নদী
বড়াল থাকুক প্রবহমান
মো. আবদুর রহিম
প্রকাশ: ২৩ মার্চ ২০২০ | ১২:০৩
শনিবার সমকালে '৫৪ প্রভাবশালীর দখলে রাজশাহীর বড়াল নদী' শীর্ষক প্রতিবেদনটি পড়ে বড়াল জনপদের একজন অধিবাসী হিসেবে খুবই বেদনাহত হয়েছি। সমকালের এই প্রতিবেদনটি অত্যন্ত প্রশংসার দাবি রাখে। প্রমত্তা পদ্মার শাখা নদী বড়াল। কথিত আছে, এই নদীর উৎসমুখে চারটি ঘাটকে কেন্দ্র করে চারঘাট থানার নামকরণ হয়েছে। রাজশাহী জেলার চারঘাট উপজেলাকে দুই ভাগে বিভক্ত করে পদ্মা নদী থেকে উৎসারিত হয়ে বড়াল নদী নাটোর, পাবনা, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের দক্ষিণে করতোয়া নদীতে মিশেছে। এর আগে বড়াল তার চলার পথে আরও কয়েকটি নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। এভাবে প্রকৃতপক্ষে এই নদীটি পদ্মা থেকে যমুনা পর্যন্ত বিস্তৃত জনপদের মানুষের মধ্যে একটি অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন তৈরি করেছে। নদীটি চলার পথে তার স্রোতধারার অকৃপণ দানে উভয় তীরের বিস্তীর্ণ জনপদকে পরিণত করেছে উর্বর শস্যক্ষেত্রে। একসময় নদীই ছিল এ অঞ্চলের মানুষের যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম। এই নদীটি একসময় এই জনপদের মানুষের জীবনরেখা হিসেবে পরিচিত ছিল।
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বড়াল নদীকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলের মানুষ সাংস্কৃতিক ও বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জনজীবনকে প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর রেখেছিল। যুগ যুগ ধরে এই নদীর দুই ধারে গড়ে উঠেছিল বহুসংখ্যক হিন্দু পল্লি। এসব গ্রামে পূজার সময় গড়ে উঠত অসংখ্য পূজামণ্ডপ। পূজাকে কেন্দ্র করে নদীর দুই ধারের অসংখ্য স্থানে বসত গ্রামীণ মেলা। সেখানে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে হাজার হাজার মানুষ নদীতে দেবী দুর্গা বিসর্জন দেওয়ার দৃশ্য উপভোগ করত। গ্রামীণ জীবনের আরেকটি বড় অনুষঙ্গ ছিল পহেলা বৈশাখ। নদীর দুই ধারে বড় বড় বটগাছের নিচে এসব মেলা এই জনপদের মানুষের অন্যতম মিলন কেন্দ্রে পরিণত করেছিল। এছাড়া নদীর পাড়ের বটগাছের ছায়ায় ঈদের নামাজের জামাত অনুষ্ঠিত হতো। বেশি দিন আগের কথা নয়, তিন দশক আগেও আমার ছেলেবেলায় এই নদীর ভরা যৌবন আমরা দেখেছি। পদ্মা-বড়ালের মিলনস্থল ছিল ঐতিহাসিকভাবে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থান। বাংলাদেশের একমাত্র পুলিশ একাডেমি সারদা পুলিশ একাডেমি পদ্মা-বড়ালের সঙ্গমস্থলে অবস্থিত। বঙ্গভঙ্গ রদের পরে পুনর্গঠিত পুলিশ ট্রেনিং কলেজের প্রিন্সিপ্যাল মেজর এইচ. চিমনি ভারতের গাজীপুর থেকে পদ্মা নদীপথে স্টিমারে নিয়মিত কলকাতা যাতায়াত করতেন। কথিত আছে যে, একদা তিনি চারঘাট স্টিমার স্টেশনে নামেন। সেখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, মনোরম পরিবেশ, প্রশস্ত খোলা প্রান্তর তাঁকে মুগ্ধ করে। তিনি ব্রিটিশ সরকারের কাছে ইতোমধ্যে প্রস্তাবিত পুলিশ ট্রেনিং কেন্দ্র চারঘাটে স্থাপনের জন্য প্রস্তাব পাঠান। সরকার দ্রুত সে প্রস্তাব গ্রহণ করে ১৯১২ সালে সারদা পুলিশ ট্রেনিং কেন্দ্র স্থাপন করে। সারদা পুলিশ একাডেমির অনতিদূরে ১৯৬৫ সালে একটি ক্যাডেট কলেজও স্থাপিত হয়। এখানে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। বড়াল নদীর তীরে গড়ে ওঠা আড়ানী বাজার ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসা কেন্দ্র। বর্তমানেও বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদের অন্যতম বৃহৎ ব্যবসা কেন্দ্র এটি। বড়াল নদীকে কেন্দ্র করেই মূলত এই নদীবন্দরটি গড়ে উঠেছিল। আজ বড়াল মৃতপ্রায়। নদীকেন্দ্রিক সংস্কৃতিও আজ মধুর স্মৃতিমাত্র। বড় বড় বটগাছও আজ আর নেই। বটগাছের নিচে রাখালের বাঁশির সুর, পাখির কলকাকলি অথবা ক্লান্ত পথিকের ক্ষণিক বিশ্রামের গল্প বর্তমান প্রজন্মের মানুষের কাছে আজ মিথ ছাড়া আর কিছুই নয়।
জনপদের মানুষকে বাঁচাতে হলে নদীর স্বাভাবিক গতিকে সচল করতে হবে। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ রমেশচন্দ্র মজুমদার পূর্ববাংলার নদীকেন্দ্রিক সভ্যতার বর্ণনা দিয়েছেন। পশ্চিমা ইতিহাসবিদ রিচার্ড ম্যাঙ্কওয়েল ইটন পূর্ববাংলার সভ্যতার বিকাশকে নদীর ওপর নির্ভরশীল বলেছেন। মধ্যযুগের মরক্কোর পর্যটক ইবনে বতুতা এবং ফ্রান্সের পর্যটক ও চিকিৎসাবিজ্ঞানী ফ্রাঁসোয়া বার্নিয়ারও পূর্ববাংলার নদীভিত্তিক অর্থনৈতিক জীবনের বর্ণনা দিয়েছেন। অন্যান্য ঐতিহাসিক ও ভূতাত্ত্বিকের গবেষণায়ও পূর্ববাংলার জনজীবনে নদীর গুরুত্ব অনিবার্য, সে বিষয়টি উঠে এসেছে। আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাই, বড়ালসহ সব নদীর গতিপথকে সচল রাখা হোক। প্রয়োজনে নদীগুলোর ড্রেজিং করার ব্যবস্থা করা হোক। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের নির্বাচনী এলাকা পদ্মা-বড়াল বিধৌত চারঘাট-বাঘা। তিনি ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে বড়ালপাড়ের এক নির্বাচনী জনসভায় বড়ালের উৎসমুখে এরশাদ সরকারের আমলে নির্মিত স্লুইস গেট অপসারণ করার ওয়াদা দিয়েছিলেন। এই স্লুইস গেটটিই মূলত বড়ালের মৃত্যুর জন্য দায়ী। পরিবেশবাদী অনেক ব্যক্তি ও সংগঠন এই স্লুইস গেটটি অপসারণ করে সেখানে একটি ব্রিজ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন। বিশ্বাস করি, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এবং সরকারের সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষ বড়ালসহ সব নদীকে স্বাভাবিক গতিতে প্রবাহিত হতে দিয়ে বাংলাদেশের নদীভিত্তিক সভ্যতার বিকাশকে চলমান রাখবেন।
সহযোগী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
- বিষয় :
- নদী
