিক ‘ডারউইন সেন্টার’ এবং ‘স্পিরিট কালেকশন’-এ প্রায় দুই কোটি ২০ লাখ প্রাণী তরল রাসায়নিকে সংরক্ষিত আছে। এর মধ্যে বিবর্তনবাদের জনক চার্লস ডারউইনের নিজ হাতে সংগ্রহ করা অমূল্য নমুনাও রয়েছে।

তবে আধুনিক জিনোমিক বা জিনগত গবেষণার জন্য শত বছরের পুরোনো এ পদ্ধতিগুলো বর্তমানে অপর্যাপ্ত। তাই জাদুঘরটি এখন ‘ক্রায়ো-আর্কস’ কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে অতি-নিম্ন তাপমাত্রায় (-১৯৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস) প্রাণীদের ডিএনএ সংরক্ষণ করছে। এই গভীর-হিমায়িত জৈব-সংরক্ষণ বা ‘ডিপ-ক্রায়োজেনিক বায়োব্যাংকিং’ ব্যবস্থার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারছেন কেন ‘নেকড মোল-র‍্যাট’-এর মতো কিছু প্রাণী ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে সক্ষম, যা ভবিষ্যতে মানুষের চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক যুগান্তকারী ভূমিকা রাখতে পারে।

এই সুবিশাল সংগ্রহকে কেবল লন্ডনের চার দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ না রেখে, জাদুঘর কর্তৃপক্ষ তাদের আট কোটি নমুনা সম্পূর্ণ ডিজিটাল মাধ্যমে রূপান্তরের এক বিশাল কর্মযজ্ঞ হাতে নিয়েছে। গ্লোবাল বায়োডাইভার্সিটি ইনফরমেশন ফ্যাসিলিটির মাধ্যমে এই তথ্যভান্ডার সারাবিশ্বের বিজ্ঞানীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হচ্ছে।
তাছাড়া অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেসের সঙ্গে যুক্ত হয়ে জাদুঘর তাদের বাগানে উন্নত সংবেদক বা সেন্সর স্থাপন করেছে, যা তাৎক্ষণিকভাবে পরিবেশের তথ্য এবং পরিবেশগত ডিএনএ সংগ্রহ করে। এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন শহরের জীববৈচিত্র্য কীভাবে প্রতিনিয়ত দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছে।

জাদুঘরগুলো আজ কেবল অতীত সংরক্ষণের নিশ্চল জায়গা নয়, সামাজিক মেরূকরণ ও সংঘাতময় এ পৃথিবীতে এগুলো হয়ে উঠেছে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, গঠনমূলক সংলাপ এবং ঐক্যের এক বিশ্বস্ত আশ্রয়স্থল।

আরও পড়ুন

×