ঢাকা শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পাহাড়ের চূড়ায় শিক্ষার আলো

পাহাড়ের চূড়ায় শিক্ষার আলো
×

নিজের কষ্টার্জিত অর্থে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে একের পর এক বিদ্যালয় গড়ে তুলেছেন শাকিল সৈয়দ

 এম আতিকুল ইসলাম বুলবুল

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

দূরত্বটা প্রায় সাত হাজার ৩০০ কিলোমিটার। একদিকে জার্মানির নুরেমবার্গ শহরের যান্ত্রিক ও পরিপাটি জীবন, অন্যদিকে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের মেঘ-পাহাড় আর সবুজ অরণ্যে ঘেরা দুর্গম জনপদ। আপাতদৃষ্টিতে এই দুই জগতের কোনো মিল না থাকলেও একটি অদৃশ্য সুতো তাদের বেঁধে রেখেছে। সেই সুতো হলো অকৃত্রিম দেশপ্রেম আর শিকড়ের প্রতি দায়বদ্ধতা। এই মেলবন্ধনের রূপকার পুরান ঢাকার আদি বাসিন্দা, প্রবাসী শাকিল সৈয়দ। সুদূর প্রবাসে বসেও যিনি নিজের কষ্টার্জিত অর্থে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে একের পর এক বিদ্যালয় গড়ে তুলছেন, ছড়াচ্ছেন শিক্ষার আলো।
গল্পের শুরু গত শতকের আশির দশকে। ১৯৮৬ সালে মাত্র ২২ বছর বয়সে উন্নত জীবনের আশায় জার্মানিতে পাড়ি জমিয়েছিলেন শাকিল সৈয়দ। বাবা সৈয়দ জামিল হাসান এবং মা জয়গুন নেছার একমাত্র ছেলে তিনি। জার্মানিতে হোটেল-রেস্তোরাঁ ব্যবস্থাপনায় ডিপ্লোমা অর্জন করে বর্তমানে তিনি সেখানকার একটি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রশিক্ষক হিসেবে কর্মরত। জোনাস ও মারিসা নামে দুই সন্তান নিয়ে তাঁর প্রবাসের সাজানো সংসার। দীর্ঘ চার দশকের প্রবাসজীবনে তিনি হয়তো জার্মানিতে থিতু হয়েছেন, কিন্তু তাঁর মন পড়ে থাকে বাংলাদেশের কাদামাটি, প্রত্যন্ত গ্রাম আর দুর্গম পাহাড়ি জনপদে।
শাকিল সৈয়দের এই মানবিক অভিযাত্রার বীজ বোনা হয়েছিল তাঁর শৈশবে। সত্তর ও আশির দশকে যখন অনেক অভিভাবক সন্তানদের বিদেশে পাঠিয়ে নিজেদের ভাগ্য ফেরাতে চাইতেন, তখন ব্যতিক্রম ছিলেন পুরান ঢাকার সহজ-সরল অথচ শিক্ষানুরাগী নারী জয়গুন নেছা। একমাত্র ছেলেকে তিনি ছোটবেলা থেকে শিখিয়েছেন দেশপ্রেম, সততা ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার পাঠ।
মায়ের একটি কথা শাকিল সৈয়দের জীবনের মোড় চিরতরে ঘুরিয়ে দেয়। একদিন গল্পচ্ছলে মা বলেছিলেন–‘শেষ যাত্রার পোশাকে (কাফনের কাপড়ে) কোনো পকেট থাকে না।’ অর্থাৎ পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার সময় জমানো অঢেল সম্পদের কিছুই সঙ্গে যাবে না। ২০০৩ সালে মায়ের মৃত্যুর পর দাফনের সময় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সম্মুখীন হন শাকিল। মায়ের সাহায্যপুষ্ট অনেক অসহায় মানুষ সেদিন কেঁদে উঠে আক্ষেপ করে বলছিলেন, ‘আমাদের এখন কে দেখবে?’

অসহায় মানুষের এই হাহাকার শাকিল সৈয়দের হৃদয়ে গভীর দাগ কাটে। মায়ের সেই দর্শন–অঢেল সম্পদের পেছনে না ছুটে সাধারণ জীবনযাপন করে, নিজের উপার্জনের একটি অংশ দিয়ে দেশের মানুষের জন্য কাজ করা–শাকিল সৈয়দের জীবনের মূলমন্ত্র হয়ে দাঁড়ায়। মায়ের স্মৃতিকে চির অম্লান করে রাখতে ওই বছর তিনি প্রতিষ্ঠা করেন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘আশা–বাংলাদেশের জন্য প্রত্যাশা’।
প্রাথমিক পর্যায়ে সমতলের শিক্ষাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে কাজ শুরু করেন তিনি। মায়ের স্মৃতি ধারণ করে ২০০৬ ও ২০০৮ সালে রাজশাহীর বাঘা উপজেলায়, ২০১০ সালে নীলফামারীর ডোমারে, ২০১২ সালে পাবনার সুজানগরে এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালে নওগাঁর পত্নীতলায় প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত আটটি বিদ্যালয়ের মধ্যে দুটি সরকারি ব্যবস্থাপনার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
শাকিল সৈয়দের স্বপ্নের ক্যানভাস কেবল সমতলে সীমাবদ্ধ থাকেনি। মেঘ-পাহাড়ের নৈসর্গিক সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা পাহাড়ের এক রূঢ় বাস্তবতা তাঁকে নাড়া দেয়। দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা, দারিদ্র্য এবং বিদ্যালয়গুলো যোজন যোজন দূরে হওয়ায় পাহাড়ের ম্রো, ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অনেক শিশু শিক্ষার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছিল। এই তাগিদ থেকে ২০২২ সালে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলায় তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘দলদলি আশাহোপনং আনন্দময়ী প্রাথমিক বিদ্যালয়’। বর্তমানে সেখানে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর ৭৫ জন শিশু পড়ছে। এরপর ২০২৪ সালে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িতে গড়ে তোলেন ‘আশাহোপনং আনন্দময়ী প্রাথমিক বিদ্যালয়’। এখানে শিশু থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ম্রো জনগোষ্ঠীর ৫০ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। গত বছর শিশুদের সুবিধার্থে বান্দরবানের লামা উপজেলায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘পপা আশাহোপনং আনন্দময়ী প্রাথমিক বিদ্যালয়’, যেখানে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর ৩৫ জন শিশু অধ্যয়নরত।
প্রসঙ্গত, শাকিল সৈয়দ কেবল বিদ্যালয় ভবনের অবকাঠামো নির্মাণ করে থেমে থাকেননি। শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপকরণ, স্কুল ব্যাগ, ইউনিফর্ম–সবকিছুর নিয়মিত ব্যবস্থা করে চলেছেন তিনি। পাশাপাশি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষার প্রসারে সহযোগিতা, দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবৃত্তি প্রদান এবং কৃষিতে সহায়তার মতো বহুমুখী সামাজিক কর্মকাণ্ডেও নিজেকে যুক্ত রেখেছেন।

শাকিল আজ আর একা নন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত সংগঠনের মাধ্যমে বর্তমানে আরও ১০৮ জন উদ্যোগী ও পরোপকারী প্রবাসী বন্ধু ও স্বজন এই মহতী উদ্যোগে যুক্ত হয়েছেন। বাংলাদেশে তাঁর এই নিঃস্বার্থ কাজের স্বীকৃতি মিলেছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নে এবং সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে বিশেষ অবদানের জন্য গত ৫ সেপ্টেম্বর জার্মানির ফেডারেল অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন মন্ত্রণালয় শাকিল সৈয়দকে সম্মানজনক ‘এনগেজমেন্ট প্রাইজ’ প্রদান করে। জার্মানির বন শহরে আয়োজিত ‘ওপেন ডে’ অনুষ্ঠানে জার্মান সরকারের উন্নয়নমন্ত্রী রিম আলাবালি রাদোভান তাঁর হাতে এই সম্মাননা তুলে দেন। 

আরও পড়ুন

×