ঢাকা শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

তিনটি আইন নিয়ে উদ্বেগ, আইনমন্ত্রীকে অ্যামনেস্টির চিঠি

তিনটি আইন নিয়ে উদ্বেগ, আইনমন্ত্রীকে অ্যামনেস্টির চিঠি
×
×

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:৩০ | আপডেট: ৩০ অক্টোবর ২০২৬ | ১১:০০

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশে সম্প্রতি প্রস্তাবিত ও প্রণীত তিনটি আইন নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানকে চিঠি লিখেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। 

আইন তিনটি হলো ২০২৬ সালের গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬ সালের স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন এবং প্রস্তাবিত ২০২৬ সালের সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন। 

বিশ্বের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক মানবাধিকারবিষয়ক সংস্থাটি গত সোমবার তাদের ওয়েবসাইটে ওই চিঠি প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, আইন তিনটি আন্তর্জাতিক আইন ও মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যের বিষয়ে গুরুতর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

এ বিষয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান সমকালকে বলেন, এ-সংক্রান্ত কোনো চিঠি এখন পর্যন্ত তিনি হাতে পাননি।
অ্যামনেস্টির চিঠির শুরুতে বলা হয়েছে, ‘গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে আপনার সফরের সময় আমাদের মহাসচিব ড. অ্যাগনেস ক্যালামার্ডের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আমরা আশা করি, আপনার দপ্তর ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মধ্যে গঠনমূলক সংলাপ অব্যাহত থাকবে।’

চিঠি লেখার কারণ সম্পর্কে বলা হয়, ‘সাক্ষাতের সময় উত্থাপিত কয়েকটি উদ্বেগের বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে আমরা এই চিঠি লিখছি। বিশেষ করে বাংলাদেশে মানবাধিকার ভোগ ও সুরক্ষার ওপর প্রভাব ফেলে– এমন সম্প্রতি প্রস্তাবিত বা প্রণীত আইন নিয়ে আমাদের উদ্বেগের কথা জানাতে চাই।’

গঠনমূলক সংলাপের চেতনা থেকে এই চিঠিতে অ্যামনেস্টির মুখ্য উদ্বেগগুলো তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আইন ও প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলোকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকারবিষয়ক বাধ্যবাধকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার জন্য কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন নিয়ে চিঠিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। সংস্থাটির মতে, আগের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ২০০৬, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ ও সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩ মতপ্রকাশের স্বাধীনতাসহ মানবাধিকার খর্ব করতে ব্যবহৃত হয়েছে। 
নতুন সংশোধনী ওই সমস্যার সমাধান না করে বরং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।

সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধনীতে মানহানি, অপমান, হয়রানি, ভুল তথ্য ও গুজব ছড়ানোর মতো বিষয় ঘিরে অপরাধের পরিধি বৃদ্ধি করার প্রস্তাব রয়েছে। সংজ্ঞাগুলো অস্পষ্ট ও ব্যাপক হওয়ায় সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং সরকারের সমালোচকদের হয়রানি বা কণ্ঠরোধ করার কাজে আইনটি ব্যবহৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রস্তাবিত আইনের ৮(২) ধারায় তথ্য অপসারণ বা অনলাইনে প্রকাশ বন্ধ করার ক্ষমতাপ্রাপ্ত সংস্থার সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। এ ধারায় জাতীয় নিরাপত্তা বা জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করতে পারে, ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়াতে পারে, বিশৃঙ্খলা বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের নির্দেশনা দিতে পারে, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মানহানি করতে পারে কিংবা রাষ্ট্রের প্রতি ‘অশ্রদ্ধা’ প্রকাশ করতে পারে– এমন তথ্য সরানো বা প্রকাশ বন্ধ করার সুযোগ রাখা হয়েছে।

অ্যামনেস্টির মতে, এসব কারণের সংজ্ঞা অস্পষ্ট ও অতিরিক্ত বিস্তৃত। কর্তৃপক্ষ ইচ্ছেমতো এসব কারণ দেখিয়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে পারে। এ ছাড়া সংশোধনীতে কোনো তথ্য অপসারণ বা বন্ধ রাখার ক্ষেত্রে তিন দিনের মধ্যে ট্রাইব্যুনালের অনুমোদন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

সংশোধনীতে মানহানি, অপমান, হয়রানি, ভুল তথ্য ও গুজব ছড়ানোর মতো বিষয়কে ঘিরে অপরাধের পরিধি বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। সংজ্ঞাগুলো অস্পষ্ট ও ব্যাপক হওয়ায় সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং সরকারের সমালোচকদের হয়রানি বা কণ্ঠরোধ করার কাজে আইনটি ব্যবহৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

প্রস্তাবিত বিধানে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং ৪০ লাখ টাকা জরিমানার সুযোগ রয়েছে। সংস্থাটি এ সংশোধনী প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে।

গুম প্রতিরোধ আইনকে স্বাগত, তবে সংশোধনের তাগিদ
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬ প্রণয়নকে স্বাগত জানালেও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতে, আইনটি আন্তর্জাতিক গুমবিরোধী সনদের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আইনে গুমের শিকার ব্যক্তির সংজ্ঞা সংশোধনেরও সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।

সংস্থাটি বলেছে, গুমের ঘটনায় কাউকে আটক করা এবং পরে তাঁর আটকের তথ্য অস্বীকার করা বা তাঁর অবস্থান গোপন করার কাজ একই সরকারি কর্মকর্তাকে করতে হবে– এমন শর্ত রাখা উচিত নয়। আবার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা হলে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে গ্রেপ্তারের তথ্য গোপন রাখার বিধানও বাতিল করা দরকার।
অ্যামনেস্টি ওই আইনের ধারা ৬-এ উল্লিখিত মৃত্যুদণ্ডের বিধানের বিরোধিতা করে এ দণ্ড স্থগিত ও পূর্ণ বিলোপের আহ্বান জানিয়েছে।

আইনটির ১৮ ধারায় অভিযুক্ত ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে বিচার করার সুযোগ রাখা হয়েছে। অ্যামনেস্টির মতে, কিছু পরিস্থিতি ছাড়া এ ধরনের বিচার ন্যায্যতা ক্ষুণ্ন করতে পারে। অন্যদিকে ২১ ধারায় গুমের ‘মিথ্যা ও হয়রানিমূলক’ অভিযোগ করলে ক্ষতিপূরণ বা সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। এ কারণে গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবার অভিযোগ জানানো থেকে বিরত থাকতে পারে– এমন আশঙ্কা রয়েছে।

নাম বদলে এসআরবি, রয়ে গেছে র‍্যাবের লোকবল ও ক্ষমতা
স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন নিয়ে অ্যামনেস্টির উদ্বেগ রয়েছে। র‍্যাবের নাম বদলানো হলেও বাহিনীর সদস্য, ক্ষমতা ও সম্পদ এ নতুন ইউনিটে স্থানান্তর করা হয়েছে।
র‍্যাবের বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, নির্যাতনসহ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগের কথা উল্লেখ করেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা যাচাই-বাছাই ছাড়া আগের বাহিনীর সদস্যদের নতুন ইউনিটে নেওয়াকে বড় ধরনের ঘাটতি বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।

 

আরও পড়ুন

×