ঢাকা শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জাহাঙ্গীরনগরে ঐতিহ্যের পাঠ

জাহাঙ্গীরনগরে ঐতিহ্যের পাঠ
×

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে ‘ঐতিহ্য উৎসব’-এর কিছু টুকরো মুহূর্ত

 তারেক হোসেন

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

সকাল গড়াতেই বদলে গেল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন কলা ভবনের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের আঙিনা। বারান্দা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন নাটোরের রানী ভবানী। পাশে খনা। কেউ পুরোহিত, কেউ কৃষক। কারও গায়ে মোগল আমলের পোশাক। আরেক পাশে চুলায় আগুন ধরছে। বাতাসে চুইঝালের ঝাঁজ, পিঠা-নাড়ুর মিষ্টি ঘ্রাণ। কোথাও শামুকের তরকারি, কোথাও আমডাল। একটি বিভাগের উঠানে সেদিন যেন ঢুকে পড়েছিল গোটা বাংলার ঐতিহ্য।
মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর। বিভাগের ৫১তম আবর্তনের শিক্ষার্থীরা আয়োজন করেন দিনব্যাপী ‘হেরিটেজ ফেস্ট ২০২৬’। প্রতিপাদ্য ‘চেরিশিং আওয়ার হেরিটেজ’, যা বাংলা করলে দাঁড়ায়–‘আমাদের ঐতিহ্যকে আগলে রাখা’। বাইরে থেকে মেলা মনে হলেও এটি আসলে ‘হেরিটেজ স্টাডিজ’ কোর্সের টিউটোরিয়াল পরীক্ষা। খাতা-কলমের বদলে শিক্ষার্থীরা উত্তর দিয়েছেন পোশাকে, রান্নায় আর কথায়। ছিল কসপ্লে ও ওয়াক, ঐতিহ্যের খাবার, আলোচনা এবং উদ্যোক্তা পর্ব। কোর্স শিক্ষক অধ্যাপক ড. মাসউদ ইমরান মান্নু। সহযোগিতায় ছিলেন সহযোগী অধ্যাপক সাবিকুন নাহার সিঁথি।

বই থেকে মাঠে
ঐতিহ্য বললে আমরা সাধারণত পুরোনো দালান, মাটি খুঁড়ে পাওয়া মুদ্রা কিংবা জাদুঘরের কাচের বাক্স বুঝি। এই শিক্ষার্থীরা সেই চেনা ধারণা একটু সরিয়ে দিতে চেয়েছেন। তাদের কাছে ঐতিহ্য বেঁচে থাকে মায়ের রান্নায়, দাদির গানে, কারিগরের আঙুলে, গ্রামের পালা-পার্বণে। ইউনেস্কোও ২০০৩ সালের সনদে মৌখিক ঐতিহ্য, পরিবেশনা শিল্প, সামাজিক আচার, প্রকৃতিবিষয়ক লোকজ্ঞান ও হস্তশিল্পকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মর্যাদা দিয়েছে। বাউল গান, জামদানি, শীতলপাটি আর রিকশাচিত্র সেই পথে বিশ্বতালিকায় উঠেছে।
অধ্যাপক মাসউদ ইমরানের কথা স্পষ্ট–ঐতিহ্য মুখস্থ করে খাতায় লেখার বিষয় নয়। মানুষ, সমাজ, অর্থনীতি আর রোজকার জীবনের সঙ্গে এর সম্পর্কটা দেখতে হয়। ২০২১ সাল থেকে তিনি ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, আইইউবি-তে এমন পাঠ চালিয়ে আসছেন। জাহাঙ্গীরনগরে শুরু গত বছর, ৫০তম আবর্তন দিয়ে। এবার যুক্ত হলো ৫১তম।
কয়েক মাস ধরে শিক্ষার্থীরা পড়েছেন ঐতিহ্য নথিবদ্ধ করার পদ্ধতি, ইউনেস্কোর কাঠামো, ‘আউটস্ট্যান্ডিং ইউনিভার্সাল ভ্যালু’, ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই), মেধাস্বত্ব, জনসম্পৃক্ততা ও টেকসই উন্নয়ন। ডসিয়ার তৈরির কর্মশালাও করেছেন। তারপর ফিরে গেছেন নিজের গ্রামে। খুঁজেছেন, কী আছে সেখানে, যা হারাতে বসেছে।

পোশাকে ইতিহাসের মুখ
কসপ্লে পর্বে কেউ কেবল সাজেননি; যে চরিত্র ধারণ করেছেন, তার সময়, সমাজ আর ঐতিহ্যের যোগসূত্রও বুঝিয়ে বলেছেন। এসেছে চণ্ডীমঙ্গলের ফুল্লরা, সর্পদেবী মনসা, মৈমনসিংহ গীতিকার মহুয়া, কৃষির বচনে অমর খনা।
সুমি রায় সেজেছিলেন রানী ভবানী। আঠারো শতকের নাটোর জমিদারির এই শাসক দানশীলতার জন্য আজও স্মরণীয়। সুমি বলেন, ‘রানী ভবানী শুধু শাসক ছিলেন না। জনকল্যাণ, শিক্ষা, স্থাপত্য আর সংস্কৃতিরও পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। নতুন প্রজন্মকে সেটি মনে করিয়ে দিতে এই চরিত্র বেছে নেওয়া। আয়োজনের মূলকথা তিনি এক বাক্যে বললেন–ঐতিহ্যকে জানো, ভালোবাসো, আগামী প্রজন্মের জন্য রক্ষা করো’।

থালায় থালায় বাংলাদেশ
বেলা সাড়ে ১১টায় হেঁশেলের চুলায় আগুন দিয়ে শুরু হয় খাবারের পর্ব। ২৫ জন শিক্ষার্থী নিজ নিজ অঞ্চল থেকে এনেছেন প্রায় ৩৭ পদ। বিন্নি চালের মোচা, চুইঝালে খাসির মাংস, উত্তরবঙ্গের সিঁদল, শুকতানি, কচুশাক ভাজি, ডিম-আলুর ডাল, বাদাম ভর্তা। প্রতিটি থালার পেছনে একটি নদী, একটি মাঠ, একটি পরিবারের গল্প। কোন অঞ্চলে কেন এই পদ, মাটি আর আবহাওয়ার সঙ্গে তার কী সম্পর্ক, প্রজন্ম পেরিয়ে কীভাবে টিকে আছে–সবই বুঝিয়ে বলেছেন তারা।
জামালপুরের সাকিব হোসেন নিজ হাতে রেঁধে এনেছিলেন গরুর মাংসের মেলানি, তিল দিয়ে কলার মোচা ভাজি আর ব্রহ্মপুত্রের চরের কাউনের চালের ফিরনি। সঙ্গে প্রায় হারিয়ে যাওয়া আউশ ধানের ভাত। একসময় আষাঢ়-শ্রাবণে কৃষকের ঘরে উঠত আউশ। সেচনির্ভর বোরোর বিস্তারে সেই ধান এখন অনেক এলাকায় কেবল স্মৃতি।
রাজশাহীর সোমা ডোমরি এনেছিলেন শামুকের তরকারি আর আমডাল। জানালেন, শামুক এ দেশের কয়েকটি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বহুদিনের খাবার। আর আমের দেশ রাজশাহীতে ডালে আম দেওয়া খুব চেনা রীতি। 

ঐতিহ্যের বাজার, কারিগরের অধিকার
উদ্যোক্তা পর্বে স্টল সাজিয়েছিলেন পটার বিবির প্রতিষ্ঠাতা ও ডিজাইনার ফুয়ারা ফেরদৌস, মিথ আর্টস অ্যান্ড ক্র্যাফটসের স্বত্বাধিকারী পৃথিলা শাহনেওয়াজ এবং বিঞ্জ ওটিটির কনটেন্ট স্ট্র্যাটেজিস্ট ইশরাত নুশীন। ছিল ঐতিহ্যনির্ভর নানা সৃজনশীল পণ্য।
আয়োজকদের যুক্তি পরিষ্কার। ঐতিহ্য রক্ষা শুধু সাংস্কৃতিক দায় নয়, এতে জীবিকার সম্ভাবনাও আছে। দেশি নকশা আর কারুপণ্যকে আজকের বাজারে জুড়তে পারলে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হয়। তবে প্রশ্নও থাকে। লাভ যাবে কার ঘরে? যে কারিগর বা জনগোষ্ঠী শত বছর ধরে জ্ঞানটা আগলে রাখল, তার অধিকার কে দেখবে? এখানে মেধাস্বত্ব আর জিআই স্বীকৃতির গুরুত্ব। ২০১৬ সালে জামদানি দিয়ে বাংলাদেশে এই স্বীকৃতির যাত্রা শুরু।

উৎসবের পরে
উৎসব এক দিনের, প্রস্তুতি কয়েক মাসের। পাঠ, মাঠকর্ম, তথ্য সংগ্রহ, মানুষের সঙ্গে বসে কথা বলা। কোনো স্পন্সর ছিল না, প্রকল্পের টাকাও না। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা নিজেরাই খরচ জুগিয়েছেন। যার যেমন সাধ্য, তেমন খাবার আর পোশাক এনেছেন। আয়োজকদের হিসাবে, অন্য বিভাগের শিক্ষার্থী ও অতিথি মিলিয়ে প্রায় আড়াইশ মানুষ এসেছিলেন। তবে দিন শেষে শিক্ষার্থীরা যা নিয়ে ফিরলেন, তা তাদের আত্মের অন্বেষণ।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে ইউনেস্কোর অফিসপ্রধান ও কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. সুসান ভাইজ। আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে আরও ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ও মানবিকী অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোজাম্মেল হক; বিএনসিইউ-এর ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল সাবভীনা মনীর চিঠি (যুগ্ম সচিব), ঢাকা স্ট্রিম-এর সম্পাদক গোলাম ইফতেখার মাহমুদ এবং দৈনিক প্রথম আলোর হাল ফ্যাশন-এর পরামর্শক শেখ সাইফুর রহমান প্রমুখ। আরও ছিলেন ঐতিহ্য উদ্যোক্তা ফোয়ারা ফেরদৌস, পৃথিলা শাহনেওয়াজ এবং ইশরাত নুশীন, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। 

আরও পড়ুন

×