ঢাকা শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

যে পা লিখছে জীবনজয়ের আখ্যান

যে পা লিখছে জীবনজয়ের আখ্যান
×

মো. আলী

 মুহাম্মদ শফিকুর রহমান

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩২

| প্রিন্ট সংস্করণ

দুরন্ত শৈশবে অন্য শিশুরা যখন হাত ধরাধরি করে ছুটে বেড়াত, ছোট্ট আলী তখন দূর থেকে কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেলতেন। জন্ম থেকে তাঁর দুটি হাত নেই, তাই বন্ধুদের খেলায় শরিক হওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। মনের গহিনে জমে উঠত তীব্র এক শূন্যতা। নিয়তির এই বঞ্চনা তাঁর জীবনের গল্পটাকে সেখানে থামিয়ে দেয়নি। হতাশার ঘোর অমানিশা পেরিয়ে দুই পা-ই হয়ে উঠেছে তাঁর বেঁচে থাকার, স্বপ্ন দেখার এবং তা বাস্তবায়নের প্রধান হাতিয়ার। দুই পায়ের আঙুলে তিনি বুঝতে শিখেছেন জীবনকে।
চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার দুর্গম হরিদাঘোনা গ্রামে মো. আলীর জন্ম। বাবা আমিন শরীফ ও মা সামশুন নাহারের চার সন্তানের মধ্যে সবার ছোট তিনি। শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে পরিবার, বিশেষ করে তাঁর মাকে সমাজের নানা গঞ্জনা ও কটু কথা শুনতে হয়েছে। অক্ষরজ্ঞানহীন মা সামশুন নাহার অন্তরে ধারণ করেছিলেন এক সুগভীর প্রজ্ঞা–যেভাবেই হোক ছেলেকে স্বাবলম্বী করতে হবে, সমাজের বোঝা হতে দেওয়া যাবে না।
মায়ের এই অটুট বিশ্বাস আর অবিরাম অনুপ্রেরণায় আলী তাঁর পা দুটিকে হাতের বিকল্প হিসেবে গড়ে তোলার সংগ্রাম শুরু করেন। শুরুর দিকে পায়ে প্রচণ্ড ব্যথা হতো, তবু হাল ছাড়েননি। দীর্ঘ দুই বছরের নিরলস চেষ্টায় তিনি আয়ত্ত করেন পায়ে লেখার কৌশল। প্রতিদিনের প্রাতরাশ থেকে শুরু করে পরীক্ষার খাতায় দ্রুতগতিতে উত্তর লেখা–সবই তিনি করতে শুরু করেন দুই পায়ের নিপুণ দক্ষতায়।
পড়াশোনার প্রতি আলীর ছিল প্রবল ঝোঁক। শারীরিক প্রতিবন্ধকতার অজুহাতে প্রথমদিকে কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় তাঁকে ভর্তি করাতে রাজি হয়নি। সেই অন্ধকার সময়ে আশার আলো হয়ে আসেন উত্তর বড়হাতিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান। আলীর পায়ে লেখা দেখে মুগ্ধ হয়ে তিনি সব বাধা উপেক্ষা করে তাঁকে স্কুলে ভর্তি করে নেন।
এরপর আলীকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। সেনেরহাট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং সাতকানিয়া সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন তিনি। এরপর ভর্তি হন চট্টগ্রাম সিটি কলেজে। সেখান থেকে ব্যবস্থাপনা বিভাগে এমবিএ সম্পন্ন করেছেন। শুধু পুঁথিগত বিদ্যা নয়, নিজেকে যুগের সঙ্গে মানানসই করতে এক বড় ভাইয়ের উপহার দেওয়া কম্পিউটার পায়ে চালিয়ে তিনি আয়ত্ত করেছেন এমএস ওয়ার্ড ও এক্সেলের মতো প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত কাজ।
শিক্ষাজীবন শেষে আলী এখন স্বপ্ন দেখেন একটি সম্মানজনক চাকরির। নিজের উপার্জনে বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটানোর। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের অন্যতম শর্ত হলো ‘কাউকে পেছনে ফেলে না রাখা’। অথচ আলীর মতো উচ্চশিক্ষিত এবং দক্ষ তরুণ যখন চাকরির বাজারে উপেক্ষিত হন, তখন সমাজের অন্তর্ভুক্তি নীতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
ইতোমধ্যে সমাজসেবা, স্বাস্থ্য, খাদ্য ও সমবায় অধিদপ্তরসহ একাধিক সরকারি-বেসরকারি দপ্তরে চাকরির আবেদন করেছেন আলী। স্থানীয় সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদেরও সহযোগিতা চেয়েছেন। মিলেছে কেবল আশ্বাস, মেলেনি কোনো কর্মসংস্থান।
আক্ষেপের সুরে আলী বলেন, ‘এত কষ্ট করে আজ এ পর্যন্ত এসেছি। এখন শুধু বাবা-মাকে নিয়ে সম্মানজনকভাবে বাঁচার জন্য একটি চাকরি চাই। প্রতিযোগিতামূলক এই বাজারে যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েও আমি সুযোগ পাচ্ছি না। আর কত বছর অন্যের বোঝা হয়ে থাকব?’
আলীর মা সামশুন নাহার বলেন, ‘যে ছেলেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে আমাকে ঘাম ছোটাতে হয়েছে, সে আজ পায়ে লিখে এত বড় ডিগ্রি নিয়েছে। কিন্তু একটা চাকরির জন্য মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরছে, এটা মা হিসেবে সহ্য করা খুব কষ্টের।’
আলীর এই সংগ্রামের কথা অজানা নয় স্থানীয় প্রশাসনেরও। লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. বায়েজিদ বিন আখন্দ বলেন, ‘আলী প্রতিবন্ধিতাকে জয় করে সফল হয়েছেন। তাঁর গল্প যে কাউকে অনুপ্রাণিত করবে। তাঁকে স্বাবলম্বী করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করব।’
বর্তমানে উপজেলা সমাজসেবা অফিস থেকে প্রতিবন্ধী ভাতা এবং চিত্তরঞ্জন মেমোরিয়াল ট্রাস্ট থেকে শিক্ষাবৃত্তি পান আলী। তবে লোহাগাড়া উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা রিদুয়ানুল করিম জানান, তাদের দপ্তরে আলীর মতো শিক্ষিত প্রতিবন্ধীদের সরাসরি চাকরি দেওয়ার কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা নেই।
চট্টগ্রাম সিটি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষক এডিসন কান্তি দে বলেছেন, ‘কারও সহযোগিতা ছাড়া কেবল পায়ে লিখে এমবিএ পাস করা এক অকল্পনীয় ব্যাপার। রাষ্ট্রের উচিত এ ধরনের সফল মানুষদের পাশে দাঁড়ানো। একটি চাকরি পেলে সে কেবল মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবে না, সমাজের জন্য এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠবে।’
শৈশবে যে আলী মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে অন্যদের খেলতে দেখতেন, আজ তিনি জীবনের বৃহত্তর এক ময়দানে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেছেন। দুই হাত না থাকার সীমাবদ্ধতাকে তিনি তাঁর আত্মপরিচয় হতে দেননি। এখন তাঁর প্রয়োজন কেবল একটি সুযোগের। একটি চাকরি শুধু তাঁর জীবিকা নিশ্চিত করবে না, বরং সমাজকে এ বার্তা দেবে যে–ইচ্ছাশক্তি আর অধ্যবসায় থাকলে কোনো বাধা মানুষকে আটকে রাখতে পারে না। 

আরও পড়ুন

×